প্রচেত গুপ্ত: বালুরঘাটের তরুণ গল্পকার শুভ্রদীপ চৌধুরি সল্টেলেকে কম ভাড়ায় ঘর খঁুজছেন। দুদিন থাকবেন।
মেলবোর্নে থাকেন শ্রীমতী প্রাপ্তি চৌধুরি। কবিতা লেখেন। দুটো বই রয়েছে। আর একটা বেরোবে। বাইপাসের ধারে ফাইভস্টার হোটেলে ঘর বুক করেছেন। তেইশতলায়। চারদিনের জন্য। তারপর বেঙ্গালুরু চলে যাবেন বোনপোর কাছে।
কঁাথি থেকে ব্যাঙ্ক অফিসার মধুসূদন মাইতি হাওড়ায় দাদার বাড়িতে তিনদিনের জন্য উঠছেন।
 ইন্দোর থেকে আসছে দীপা নাথ। দীপা পড়ে কলেজে। থাকবে বিডন স্ট্রিটে এক বান্ধবীর বাড়ি। বান্ধবীর নাম নির্ঝরা। বাবা–‌মায়ের খুব আপত্তি ছিল। মেয়ে কান্নাকাটি করে রাজি করিয়েছে। দীপা জানে না, তার বাবাও লুকিয়ে টিকিট কেটেছে। একই ট্রেনে থাকবে। তিনি রিজার্ভেশন পাননি। বসে আসতে হবে। মেয়ের জন্য এই ঝামেলা তিনি একই সঙ্গে হাসি এবং বেজার মুখে মেনে নিয়েছেন।
সবাই কলকাতায় আসছে। আসছে কেন?‌ আসছে বইমেলায়।
বাংলার অতি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। মেধা, শিক্ষা, সৃজনশীলতার উৎসব। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, রাজনীতিতে কোনও ভেদাভেদ নেই। সবাই অংশ নিতে পারে। যার উচ্চমেধা আছে সেও যেমন পারবে, যে মাঝারি মানের, সেও পারবে। যে ধনী তার যেমন মেলায় যেতে কোনও সমস্যা নেই, যে বেকার, টিউশন সম্বল, সেও একই ভাবে বুক ফুলিয়ে মেলায় ঘুরবে। কেউ বলবে না, ‘‌ভাই, আপনি বেকার, দামি বইতে হাত দেবেন না।’‌ যে বর্ষীয়ান কবি ছন্দ গড়া এবং ছন্দ ভাঙাকে মিথের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন, তিনি যেমন মেলায় শান্তভাবে হঁাটতে পারেন, যে তরুণ কবির ছন্দ এখনও তিনমাত্রায় গুলিয়ে যায়, তিনিও হঁাটেন সদর্পে। আবার যিনি কবিতা থেকে শত হস্ত দূরে তারও মেলায় ঢুকতে কোনও বাধা নেই।  
বইমেলা নিয়ে সাজসাজ রব পড়ে গিয়েছে। লেখকদের কাজ শেষ। প্রকাশক, ছাপাখানা, বাইন্ডারদের পাগল পাগল অবস্থা। মেলার আয়োজকরা কোমর বেঁধে তৈরি। একবার কনসুলেটের সঙ্গে মিটিং করছেন তো একবার মেলার মাঠে গিয়ে বঁাশ পোঁতা দেখছেন। সরকারও সবরকম সহায়তা নিয়ে পাশে 
দঁাড়িয়ে পড়েছে। মাঠের পরিচ্ছন্নতা, জল, পুলিশ, আলো, দমকল, ট্রাফিক খুব জরুরি। তারা নিঃশব্দে আড়ালে থেকে পাহারা দেয়।
আমি নিশ্চিত, এবারও বইমেলা জমজমাট হবে। এত আবেগ, এত উদ্যোগ, এত পরিশ্রমের তো দাম রয়েছে।
তারপরেও আসন্ন বইমেলার মুখে দঁাড়িয়ে কিছু কথা না বলে পারছি না। সেই কথা বলতেই এই লেখার অবতারণা। শুনতে কারও কারও খারাপ লাগবে, বইমেলার শুভক্ষণে তিক্ত কথা কেন?‌ কিছু করার নেই। বৎসরান্তে বইমেলার উচ্ছ্বাস, সৃজনশীলতা বা আংশিক ব্যবসা দেখে এই সত্যকে এড়িয়ে থাকা ভুল হবে।
