অনুপ গুপ্ত:  ‘চিকাগো বিধ্বংসী কুরুক্ষেত্র হতে পারতো, কিন্তু পারেনি শুধু একজনের জন্য, তিনি স্বামী বিবেকানন্দ।’‌ এই চমকপ্রদ কথাটি  স্বামী লোকেশ্বরানন্দজির। তিনি ব্যাখ্যা করে আরও বললেন, ধর্মসম্মেলনের কয়েকজন উদ্যোক্তা ধরেই নিয়েছিলেন, খ্রিস্টধর্মের কথা শুনে অন্য ধর্মাবলম্বীরা স্বেচ্ছায়, কৃতজ্ঞচিত্তে খ্রিস্টান হয়ে দেশে ফিরে যাবে এবং সেক্ষেত্রে মিশনারি পাঠিয়ে তাদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টার আর কোনও প্রয়োজন হবে না। নেতৃত্বস্থানীয়রা যদি খ্রিস্টান হয়, তাহলে সাধারণ মানুষদের খ্রিস্টান করা খুব একটা দুঃসাধ্য ব্যাপার হবে না। এতে টাকাও বেঁচে যাবে।
কিন্তু স্বামীজি সব বানচাল করে দিলেন। ধর্মসভায় স্বামীজি বললেন, ‘‌যদি এক ধর্ম সত্য হয়, তাহলে সব ধর্মই সত্য। আমরা কেউ মিথ্যা থেকে সত্যে যাচ্ছি না। ছোট সত্য থেকে বড় সত্যে যাচ্ছি।’‌ সত্য সত্যই ছোট, বা বড়, সব আমাদের জ্ঞানবুদ্ধির তারতম্য অনুযায়ী আমরা ঠাওরে বসি।
লোকেশ্বরানন্দজি তাঁর লেখা ‘‌চিকাগো একালের কুরুক্ষেত্র’‌ প্রবন্ধে লিখলেন— কুরুক্ষেত্রে ধর্মের জয় হয়েছিল। চিকাগো ধর্মসভাতেও ধর্মেরই জয় হয়েছিল।  কোনও বিশেষ ধর্মমতের জয় নয়। তবে এই জয়টি ঘটিয়েছিলেন নবীন ভারতীয় সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ। আধুনিক কুরুক্ষেত্রের নায়ক, মহা সংগ্রামের মহান যোদ্ধা চিকাগো ধর্মমহাসভায় স্বামীজির বক্তৃতা ও আলোচনায় ভারতবর্ষের হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্য পাণ্ডিত্য অভিমানী সম্প্রদায় এবং সঙ্কীর্ণ চেতনার মধ্যে আবদ্ধ মিশনারিদের কটূক্তির যথার্থ প্রত্যুত্তর দিলেন। তঁার তীক্ষ্ণ যুক্তি আর ক্ষুরধার বুদ্ধি, বিশ্বজনীন উদার দার্শনিক আলোকে হিন্দুধর্মের গূঢ় তত্ত্বগুলিকে পণ্ডিত এবং সাধারণের কাছে সহজেই ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করেছিল। 
হিন্দু মূর্তিপুজো করে, কিন্তু পুতুলকে দেবতাজ্ঞানে নয়। রূপক ও প্রতীকের মধ্য দিয়ে নির্বিকল্প অদ্বৈতলোকে পৌঁছোনো যায়, শ্রীরামকৃষ্ণ যার জ্যোতির্ময় প্রকাশ। বহুর মধ্যে, বিচিত্রের মধ্যে, বিবিধের মাঝে, এমনকী বিরোধের মধ্যেও হিন্দু ‘‌পরম এক’‌কে উপলব্ধি করেছে। তাঁর আলোচনায় স্বামীজি বলছেন, হিন্দু হোক, বৌদ্ধ, জৈন, পারসিক, ইসলাম, খ্রিস্টান হোক, সবাই ‘‌একমেবদ্বিতীয়ম’‌ খুঁজছে। হয়তো তঁার নাম বা মন্ত্র কিছু পৃথক হতে পারে। ধর্মসভার কয়েক সহস্র শ্রোতাকে স্বামীজি স্মরণ করিয়ে দিলেন, যিনি হিন্দুর ‘‌ব্রহ্ম’‌, ইহুদিদের ‘‌জিহোবা’‌, পারসিকদের ‘‌আহর মাজদা’‌, বৌদ্ধদের ‘‌শাক্যমুনি’‌, ইসলামদের সর্বশক্তিমান ‘‌আল্লাহ্‌’‌, অথবা খ্রিস্টানদের ‘‌স্বর্গস্থ পিতা’‌— তঁার করুণাধারায় স্নান করে যে কোনও ধর্মাবলম্বী নিত্য মুক্ত শুদ্ধ হতে পারেন।‌ মহাধর্মসম্মেলনে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের আচার্য এবং প্রতিভূরা নানা যুক্তিজাল বিস্তার করে নিজের ধর্মমতের উৎকর্ষ ব্যাখ্যা করলেন। পাশ্চাত্য আমেরিকা বুঝতে পারল যে এশিয়া বিশ্বধর্মের তীর্থক্ষেত্র। 
