তাপস গঙ্গোপাধ্যায়- লেখাটির শিরোনামেই যে প্রশ্ন তুলেছি তার উত্তর দেওয়াই এই লেখাটির উদ্দেশ্য। গোড়াতেই বলা দরকার প্রায় ৫০০ বছর আগে দুজনেই প্রয়াত হয়েছেন। বাবুর, মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা তিন বছরের বড় ছিলেন প্রেমের দেবতা, জাতি–‌ধর্ম–‌বর্ণের তাবৎ সীমা প্রেমের লাবণ্যে যিনি মুছে দিয়েছিলেন সেই চৈতন্যের থেকে। বাবুরের জন্ম ১৪৮৩ সালে, চৈতন্যদেবের ১৪৮৬। কিন্তু মৃত্যুর অঙ্কে তিন বছরের সিনিয়রিটি চৈতন্যের। তাঁর প্রয়াণ হয় ১৫৩৩–‌এ। বাবুরের ১৫৩০ সালে। দুজনেরই আয়ুষ্কাল যৎ‌সামান্য, মাত্র ৪৭ বছর। অথচ এই সামান্য সময়ের মধ্যেই দুজনে অসামান্য কাজ করে ফেলেছেন। একজন বিদেশ থেকে স্বদেশি উজবেকদের তাড়া খেতে খেতে ভারতে ঢুকে পঞ্চমবারের চেষ্টায় দিল্লি দখল করেন এবং এই সুবাদে মধ্যযুগের অন্যতম বৃহৎ সাম্রাজ্য, মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন হিন্দুস্থানে। অন্যজন ভারতের পূর্বপ্রান্তে নদিয়ায় ছুৎ, অচ্ছুৎ থেকে নানাবিধ ধর্মীয় এবং বিধিনিষেধে অনড় অটল, শতধা বিভক্ত সমাজকে প্রেম–‌ভক্তির ওষধিতে নিরাময়ের এবং আবার সবল ও সতেজ হয়ে ওঠার পথ করে দিতে গিয়ে বারবার বিপন্ন হয়েছেন। বাবুরের মৃত্যু হয়েছিল তাঁর জন্মস্থান আন্দিজান (‌বর্তমান উজবেকিস্তানের ফারগনা প্রদেশের একটি শহর)‌ থেকে প্রায় দু’‌হাজার কিলোমিটার দূরের হিন্দুস্থানের দিল্লিতে। চৈতন্যের মৃত্যু হয় ওডিশার পুরীতে। বাবুরের মৃত্যুর কারণ বলা হয় পুত্র হুমায়ুনকে রোগমুক্ত করতে চেয়ে নিজের শরীরেই মারণব্যাধিকে টেনে নেন। চৈতন্যের মৃত্যু নিয়ে ভক্ত লেখকরা নীলাচলের সমুদ্রে তাঁর লীলাবসানের আবেগপূর্ণ বর্ণনা দিলেও, চৈতন্যমঙ্গল কাব্য রচয়িতা, চৈতন্যের সমসাময়িক কবি জয়ানন্দ পরিষ্কার লিখেছেন রথযাত্রার সময় পুরীর রাস্তায় নৃত্যরত অবস্থায় একটুকরো পাথরকুচি তাঁর পায়ে যে ক্ষত সৃষ্টি করে, তার জেরেই হয় তাঁর মৃত্যু।
বাবুর ঘোড়া ও বন্দুক এবং সদ্য আবিষ্কৃত কামানের জোরে গোটা উত্তর ও পশ্চিম ভারত জয় করে মুঘল শাসনে আনেন। শ্রীচৈতন্য প্রেম ও ভক্তির বাণী বিলিয়ে পূর্ব, দক্ষিণ, পশ্চিম এবং উত্তর ভারতের বেশ খানিকটা অংশে জাতপাতের ‘‌জঞ্জালে’‌ আচ্ছন্ন হিন্দুদের দেন মুক্তির দিশা, মিলন ঘটান হিন্দু ও মুসলমান, আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী দুই ধর্মীয় গোষ্ঠীর।
প্রায় ৫০০ বছর পরে, একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক যখন শেষ হয়ে তৃতীয় দশক শুরু হতে চলেছে, তখন আমরা কী দেখছি?‌ শ্রীচৈতন্য, তাঁর সমসাময়িক গুরু নানক, কবীরের আজীবন সাধনার ফসল সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি ধ্বংস করে চলেছে একদিকে মুসলমানদের ভারতীয় সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের কাজ, অন্যদিকে হিন্দু সমাজের অনগ্রসর, অবহেলিত, নিপীড়িত শিডিউলড কাস্ট ও ট্রাইব বা এক কথায় তাবৎ দলিতদের কোণঠাসা করে ব্রাহ্মণ্যবাদের স্তম্ভ রচনার প্রয়াস। বাবুর তাঁর ব্যক্তিগত দিনপঞ্জি যা বাবুরনামা নামে খ্যাত তাতে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিখেছেন একটির পর একটি যুদ্ধজয়ের পর পরাজিত শত্রুভূমিতে আম–‌আদমির মনে আতঙ্ক ধরানোর জন্য নিজের সৈন্যদের বলতেন, যুদ্ধে মৃত শত্রুপক্ষের তাবৎ সৈন্যের মাথা কেটে স্তম্ভ করে রাখ, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ তাঁর বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহস না দেখায়।