আমাদের বই কেনা, বই পড়া, বই দেখা, বইয়ের কাছে যাওয়া, বইয়ের সঙ্গে যারা জড়িত (‌তিনি প্রকাশক, সম্পাদক, বা লেখকই হোন)‌ তাদের সম্মান বা গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা হুড়মুড়িয়ে কমছে। বই উপহার দেওয়া তো উঠেই গিয়েছে। এখন সহজ রসিকতা হল, ‘‌ওরে নেমন্তন্নবাড়িতে বই নিয়ে যাসনি, খেতে দেবে না।’‌ অবস্থা ভয়ঙ্কর। এই ভাবে চলতে থাকলে বই যে কোথায় গিয়ে ঠেকবে কে জানে। মেধা ও ব্যবসা না হয় গোল্লায় যাবে, যে জাতি বই থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে তার কী হবে?‌ বই না পড়া জাতির দিকে তাকিয়ে তো গোটা বিশ্ব ‌ছ্যা ছ্যা করবে। তখন আমরা কী বলব?‌
‘‌বই না পড়ি আমরা তো ফেসবুক পড়ি। আমরা হলাম ফেসবুক পণ্ডিত।’
খুবই লজ্জার হবে। দু কান কাটা থাকলে লজ্জা না হয় সামলে নেওয়া যাবে, কিন্ত যে পাহাড়প্রমাণ অজ্ঞতা, অজ্ঞানতার মধ্যে আমরা ডুবে যাব, তার ফল কী হবে, সেটা‌ একবার ভেবে দেখি কি? না, দেখছি না। হাতে মোবাইল ফোন থাকলে নিজেদের মহাজ্ঞানী ভাবতে শুরু করেছি। বই নয়, ফোনই এখন জ্ঞানের আধার। বইয়ের পাতা উল্টোনোর কী প্রয়োজন?‌ যাঁরা ফোনবাজির (রংবাজির মতো)‌ মধ্যে থাকেন, তাঁরা কায়দা করে বলেন,‘‌ডিজিটাল, ভার্চুয়াল টেকনোলজিকে তো মেনে নিতে হবে ব্রাদার। রিয়েল বইয়ের পাতা উল্টোনো এখন ব্যাকডেটেড। দুনিয়া এখন ডিজিটাল। সে হাতের মুঠোয়। বিজ্ঞান থেকে তথ্য, তথ্য থেকে সাহিত্য কোনও কিছুর জন্য আজ আর কাগজের বইয়ের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বিশ্বভারতীর গ্রন্থন নয়, নোকিয়া ফোনের মন্থনই এখন শ্রেষ্ঠ।’
এসব শুনলে মনে হয়, কদিন পরে নোবেল কমিটির বিচারকরা নোবেল পুরস্কার দেওয়ার জন্য আর বই পড়বেন না, গবেষনাপত্র 
ঘঁাটবেন না। তার আই ফোন হাতে নিয়ে মিটিংয়ে ‌বসবেন। পুরস্কার দেওয়ার সময় গলা কঁাপিয়ে বলবেন, ‘‌আ‌মাদের মাননীয় জুরিগণ, নোকিয়া, শাওমি, স্যামসং কোম্পানির কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। তারা না থাকলে, মানবজাতি এই মহান সৃষ্টি, মহতী গবেষণার কথা জানতেই পারতাম না। হয়তো এবার কাউকে নোবেল দেওয়াই হত না।’‌
এসব তো গেল হালকা কথা। এবার একটু ভারী কথা বলি। একটা অস্বস্তিকর উদাহরণ দিই।
কিছুদিন আগে সল্টলেকে হয়ে গেল লিটল ম্যাগাজিন মেলা সঙ্গে সাহিত্য–উৎসব। কোনওরকম গল্পপাঠ বা কবিতাপাঠে অংশগ্রহণ ছাড়াই আমি সেখানে চারদিন গিয়েছি। নতুন নয়, নন্দন চত্বরে যখন হয়েছে, তখনও গিয়েছি। এই মেলা বনগঁাতে হলেও যাব। চারদিন না পারি একদিন যাব। কিন্তু যাব।
কত ভাল ভাল সব পত্রিকা, বই যে এখানে আসে তার ইয়ত্তা নেই। বিখ্যাতরা তো আছেনই, অজানা, অচেনা সব লেখকদের, সম্পাদকদের গভীর মেধা, অক্লান্ত পরিশ্রমের কাজ সব! সব যে আমার বোধবুদ্ধির মধ্যে পড়ে এমন নয়, হয়তো সব বুঝতেও পারি না, তবে এইটুকু অনুভব করি, ভাষা, সমাজ ও ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে এই সব কাজ একান্ত জরুরি। অনেক পত্রিকা তো দলিলের মতো। কবিতা, গল্পেরবেলাতেও তাই। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ভালবাসা নিয়ে, তাগিদ নিয়ে লিখেছেন। দূরদূরান্ত থেকে ঝোলায় বই নিয়ে এসেছেন।
