অনিন্দ্য জানা- নাম জানা হয়নি। জানার দরকার আছে বলেও মনে হয়নি। পসরা সাজিয়ে তিনি বসেছিলেন পার্ক সার্কাস ময়দানের উল্টোদিকের ফুটপাথে।‌ লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের অদূরে। পাশ দিয়ে কলকল করে বয়ে যাচ্ছে সন্ধ্যাবেলার কল্লোলিনী কলকাতা। অনর্গল। অবিরল। 
পসরা বলতে গোটা চারেক কেটলি। জ্বলন্ত স্টোভ। কয়েকটা বিস্কুটের বয়াম। শীতের জবুথবু সন্ধ্যা তখন গড়িয়ে যাচ্ছে রাতের দিকে। লাল চা আছে কিনা‌ জানতে চাওয়ায় পরম আদরে একের পর এক কেটলিগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে তিনি বললেন, ‘সব হ্যায় স্যর। দুধ–চায় হ্যায়। লাল–চায় হ্যায়। ফিকা–চায় হ্যায়। নিম্বু–চায় হ্যায়। যো চাহিয়ে সব হ্যায়। তা কি কোই মায়ুস না হো।’ কেউ যেন দুঃখী না হয়। কেউ যেন পছন্দসই স্বাদ না পেয়ে উদাস না হয়। তাঁর কাছে সব আছে। 
গণছুটির দিন। সাধারণতন্ত্র দিবসের সন্ধ্যায় একভিড় লোক জমেছে পার্ক সার্কাসে। গলি–মহল্লা থেকে পিলপিল করে বেরিয়ে আসছে মানুষের দঙ্গল। তাদের হাতে হাতে জাতীয় পতাকা। মুখে ‘আজাদি’র স্লোগান। খানিকটা কৌতূহলবশতই ঘুরতে ঘুরতে যাওয়া। যেমন যায় পথচলতি অথবা পথভোলা মানুষ। ময়দানের রেলিং ধরে মেলা দোকান বসেছে। তেলেভাজা, মুড়ি আর বিটনুন দিয়ে চিনেবাদাম–মাখা বিকোচ্ছে হুড়মুড়িয়ে। ভিতরে টিউবলাইটের আলোয় কাতার দিয়ে মানুষের মাথা। কেউ একজন  খালিগলায় মাইক্রোফোনে গাইছেন, ‘অ্যায় মেরে পেয়ারে ওয়াতন, অ্যায় মেরে বিছড়ে চমন, তুঝপে দিল কুরবান...’। 
চোঙা মাইকবাহিত হয়ে সেই গলা ছড়িয়ে যাচ্ছে আর ভিড়ের পিছন থেকে দু’পায়ের বুড়ো আঙুলের উপর ভর করে অদৃশ্য গায়ককে দেখার প্রাণপাত চেষ্টা করছেন এক প্রৌঢ়া। তাঁর ঠোঁট নড়ছে। সেই নড়াচড়ায় স্পষ্ট পড়া যাচ্ছে ‘...‌তুঝপে দিল কুরবা‌ন।’ যেমন আন্তর্জাতিক ম্যাচ শুরুর আগে স্টেডিয়ামের পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে বাজতে–থাকা ‘জনগণমন’র সঙ্গে ঠোঁট নড়তে থাকে বিরাট কোহলি–হরমনপ্রীত কাউর–সুনীল ছেত্রী–মনপ্রীত সিংদের। 
উল্টোদিকের ফুটপাথের পাশে গাড়ির লম্বা লাইন। ছুটি কাটাতে বেরোন খুশিয়াল শহর দু’দণ্ড থামছে। ‌‌গাড়ি থেকে নামছে। পায়ে পায়ে এগোচ্ছে ময়দানের দিকে। যেতে যেতে থামছে কম্বলের মতো ধুসো সোয়েটার, মাঙ্কি ক্যাপ আর মলিন ট্রাউজার্সের মানুষটার সামনে। কেউ দুধ–চা। কেউ লাল চা। কেউ চিনি ছাড়া চা। কেউ লেবু চা। যে যা চাইছে, তিনি সামনে রাখা কেটলি থেকে ঢেলে এগিয়ে দিচ্ছেন ছোট্ট ছোট্ট কাগজের কাপে। কেউ যেন দুঃখ না পান। চা খেয়ে উচ্ছিষ্ট কাপ ফেলার জন্য এদিক–ওদিক তাকানোয় আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন পাশে রাখা জঞ্জাল ফেলার পাত্র। 
কী আশ্চর্য!‌ তাঁর বসার ছোট্ট টুলটার পাশেই তিনধাপের ইট–বাঁধানো বেদি। সেখান থেকে মাথা তুলেছে পতাকা ওড়ানোর স্তম্ভ। সাধারণতন্ত্র দিবসে ওই স্তম্ভেও নিশ্চয়ই উড়েছিল জাতীয় পতাকা। যে পতাকার পাদদেশে বসে পাশাপাশি সাজানো কেটলিগুলোর দিকে তাকিয়ে তিনি সম্ভবত নিজের অজ্ঞাতসারেই ভিন্ন–ভিন্ন স্বাদ–বর্ণ–গন্ধের সহাবস্থানের কথা বলছিলেন। বলছিলেন, কেউ যেন দুঃখ পেয়ে না ফেরেন। আশ্চর্যই বটে। 
