মাঝখানে ভিজে পিচের ওপর দিয়ে এলোমেলো হাওয়ায় বিষাক্ত স্যুইংয়ের ঝঞ্ঝাট সামলে আরামবাগ হ্যাচারিজ এখন আত্মবিশ্বাসী ব্যাটে চলেছে হাফ সেঞ্চুরির দিকে। সরাসরি নিযুক্ত কর্মী ১৭০০, অপ্রত্যক্ষভাবে জীবিকা সংস্থান করেন আরও সাত–‌আটশো। ব্যবসার আয়তন বছরে ৪০০ কোটি টাকা, আশা করা হচ্ছে চলতি বছরে বাড়বে প্রায় ২০%। বাড়বে প্রসেসিং, বাড়বে রপ্তানি। বাড়বে উৎপাদনে বৈচিত্র্য। পাশাপাশি বাড়ছে–‌বাড়বে নিজস্ব দোকানের সংখ্যাও। ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রসূনকুমার রায়ের কাছে শুনলেন ধ্রুবজ্যোতি নন্দী

●‌ আজকাল বহু প্রতিষ্ঠানই আর পরবর্তী প্রজন্মকে পারিবারিক ব্যবসায় টানতে পারছে না। সেই সমস্যা কি আরামবাগ হ্যাচারিজের কখনও হয়েছে?
❏‌ সৌভাগ্যবশত, না। আরামবাগ থেকে কৃষিভিত্তিক নানা রকম ব্যবসা শুরু করেছিলেন আমার বাবা বলাইকৃষ্ণ রায়। সার তৈরি, বীজ তৈরি, সে–‌সবের ডিস্ট্রিবিউশন থেকে কোল্ড স্টোরেজ ইত্যাদি অনেক কিছু। তার সঙ্গে ছিল ২০০০ ডিম পাড়ার মুরগির একটা পোল্ট্রি। সেটা অবশ্য লোকসানেই চলত। বাবা চাইলেন ওই পোল্ট্রির ব্যবসাতেই জোর দিতে, আরও ভাল করে ব্যবসাটা করতে। তারই সূত্রে আমি ব্যবসাতে এলাম। সেটা ১৯৭৩। পশ্চিমবঙ্গে তখন এক দিনের মুরগি পাওয়া খুব মুশকিল। প্রায় সবই আনতে হত অন্য রাজ্য থেকে। বাবা দু–‌জন টেকনিকাল এক্সপার্ট—  ননীগোপাল চক্রবর্তী আর এক ভদ্রলোক ছিলেন মিস্টার নন্দী বলে,  তাঁদের পরামর্শ নিলেন। এক দিনের ২০০০ ব্রয়লার মুরগি কিনে একটা ব্রিডিং স্টক তৈরি হল। ৬ মাস পরে সেই সব মুরগি ডিম দিতে শুরু করলে ইনকিউবেটরে ২১ দিন রেখে সেই সব ডিম ফুটিয়ে, খামারে যারা ব্রয়লার চাষ করবে তাদের কাছে সদ্যোজাত মুরগির বাচ্চা বিক্রি করা চালু হল। আমাদের তখন আছে ৪০০০ ক্যাপাসিটির ইনকিউবেটর। কিন্তু বিক্রি করতে গিয়ে দেখা গেল, যে পরিমাণে মুরগির বাচ্চা বেরোচ্ছে, কেনার তত লোক নেই! মানে, বিক্রির জন্যে ৪০০০ বাচ্চা আছে। তার মধ্যে ২০০০ বিক্রি হল, কিন্তু বাকি ২০০০ পড়েই থাকল। বাবা বললেন, না। এদের নষ্ট না–‌করে আমরাই ব্রয়লারের খামার করব। সেটাই শুরু। ব্রিডিং ফার্মের পাশাপাশি আমরা ব্রয়লার ফার্ম হয়ে উঠলাম। আজ ৪৫ বছরের মাথায় আরামবাগের ইনকিউবেটর ক্যাপাসিটি ১১ লক্ষেরও বেশি, হাতে ৩.৫ লক্ষ ডিম–‌পাড়া মুরগি, তাদের ডিম থেকে সপ্তাহে ৮–‌৯ লক্ষ বাচ্চা পাওয়া যাচ্ছে। তারা হয় আমাদের খামারে, নয়তো আমাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ কোনও খামারে ৬ সপ্তাহ ধরে বড় হচ্ছে। তখন মোটামুটি তাদের ২ থেকে ২.৫ কেজির মতো ওজন হয়। সেই সব মুরগির তিন ভাগের মধ্যে দু–‌ভাগ বাজারে চলে যায়, আর বাকি এক ভাগ চলে আসে ইলমবাজারে আমাদের প্রসেসিং প্লান্টে। সেখানে প্রতি শিফটে ৩০ হাজারের মতো মুরগি কেটে ৩ টনের মতো মাংস প্রসেস করা হয়। প্লান্ট চলে দিনে ২ শিফট, সপ্তাহে ৬ দিন। সেখান থেকে মুরগির মাংস যায় কেএফসি–‌তে, বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট কিচেনে, রেলের কিচেনে, বিভিন্ন পাঁচতারা হোটেলের রেস্তোরাঁর মতো সম্ভ্রান্ত জায়গায়। এছাড়া আমাদের নিজস্ব দোকান আরামবাগ ফুড মার্ট আর আরামবাগ চিকেন থেকে তো বিক্রি হয়ই, তার সঙ্গে হোম ডেলিভারিও চালু করেছি আমরা। ফুড মার্টের ব্যবসা পুরোপুরি দেখছে আমার বড় মেয়ে বিয়াস। তার মানে, তৃতীয় প্রজন্মও মসৃণভাবে ঢুকে পড়েছে ব্যবসাতে। সেই ভরসায় আরামবাগ হ্যাচারিজও ডানা মেলতে তৈরি হচ্ছে।