কিন্তু এই মেধা, এই কল্পনা, এই পরিশ্রম, এই ভালবাসা ছুঁয়ে দেখবার মতো মানুষ কোথায়?‌ ক্রেতা কোথায়?‌ বর্ধমানের ভিতরের গ্রাম থেকে যে ছেলেটি কটা বই নিয়ে এসেছিল, সে হয়তো ফেসবুকে দেড় হাজার ‘‌লাইক’‌ পেয়ে উৎসাহে ডগমগ হয়ে ছুটে এসেছিল, তার বিল বইয়ের দেড়খানা পাতাও খরচ হয়নি।‌ বছরভর ফেসবুকে কত কবিতা, কত গদ্য, কত প্রতিবাদ, কতই না গান।‌‌ সাহিত্য নিয়ে চুল ছেঁড়াছেঁড়ি, মুখ হঁাড়ি, কতই না মান অভিমান। কত লাইক আর কত বয়কটের ডাক। আত্মপ্রচার আর সমালোচনায় হৃদয় 
হঁাকপাক। কেবল‌ ভেঙে দাও আর গঁুড়িয়ে দাও। গঁুড়িয়ে দাও, আর ভেঙে দাও। বাপরে বাপ‌!‌ অথচ নতুন ছেলেমেয়েদের গদ্য–‌পদ্য শুনতে আসা, তাদের বই–পত্রিকা কেনার জন্য পঞ্চাশ–‌একশো টাকা খরচ করতেও কাউকে (‌অতি অল্প)‌ পাওয়া গেল না! ‘‌লাইক’–‌এর‌ বুদবুদে ভাসতে ভাসতে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের শুকনো মুখ দেখে কষ্ট হচ্ছিল। তাঁদের বলতে ইচ্ছে করছিল, আপনারাও তো ‘‌লাইক’‌ করেন। করেন না?‌  তিনজন শ্রোতার সামনে কবিতা পড়তে কেমন লাগছে?‌
তবে হ্যঁা, ব্যতিক্রম কি নেই?‌ অবশ্যই আছে। তবে তা যৎসামান্য।
শুনি, কেউ কেউ বলে, মেলা দূরে হয় বলে নাকি যাওয়া যায় না। হতে পারে। কিন্তু আমি তো জানি, লিটল ম্যাগাজিন এক ধরনের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসকে কোনও বাধা টলাতে পারে না। অর্থের মতো বড় বাধাই তো তার কাছে তুচ্ছ, দূরত্ব এত গুরুত্ব পেল?‌‌ যদি বা পেয়েই থাকে, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, কঁাথি, বঁাকুড়া, পুরুলিয়া থেকে যে বই নিয়ে, পত্রিকা নিয়ে এত দূরে এসেছেন, তাঁর কথা ভেবে একবার ঘুরে যেতে খুব সমস্যা?‌ ওই ছেলে বা মেয়েটির দুটো পত্রিকা বিক্রি হলে খু্ব ক্ষতি হত?‌ আচ্ছা, ও বির্তক না হয় বাদ দিলাম, যেখানে মেলা হয়েছে তার পঁাচ কিলোমিটারের মধ্যে থেকে কতজন এসেছিলেন?‌ এই এলাকায় শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী তো কম থাকেন না।
আসলে আমি ফেসবুকের লাইকে আছি, বই, পত্রিকা কিনতে লাইক করি না। প্লিজ, আমায় জ্বালাতন করবেন না।
আশা করব, আগামী বইমেলায় আমার এই হাবিজাবি কথা মিথ্যে প্রমাণিত হবে। অনেক অনেক বই, পত্রিকা নাড়াঘাঁটা, কেনাবেচা হবে।
তরুণ প্রজন্মের সম্পাদক, প্রকাশক, গল্পকার, কবিদের স্যালুট। জানি, তাঁরা ‘‌লাইক’–এর‌ বাধা দূর করে আরও লিখবেন, আরও পত্রিকা প্রকাশ করবেন।
শেষ পর্যন্ত খসখসে পাতার, মন ভাল করা গন্ধ মাখা বইয়ের জয় হবেই।  ‌

জনপ্রিয়

Back To Top