সুচিক্কণ দাস: গণতন্ত্র ও মধ্যপন্থা ছেড়ে ইউরোপ নির্ধারকভাবে এবার দক্ষিণপন্থার দিকে ঝুঁকবে কিনা,  ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচনের আগে এই আশঙ্কাই প্রবল ছিল  মহাদেশের রাজনৈতিক মহলে। তবে ভোটের ফল বেরনোর পর ফিরেছে স্বস্তি। দেখা যাচ্ছে, মধ্যপন্থী দক্ষিণ ও বাম দলগুলি, যারা এতদিন ভোটারদের আস্থা অর্জন করেছিল, তারাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৭৫১ আসনের মধ্যে প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ ধরে রাখতে পেরেছে। তবে গতবারের তুলনায় তাদের হাতছাড়া হয়েছে ৮০টি আসন। অন্যদিকে আশার কথা এই যে, লিবারাল ও গ্রিন পার্টি পেয়েছে গতবারের চেয়ে ৫০টি বেশি আসন। বিশেষ করে ইউরোপ জুড়ে পরিবেশবাদী গ্রিনদের সাফল্য উল্লেখ করার মতো। কট্টরপন্থী বামেরা এবার ভোটে তেমন সুবিধে করে উঠতে পারেনি। তবে উল্লেখযোগ্য হারে না হলেও কিছুটা শক্তি বেড়েছে পপুলিস্ট ও জাতীয়তাবাদী শক্তির। সামগ্রিক স্বস্তির মধ্যে এটা উদ্বেগের রেখা। 
পাঁচ বছর আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৪২.৬%। এবার ভোটদানের হার ৫০.৫%। ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও বেশি মানুষ যে চিন্তিত এবং তাঁরা ভোটে বেশি বেশি করে অংশ নিচ্ছেন, এটা খুবই আশার কথা। আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে যে দুই শক্তির হাতে, সেই ফ্রান্স ও জার্মানিতে চাপে রয়েছে শাসকদল। 
জার্মানিতে এবার ভোটদানের হার ৬০ শতাংশের বেশি। এখানে শাসক দল দক্ষিণপন্থী ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং বামপন্থী সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির ফল যথেষ্টই খারাপ। সিডিইউ ২৯% ভোট পেলেও আগের বারের তুলনায় তাদের ভোট কমেছে ৬%–‌এর বেশি। এসপিডি–‌র ভোট ১৬%, গতবারের চেয়ে ১১% কম। ৭৩ বছরের পুরনো ঘাঁটি ব্রেমেন হাতছাড়া হয়েছে এসপিডি–‌র। লিবারাল ফ্রি ডেমোক্রেটিক পার্টি ও পূর্বতন পূর্ব জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির উত্তরসূরি ডাই লিংকে দলও এবার ৬% ভোট কম পেয়েছে। সব মিলিয়ে পুরনো পরিচিত রাজনৈতিক শক্তিগুলির সমর্থন ক্রমহ্রাসমাণ।
অন্যদিকে জার্মানিতে পরিবেশবাদী দল গ্রিনেরা এবার পেয়েছে ২০.৫% ভোট। গতবারের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি। সিডিইউ ও এসপিডি থেকে প্রায় ১০ লক্ষ ভোটার এবার সরে গেছেন গ্রিন পার্টির দিকে। ১৬ থেকে ৩৪ বছর বয়স্কদের মধ্যে এবার ৩৪% ভোট দিয়েছেন গ্রিনদের পক্ষে। একই প্রবণতা পর্তুগাল ও আয়ারল্যান্ডে। সবুজের এই অভিযান আশার বাণী শুনিয়েছে গোটা ইউরোপ জুড়ে।