১২৫ বছর আগে ১৮৯৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর শিকাগো শহরে ধর্মসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের চারশো বছরকে স্মরণীয় করার জন্যে। এই সম্মেলনের প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন ধর্মের প্রবক্তারা। ভারতীয় প্রতিনিধিদের অন্যতম ছিলেন নববিধান সমাজের প্রতাপচন্দ্র মজুমদার, একাধারে বৌদ্ধ ও থিয়োজফিস্ট অনাগরিক ধর্মপাল, বম্বের ব্রাহ্ম নেতা বলবন্ত ভাট্ট নাগরকর, স্বনামধন্য থিওজফিস্ট অ্যানি বেসান্ত, এলাহাবাদের প্রবীণ ব্রাহ্মণ অধ্যাপক জ্ঞানেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, জৈন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি বারচাঁদ, এ গান্ধী। এঁদের মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম স্বামীজি। পরিচয়পত্র পূর্বাহ্নে সংগ্রহ করে তিনি যোগদান করেননি। অলক্ষ্যে থেকে গুরুর কৃপায় যেন তিনি মহাসভায় উপস্থিত হলেন। 
১১ সেপ্টেম্বর ১৮৯৩। শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিদের নিয়ে শুরু হল ধর্মসভার অধিবেশন। দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হয়ে গেছে অপরাহ্ণে। একে একে প্রতিনিধিরা বক্তৃতা শেষ করছেন। এবার নরেনকে দাঁড়াতে হবে এই বিশাল জনসমষ্টির সামনে। সরস্বতীর কাছে প্রার্থনা। ‘‌জিহ্বাগ্রে তোমার একটুখানি স্পর্শ দাও মা।’‌ তিলধারণের স্থান নেই। পিছনে দাঁড়িয়ে অনেকে। সবাই প্রথম সম্বোধন করেছেন ‘‌ভদ্রমহিলা–ভদ্রমহোদয়গণ।’‌ এটা বিলিতি সভ্যতার রীতি। নরেন বললেন, ‘‌হে আমেরিকাবাসী ভগিনী ও ভ্রাতৃবৃন্দ.‌.‌.‌।’‌ সঙ্গে সঙ্গে করতালি সভাকক্ষ জুড়ে। সে করতালি থামতেই চায় না। করতালি থামলে সংক্ষিপ্ত একটি ভাষণ দিলেন, যার মর্মার্থ শ্রীরামকৃষ্ণের সেই ‘‌যত মত তত পথ’‌–এর বাণী। সব ধর্ম যে সমান সত্য, ভারতবর্ষের মানুষের এই চিরন্তন বিশ্বাসকেই তিনি তুলে ধরলেন।
কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের জয়গান করলেন না স্বামীজি। সব ধর্মই যে সমান সত্য, ভারতবর্ষের মানুষের এই সনাতন বিশ্বাসকেই তিনি সকলের সামনে তুলে ধরলেন। সেই ভাষণে তিনি বললেন:‌
‘‌হে আমেরিকাবাসী বোন ও ভায়েরা, আপনারা আমাদের যে আন্তরিক ও সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছেন, তার উত্তরে কিছু বলতে উঠে আমার হৃদয় অনির্বচনীয় আনন্দে পূর্ণ হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সন্ন্যাসী–‌সঙ্ঘের পক্ষ থেকে আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সব ধর্মের যিনি জননীস্বরূপ, তাঁর নামে আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আর ধন্যবাদ জানাচ্ছি সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের কোটি কোটি হিন্দু নরনারীর পক্ষ থেকে।’‌