●‌ বার্ড ফ্লুয়ের ধাক্কায় মাঝখানের টালমাটাল সময়টা তাহলে একেবারেই অতীত?
❏‌ সেটা যে কত বড় ধাক্কা ছিল, আগে তার আন্দাজটা আপনাকে দিই। বার্ড ফ্লু তো হচ্ছিল দেশি মুরগির। কিন্তু খবরটা প্রচারের সময় দেশি মুরগি আর পোল্ট্রি চিকেন আলাদা করা হল না। সরকারও সেদিকটায় নজর দিল না। ফলে আতঙ্ক ছড়াল, লোকে মুরগি খাওয়াই ছেড়ে দিয়েছিল। ২০০৮ সালে বার্ড ফ্লুয়ের খবর যখন আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে, আমাদের হাতে তখন ৪ কন্টেনার বোঝাই ৬০০ টন মুরগির মাংস রপ্তানির অর্ডার ছিল সৌদি আরব থেকে। তার মধ্যে ২ কন্টেনার জাহাজে উঠে রওনা দিয়েছে। পুরোপুরি বাতিল হয়ে গেল সেই এক্সপোর্ট অর্ডার। জাপানে রপ্তানির জন্যে মারুগেনি–‌র সঙ্গে চুক্তি হয়ে আছে আমাদের। জাপানিরা তখন আমাদের ইলমবাজারের প্লান্টে এসে ট্রেনিং দিচ্ছে সেই রপ্তানির জন্যে। চুক্তি বাতিল করে ফিরে গেল তারা।  আরামবাগ হ্যাচারিজের রিজার্ভে ছিল প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। টাকাটা উধাও হয়ে গেল ৬ মাসের মধ্যে। এত বড় সঙ্কট সামলে উঠতে স্বাভাবিকভাবেই বেশ কয়েক বছর সময় লেগেছে। অনেক চেষ্টায়, অনেকের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত সেটা সম্ভব হয়েছে। এখন আমরা আবার মন দিয়েছি ব্যবসা সম্প্রসারণে।