ফ্রান্সে মারি লা পেনের চরম দক্ষিণপন্থী দল ন্যাশনাল রালি ২৩.৩ শতাংশ ভোট পেয়ে রয়েছে একেবারে সামনের সারিতে। এরপরেই রয়েছে ম্যাঁক্রোর ‌‘‌লা রিপাবলিকে এন মার্চে’‌। তাদের ভোট ২২.৪%। লা পেন ও ম্যাঁক্রোর দল মিলিতভাবে পেয়েছে ৪৫% ভোট। যারা ফ্রান্সের পুরনো বামপন্থী শক্তি সেই সোশ্যালিস্টরা পেয়েছে মাত্র ৬.২% ভোট। তেমনই ঐতিহ্যশালী দক্ষিণপন্থী লে রিপাবলিকেনস দল পেয়েছে ৮.৫% ভোট। অথচ গ্রিন পার্টি তাদের ভোট দ্বিগুণ বাড়িয়ে পেয়েছে ১৩.৫%। আবার ১৭ শতাংশ ফরাসি এবার ভোট দিয়েছেন ডি বাট লা ফ্রান্স, বামপন্থী জেনারেশন, কমিউনিস্ট পার্টি, পার্টি অ্যানিম্যালিস্টে এবং এ ধরনের ছোটখাট ১২টি দলকে। তার মানে ফ্রান্সে এখন এমন কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শ নেই, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। রাজনৈতিক সমর্থনের এই বিভাজন আদৌ আরও কোনও গভীর সঙ্কটের উৎস কিনা তা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। 
ব্রেক্সিট এতদিনে কার্যকর হলে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ভোট হত না ব্রিটেনে। তা না হওয়ায় এবার ব্রিটেনে ভোট পড়েছে ৩১%। ভোটের মাত্র চার মাস আগে তৈরি হওয়া নাইজেল ফারাজের ব্রেক্সিট পার্টি একাই পেয়েছে ৩১% ভোট। অন্যদিকে ব্রেক্সিটপন্থীরা যৌথভাবে পেয়েছে ৪৭% ভোট। তবে চরম দক্ষিণপন্থী ইউকেআইপি কোনও আসন পায়নি। ব্রিটেনেও ভোট বেড়েছে গ্রিনদের। তবে আশঙ্কার কথা, ব্রেক্সিট নিয়ে টানাপোড়েন থাকায় এবার গত ২০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম ভোট পেয়েছে কনজারভেটিভ পার্টি। ভোটপ্রাপ্তির তালিকায় তারা পঞ্চমে নেমে এসেছে। একই দশা লেবারের। তাদের স্থান এখন তৃতীয়। স্কটল্যান্ডে লেবারকে মুছে দিয়ে জায়গা করে নিয়েছে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি।
এই তিন দেশের ঠিক উল্টো অবস্থানে রয়েছে ইতালি, পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরি। কট্টর দক্ষিণপন্থী হিসাবে পরিচিতি ইতালির অভ্যন্তরীণ মন্ত্রীর সংগঠন ‘‌লিগ’‌ ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এবার তাদের শক্তি বাড়িয়েছে। গতবার লিগের আসন ছিল ৫। এবার বেড়ে হয়েছে ২৮। প্রাপ্ত ভোট ৩৪%। একইভাবে হাঙ্গেরির দক্ষিণপন্থী দল, প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানের ফিদেজ পেয়েছে ৫৩% ভোট। ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পর এই প্রথম এত বেিশ মানুষ ভোট দিয়েছেন হাঙ্গেরিতে। পোল্যান্ডের ক্ষমতাসীন ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি পেয়েছে ৪৬% ভোট। ১৯৮৯ সালের পর পোল্যান্ডের কোনও রাজনৈতিক দল এত ভোট পায়নি। এই দুই গণতন্ত্রবিরোধী, কট্টরপন্থী দলের শক্তিবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইউরোপীয় ইউনিয়ন–বিরোধী জোটের ক্ষমতা বাড়াবে। 