‘‌এই সভামঞ্চের কয়েকজন বক্তা প্রাচ্যদেশের প্রতিনিধিদের সম্বন্ধে বলেছেন যে, দূরদেশ–‌আগত এইসব ব্যক্তিও বিভিন্ন দেশে সহিষ্ণুতার ভাবপ্রচারের গৌরব দাবি করতে পারেন— আমার ধন্যবাদ তাঁদের প্রতিও। আমি সেই ধর্মের অন্তর্ভুক্ত বলে গৌরব বোধ করি, যে–‌ধর্ম জগৎকে শিখিয়েছে পরমতসহিষ্ণুতা ও সর্বজনীন গ্রহিষ্ণুতার আদর্শ। আমরা শুধু সব ধর্মকে সহ্যই করি না, সব ধর্মকেই আমরা সত্য বলে বিশ্বাস করি। যে ধর্মের পবিত্র সংস্কৃত ভাষায় ইংরেজি ‘‌এক্সক্লুশন’‌ শব্দটি অনুবাদ করা যায় না, আমি সেই ধর্মের অন্তর্ভুক্ত বলে গর্ব অনুভব করি। আমি সেই জাতির অন্তর্ভুক্ত বলে গর্ব বোধ করি, যে জাতি পৃথিবীর সব ধর্মের ও সব জাতির নিপীড়িত ও শরণার্থী মানুষকে চিরকাল আশ্রয় দিয়ে এসেছে। আমি আপনাদের এ–‌কথা বলতে গর্ব অনুভব করছি যে, আমরাই ইহুদিদের খাঁটি বংশধরদের অবশিষ্ট অংশকে সাদরে বুকে করে রেখেছি, যে বছর রোমানদের অত্যাচারে তাদের পবিত্র মন্দির ধ্বংস হয়, সেই বছরেই তারা দক্ষিণ ভারতে এসে আমাদের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিল। জরাথুস্ট্রের অনুগামী মহান পারসিক জাতির অবশিষ্ট অংশকে যে ধর্মের মানুষেরা আশ্রয় দিয়েছিল এবং আজ পর্যন্ত যারা তাদের প্রতিপালন করে আসছে, আমি সেই ধর্মের অন্তর্ভুক্ত বলে গর্ব অনুভব করি।’‌
‘‌আমি আপনাদের কাছে একটি স্তোস্ত্রের কয়েকটি পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করব, যেটি আমি খুব ছোটবেলা থেকেই আবৃত্তি করে আসছি এবং কোটি কোটি নরনারী নিত্য যেটি পাঠ করেন:‌ ‘‌রুচীনাং বৈচিত্র‌্যাদৃজুকুটিলনানাপথজুষাং। নৃণামেকো গমস্তমসি পয়সামর্ণব ইব॥‌
—বিভিন্ন নদীর উৎস বিভিন্ন স্থানে, কিন্তু তারা সকলেই যেমন এক সমুদ্রে তাদের জলরাশি ঢেলে দেয়, তেমনি হে ভগবান, নিজের নিজের রুচির বৈচিত্র‌্যের জন্য সরল–‌জটিল নানা পথ ধরে যারা চলেছে, তাদের সকলের একমাত্র লক্ষ্যস্থল তুমিই।
‘‌বর্তমান মহাসম্মেলন, যা পৃথিবীতে এ–‌পর্যন্ত অনুষ্ঠিত শ্রেষ্ঠ সম্মেলনগুলির অন্যতম, তা কিন্তু গীতা–‌প্রচারিত সেই অপূর্ব মতেরই সত্যতা প্রতিপন্ন করছে, গীতার এই বাণীই ঘোষণা করছে:‌ ‘‌যে যে–‌ভাব আশ্রয় করে আসুক না কেন আমি তাকে সেইভাবেই অনুগ্রহ করে থাকি। হে অর্জুন, মানুষ সর্বতোভাবে আমার অভিমুখেই চলে।’‌
‘‌সাম্প্রদায়িকতা, গোঁড়ামি এবং তার ভয়াবহ ফলশ্রুতি ধর্মোন্মত্ততা বহুদিন ধরে এই সুন্দর পৃথিবীকে গ্রাস করে রেখেছে। জগৎকে তারা হিংসায় পরিপূর্ণ করেছে, মানুষের রক্তে পৃথিবীকে বারবার সিক্ত করেছে এবং জাতির পর জাতি এর ফলে হতাশায় নিমগ্ন হয়েছে। এই সমস্ত ভয়ঙ্কর পিশাচ যদি না থাকত, তাহলে মানবসমাজ এখনকার থেকে অনেক বেশি উন্নত হত। কিন্তু তাদের অন্তিম সময় উপস্থিত। এবং আমি আন্তরিকভাবে আশা করি, এই সম্মেলনের সম্মানে আজ সকালে যে ঘণ্টাধ্বনি হল তা যেন সমস্ত ধর্মোন্মত্ততা, তরবারি অথবা লেখনীর সাহায্যে অনুষ্ঠিত সর্বপ্রকার অত্যাচারের মৃত্যুঘণ্টা হয়;‌ একই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে যে সব মানুষ, তাদের পরস্পরের মধ্যের সমস্ত অসদ্ভাবের সমাপ্তি ঘোষণা করুক ওই ঘণ্টাধ্বনি।’‌‌‌‌‌

মুখ্যমন্ত্রীর প্রণতি। শুক্রবার। ছবি: কুমার রায়

জনপ্রিয়

Back To Top