●‌  আর জিএসটি–‌র ধাক্কা?
❏‌ শুরুতে সেটাও নড়িয়ে দিয়েছিল। ভারত সরকার মুরগি চাষে উৎসাহ দেওয়ার কথাই বলে এসেছে এতদিন। ফলে সোয়া মিলের মতো মুরগির খাবার তৈরির কাঁচা মালে এতদিন কোনও ভ্যাট ছিল না। সেখানে ৫% জিএসটি চাপায় আমাদের খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে কেএফসি–‌র খাবারে ২৮% জিএসটি বসায় ওদের চাহিদা প্রায় ২০% কমে গিয়েছিল। এখন অবস্থাটা সামলে নেওয়া গেছে।

●‌ কত লোক কাজ করছেন এখন? ব্যবসার আয়তনই বা কী দাঁড়িয়েছে? এখান থেকে কী হারে ব্যবসা বাড়বে বলে আশা করছেন?
❏‌ এই ব্যবসাতে একদিকে যেমন বিনিয়োগ লাগে অনেক, পাশাপাশি তেমন কাজের সুযোগও তৈরি হয় প্রচুর। আমাদের কাছে এখন সরাসরি চাকরি করছেন ১৭০০ কর্মী, আর আমাদের সঙ্গে চুক্তিতে মুরগি চাষের সূত্রে যুক্ত আরও ৭০০/৮০০ মানুষ। ১০ লক্ষেরও বেশি মুরগির ছানা বড় করতে দিনে ৪০০ টন চিকেন ফিড, মানে মুরগির খাবারের দরকার হয়। এই খাবারটা আসে শিলিগুড়ি, ইলমবাজার আর আরামবাগে আমাদের ফিড প্লান্ট থেকে। ইলমবাজারের প্রসিং প্লান্টে তৃতীয় শিফট চালু করে প্রসেসড মিটের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গত বছর আমাদের ব্যবসা ছিল মোটামুটি ৪০০ কোটি টাকার। সব মিলিয়ে আশা করছি এখান থেকে বছরে ২০% হারে ব্যবসা বাড়বে। কারণ, ফুড মার্ট আর চিকেন মিলিয়ে আরামবাগের নিজস্ব দোকানের সংখ্যা এখন ৯৫। সেটা ২০১৯–‌এর মধ্যে ২০০–‌তে নিয়ে যাওয়ার আয়োজন চলছে। পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে আরামবাগের দোকান। ওদিকে, জাপানে রপ্তানির ব্যাপারেও আবার কথাবার্তা চলছে।

●‌  রেডি–‌টু–‌কুক বা ‘ভেজে খাও’ জাতীয় খাবার চালু করার কথা ভাবছেন না?
❏‌ অবশ্যই ভাবছি। বস্তুত, জ্যান্ত মুরগি বা মুরগির মাংসের পাশাপাশি এবার আমরা জোর দিতে চলেছি রান্নাকরা খাবার কিংবা রান্নার–‌জন্যে–‌রেডি খাবারে। আরামবাগের সালামি–‌হট ডগ–‌সসেজের পাশাপাশি কাবাব থেকে ফ্রায়েড চিকেন, রান্নাকরা বেশ কিছু খাবার তো এখনই বিক্রি হচ্ছে। ভাবা হচ্ছে সেই তালিকায় আরও বেশ কিছু খাবার যুক্ত করার কথা। পাশাপাশি, ২০১৯ থেকে আপনারা বাজারে পাবেন আরামবাগের ব্রেডেড চিকেন। ফ্রিজ থেকে বার করে ভেজে নিয়ে খেলেই হল। এই ধরনের জিনিসগুলো নিয়েই ব্র্যান্ড হিসেবে সারা দেশের বাজারে আত্মপ্রকাশ করবে আরামবাগ। 

জনপ্রিয়

Back To Top