পুরো ইউরোপের চালচিত্র যদি আমরা একসঙ্গে বিচার করি তাহলে দেখব, ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়ে মহাদেশের নাগরিকদের আগ্রহ বাড়ছে। কিন্তু জার্মানি, ফ্রান্স কিংবা ব্রিটেনের যারা পুরনো প্রভাবশালী দল, জার্মানিতে সিডিইউ ও এসপিডি, ফ্রান্স লে রিপাবলিকেনস ও সোশ্যালিস্ট, ব্রিটেনে কনজারভেটিভ ও লেবার, এদের সমর্থন ক্রমশ কমছে। বিশেষত ব্রেক্সিট নিয়ে টালবাহানা করায় তলানিতে ঠেকেছে কনজারভেটিভ ও লেবারের শক্তি। বদলে মধ্যপন্থী দলগুলি তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে পেরেছে। আবার ইতালি, হাঙ্গেরি বা পোল্যান্ডের মতো দেশে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ব্রিটেনে দক্ষিণপন্থী দল ইউকেআইপি তেমন সুবিধা করতে না পারলেও, ফ্রান্সে লা পেনদের শক্তি কিন্তু পুরোপুরি ক্ষয় হয়নি। এসবের মাঝে গ্রিনদের শক্তি বেড়েছে দ্বিগুণ। পরিবেশ সঙ্কট এখন ভাবাচ্ছে আরও বেশি মানুষকে। এককথায়, ইউরোপের পুরনো রাজনৈতিক শক্তিগুলির প্রতি ইউরোপের মানুষের আগের মতো আর আস্থা নেই। অথচ এরাই এতদিন ইউরোপীয় পার্লামেন্টকে নিয়ন্ত্রণ করত। মানুষ এখন মধ্যপন্থী লিবারাল ও পরিবেশপন্থী গ্রিনদের দিকে ঢলছেন। অন্যদিকে যারা কট্টর দক্ষিণপন্থী তারা সমর্থন বাড়ানোর আশায় আরও বেশি দক্ষিণপন্থার আশ্রয় খুঁজছে। এর মানে স্থিতাবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমছে। তুলনায় জাতীয়তাবাদ ও পপুলিজমের ওপর আস্থা বাড়ছে। ওদিকে ২০২০–‌র প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য তৈরি হচ্ছে আমেরিকা। সেখােনও সেই স্থিতাবস্থা বনাম ট্রাম্পের জাতীয়তাবাদের বর্ণালিতে তৈরি হচ্ছে নির্বাচনী লড়াইয়ের ক্ষেত্র। এমনকী ভারতেও মোদির বিপুল জয় হিন্দুত্ব ও জাতীয়তাবাদের মিশেলের জয়। ইউরোপও এই গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের বাইরে নয়। বিংশ শতকের সংসদীয় গণতন্ত্র, উদারতাবাদ, বহুত্ববাদ, যা আমরা লালিত হতে দেখেছি ইউরোপ, আমেরিকায় এবং ভারতের মতো উপনিবেশমুক্ত  তৃতীয় বিশ্বের কিছু দেশে, একুশ শতকে সেই ভাবধারা কি টিকবে? নাকি তার জায়গা নেবে পপুলিজম, ক্ষুদ্র জাতীয়তাবাদ কিংবা কট্টর দক্ষিণপন্থা? সব মহাদেশ জুড়েই চলছে মতাদর্শের এই সংগ্রাম। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয় দপ্তর ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ফলাফল নিয়ে তাই যথার্থভাবেই মন্তব্য করেছে, পপুলিস্ট বা জাতীয়তাবাদীদের শক্তি বিশ্বের অনেক জায়গায় বাড়ছে। তবে যতটা শক্তি সঞ্চয় করবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল, ইউরোপীয় পার্লামেন্টে তারা ততটা শক্তি নিয়ে ফিরতে পারেনি। এটা নিশ্চয়ই স্বস্তির। তবে শ্যাম্পেনের বোতলের ছিপি খোলার সময় এখনও আসেনি।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top