এই চা–ওয়ালাকে দেখতে দেখতেই ঝপ করে মনে পড়ে গেল ওই চা–ওয়ালার কথা। আসলে প্রাক্তন চা–ওয়ালা। তিনি এখন আর চা বিক্রি করেন না। বরং মহা আড়ম্বরে ‘চায়ে পে চর্চা’ করেন। অতীতে চা ফেরি করার স্মৃতিচারণ করেন। আসলে সেই অতীতকে বিপণন করেন। রোমান্টিসাইজ করেন। এটা বোঝাতে যে, কোথা থেকে কোথায় উঠে এসেছেন তিনি। ঠিকই। কোথায় গুজরাতের এক অখ্যাত স্টেশনে চায়ের গুমটি। আর কোথায় দেশের রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকার সিংদরজায় রেসকোর্স রোড!‌ কোথায় চায়ের কেটলি–হাতে দরিদ্র ঘরের সন্তান। আর কোথায় মহার্ঘ স্যুটের ভিভিআইপি!‌ বিশ্বাস্য করে বললে রূপকথার মতো চমকপ্রদ উত্থানই বটে। যেমন তিনি বলেছিলেন ২০১৪ সালে। তারপর আবার ২০১৯ সালে। আর দেশের অধিকাংশ মানুষ তাঁর ‘আমি তোমাদের লোক’ উদাহরণে মজে গিয়েছিল। 
সাধারণতন্ত্র দিবসের সন্ধ্যায় পার্ক সার্কাসের মধ্যবয়সী চা–ওয়ালার কথা শুনতে শুনতে (‌তাঁরও তো নিজস্ব ‘স্বচ্ছ ভারত’ আছে অদূরে রাখা জঞ্জাল ফেলার পাত্রটিতে)‌ মনে হচ্ছিল, গুজরাতের চা–ওয়ালার কাছেও এমন সার সার প্রতীকী কেটলি থাকতে পারত না?‌ যার একেকটায় একেক স্বাদ। কিন্তু কারও সঙ্গে কারও বিরোধ নেই। সকলেই নিজের নিজের স্বাদ নিয়ে পাশাপাশি দিব্যি থাকত। আর তিনি আদর করে তাদের গা ছুঁয়ে বলতেন, ‘সব আছে। কেউ যেন দুঃখ পেয়ে ফিরে না যায়।’
কিন্তু ওই চা–ওয়ালা তা বলেননি। বলেন না। বরং তিনি বলেন, ‘হামলাকারীদের পোশাক দেখে চিনে নিন!‌’ বলেন, ‘শাহিনবাগ আসলে দেশ বিভাজনের চক্রান্ত!‌’ যখন বহিরাগতদের রডের আঘাতে কপাল ভেটে রক্ত ঝরতে থাকে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ার, তখন আবার কিছু বলেন না। যখন জাতির জনকের মৃত্যুদিনে জনতা এবং পুলিশে আকীর্ণ রাজপথে খোলা পিস্তল হাতে ছুটে এসে এক ‘ভক্ত’ গুলি চালায় নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের উপর, তখনও কিছু বলেন না। তখন তিনি মাথা ঠোকেন অহিংসার পূজারি বাপুর রাজঘাটে সমাধিতে। 
মনে হচ্ছিল, ফুটপাথে পসরা সাজিয়ে বসা আপাত–অশিক্ষিত এই চা–ওয়ালা নিজস্ব পদ্ধতিতে যে গভীর দর্শন এবং গভীরতর জীবনবোধের কথা এত সহজে বলতে পারেন, করতে পারেন, তা করতে পারেন না ওই চা–ওয়ালা‌?‌ তাঁরই তো দেখার কথা ছিল, যাতে কেউ যেন দুঃখ না পায়। যাতে কেউ উদাস না হয়। তাঁরই তো বলার কথা ছিল, ‘যো চাহিয়ে সব হ্যায়। তা কি কোই মায়ুস না হো।’ 
পারেন না। এই চা–ওয়ালার কাছে হেরে যান ওই চা–ওয়ালা। কলকাতার হতদরিদ্র, ছিন্নবস্ত্র ফুটপাথবাসীর সহজ জীবনদর্শনের কাছে অহরহ হেরে যান ভারতবাসীর দণ্ডমুন্ডের মালিক নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি। ‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top