বাবুরের জন্মসূত্রে বর্বরতা অর্জনের কারণ তাঁর মা ছিলেন চেঙ্গিজ খঁানের অধস্তন চতুর্দশ পুরুষ। আর পিতৃসূত্রে তিনি চেঙ্গিজ খাঁনের অধস্তন পঞ্চদশ পুরুষ। মধ্যযুগে এই দুই মুঘল ও তুর্কি দিগ্বিজয়ী তাঁদের জীবৎকালে সমসময়ের দুই বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন, শাসনের জন্য নয়, লুঠের জন্য।
পাঁচশো বছর পরেও আমরা দেখছি সেই লুণ্ঠন প্রক্রিয়া— অর্থের— ব্যাঙ্কের হাজার হাজার কোটি লুঠের মাধ্যমে। এই লুঠের অর্থই ঘুরপথে চলে আসছে এ যুগের সাম্রাজ্য পত্তনের প্রধান অস্ত্র ভোটের সময়। কামান, বন্দুক নয়, আনবিক, পারমাণবিক বোমাও নয়, সাধারণ মানুষের একটি আঙুলের টোকায় বোতাম কথা বলে এবং সেই কথা বলাকে স্বপক্ষে আনার জন্যই চাই টাকা। তাই বিজয় মালিয়া, নীরব মোদি, মেহুল চোকসি, বিক্রম রাঠোর। গত শতাব্দীর নব্বুই–‌এর দশকে এদেরই পূর্বপুরুষ— কেতন পারেখ ও হর্ষদ মেহেতা— চেষ্টা করেছিল ব্যাঙ্কের টাকায় শেয়ারবাজার দখল করে নিজেদের অনুগত রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতার সিংহাসনে বসাতে। কিন্তু সে প্রচেষ্টা বানচাল হয়েছিল তখনকার আম–‌আদমির প্রতিনিধিদের শক্ত প্রতিরোধের আগুনে। এবার তার সম্ভাবনা কম। কারণ যারা কালো টাকার রহস্য উন্মোচন করে দেশবাসীকে মুদ্রাস্ফীতির ঝড় থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসেন, আজ তারাই ব্যাঙ্ক–‌লুঠেরাদের প্রচ্ছন্ন মদতদাতা।
তবু বাবুর শিক্ষিত পুরুষ ছিলেন। তিনি মাতৃভাষা তুর্কি এবং প্রশাসনিক ভাষা ফারসি অত্যন্ত ভাল জানতেন। কারণ তাঁর মা এবং দিদিমা দুজনেই ছিলেন সুশিক্ষিতা। বাবাকে দশ বছর বয়সে হারিয়ে ফারগনার শাসকের রাজদণ্ড বস্তুত শৈশবেই তাঁকে হাতে নিতে হয়েছিল। জন্মসূত্রে তাঁকে প্রতিনিয়ত আক্ষরিক অর্থে যুদ্ধ করতে হয়েছে। কিন্তু বর্তমান ভারতের প্রধান রাজপুরুষদের শিক্ষার দৈন্য তাদের প্রতিদিনের মুখনিঃসৃত বাণী যাকে বলে বক্তৃতাবাজিতে প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। ২০১৪–‌র লোকসভা ভোটের আগে বিহারে গিয়ে বর্তমানে যিনি প্রধান রাজপুরুষ, তিনি বিহারী মনজয়ের চেষ্টায় বলেন আলেকজান্ডারের মতো দিগ্বিজয়ী বীরও পাটনার দরজায় এসে ফিরে যান ভয় পেয়ে। আলেকজান্ডার প্রায় ২৩০০ বছর আগের চরিত্র। তাই সম্ভবত নরেন্দ্র দামোদরভাই মোদি ইতিহাস ও ভূগোল গুলিয়ে ফেলে বলেছিলেন এই কথা। নইলে যে কোনও স্কুলের ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করলে সে বলবে আলেকজান্ডার সিন্ধু নদের পুব পাড়ে পা রাখেননি তো প্রায় ২০০০ কিলোমিটার দূরে পাটলিপুত্র অধুনা পাটনার দরজায় যাবেন কী করে?‌ এবার সেই মহানপুরুষ কর্ণাটক–‌জয়ের রণে নেমে জেনারেল থিমায়া প্রসঙ্গে বলেছেন কৃষ্ণমেনন পাকিস্তানের কাশ্মীর আক্রমণের সময় ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রতিরক্ষা (‌এখন বলা হয় শুধু ‘‌রক্ষা’)‌‌ মন্ত্রী। এবং কৃষ্ণমেনন থিমায়াকে অপমান করায় প্রথম পাক–‌ভারত যুদ্ধের বিজয়ী সেনাপতি নাকি পদত্যাগ করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী যদি স্বাধীন ভারতের গত ৭১ বছরের ইতিহাসটুকুও না জানেন, তাহলে তাঁর হাতে কী আবার দেশের শাসনভার তুলে দেওয়া যায়?‌ কিন্তু এ প্রশ্ন তুলবে কে?‌ কই সেই শ্রীচৈতন্য, যিনি পাণ্ডিত্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী দিগ্বিজয়ী হয়েও বৌদ্ধ–বিদ্বেষী শঙ্করাচার্যের পথ ত্যাগ করে গোটা দেশকে এক করার চেষ্টা করেছিলেন প্রেম ও ভক্তির বিনিময়ে।

জনপ্রিয়

Back To Top