প্রদ্যুৎ গুহ‌

‘‌ভারতরত্ন’‌ প্রণব মুখার্জি আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তঁার কর্ম, ব্যবহার, বক্তব্য যুগে যুগে আমাদের সাহস জোগাবে, সঙ্গে উদ্বুদ্ধ করবে দেশসেবায়। মানুষকে নতুন করে ভালবাসতে শেখাবে। ওঁর দেখানো পথ আগামীতে নতুন নতুন পথের সন্ধান দেবে।
যে কয়েকজন কংগ্রেস নেতা সেদিন ইন্দিরা গান্ধীর দুঃসময়ে তঁাকে ছেড়ে যাননি, তঁাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন প্রণবদা। যখন বাংলার রাজনীতিতে ধস নেমেছিল, প্রায় সব বড় নেতাই দল ছেড়ে নতুন দলে চলে যান। কিন্তু প্রণবদা বাংলা এবং ভারতবর্ষের প্রান্তরে প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে কংগ্রেসকে সঙ্ঘবদ্ধ রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর পাশে দঁাড়িয়ে সাহসিকতার সঙ্গে আদালতে দৃপ্তকণ্ঠে বলেছিলেন, ক্যাবিনেট মিনিস্টার ‌হিসেবে যা কিছু কাজ করেছি, তা আমি করেছি। এর জন্য প্রধানমন্ত্রীর কোনও দায়িত্ব নেই বা ছিল না। শাহ কমিশন ওঁকে বলেছিল— প্রণববাবু আপনি বুদ্ধিমান, শিক্ষিত। আপনি বলুন ‘‌প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সব করেছেন’‌। উনি বলেছেন, ‘‌যা সত্য, তা বলেছি। সত্য ছাড়া মিথ্যা বলব না!‌‌’‌ 
অনেক অভিমান, অনেক অত্যাচার ওঁকে সহ্য করতে হয়েছিল, কিন্তু তিনি হার মানেননি। তাই তো ১৯৮০ সালে আবার কংগ্রেস ওঁর প্রায় একক প্রচেষ্টায় ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল। দল ছেড়েছিলেন বহু দিকপাল নেতা। পশ্চিমবঙ্গে সিদ্ধার্থবাবু, প্রিয়দা, সৌগতদা, সুদীপদা, কুমুদদার মতো যুব–ছাত্র আন্দোলনের নেতারা, কিন্তু নীচুতলার কর্মীরা দলে থেকে গিয়েছিলেন। বরকত সাহেব, অজিতদা, সোমেনদা, সুব্রতদার নেতৃত্বে আমরা সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছিলাম। ’‌৮০ সালে প্রণববাবু, বরকত সাহেব মন্ত্রী হলেন, আমি সর্বভারতীয় ছাত্র আন্দোলনের দায়িত্ব পেলাম। প্রণববাবু ও বরকত সাহেবের আশীর্বাদ নিয়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করলাম রাজীবজির নেতৃত্বে। হঠাৎ সঞ্জয় গান্ধীজি, তার পর ইন্দিরাজি চলে গেলেন। রাজীব গান্ধী দলের হাল ধরলেন। কিন্তু কিছু স্বার্থান্বেষী চক্র প্রণববাবুর বিরুদ্ধে চক্রান্ত শুরু করল এবং প্রণববাবু দল ছাড়তে বাধ্য হলেন। আমি সব জানতাম, ওঁকে বলেছিলাম, কিন্তু উনি বিশ্বাস করতে পারেননি। অনেক পরে রাজীবজি তঁার ভুল বুঝলেন, প্রণববাবুকে ফিরিয়ে আনলেন। তত দিনে দলের ক্ষতি হয়ে গেল। রাজীবজিকে বঁাচানো গেল না। 
আমি প্রায় ১০ বছর রাজীবজির সঙ্গে ছাত্র–যুব নেতা হিসেবে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি। সব বুঝতাম, কিন্তু অল্প বয়স বলে সব বলতে পারতাম না। এর পর প্রণববাবুর সঙ্গে দীর্ঘ দিন কাজ করেছি আইওয়াইসি–‌র সাধারণ সম্পাদক হিসেবে, পরে প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। একটা কথা বুঝতাম, প্রণবদা ছাড়া যেমন সর্বভারতীয় কংগ্রেস চলবে না, এদিকে প্রদেশ কংগ্রেসও চলবে না। তাই যখন ওঁকে দেখতাম, ওঁকে অনুসরণ করতাম। একটা প্রচেষ্টা সব সময় থাকত, দলটাকে এক করে রাখার। ওটা আমাকে শিখিয়েছিলেন রাজীবজি আর প্রণবদা। ওঁরা সব সময় বলতেন— দল আর দেশ, এই দুটিকে বঁাচাতে হবে। তবেই তো আমাদের অস্তিত্ব থাকবে।
প্রণবদা একেবারেই প্রচার–‌বিরোধী ছিলেন। ওঁর সঙ্গে আমি প্রায় ৩০ বছর সক্রিয় ভাবে দলের ও দেশের কাজ করেছি। আমি লক্ষ্য করেছি, ওঁকে ছাড়া সোমেনদা, প্রিয়দা, বরকতদা, অজিতদা কেউ দল চালাতে পারতেন না। রাজনৈতিক সাহায্য, অর্থনৈতিক সাহায্য এবং গঠনতন্ত্রকে কীভাবে মজবুত করা যায়, এটা উনি একধারে পশ্চিমবঙ্গ আর একধারে সর্বভারতীয় কংগ্রেসের জন্য লাগাতার করে গেছেন। এমনকী ছাত্র–যুবদের সমস্যা সমাধানে ওঁর অবদান অনেক। ব্যক্তিগত ভাবেও উনি বহু কংগ্রেস নেতাকে, ছাত্র–যুব নেতাকে সাহায্য করে গেছেন।
আমি বোধহয় একমাত্র রাজনীতিক, যে নাকি দলে প্রায় ৪০ বছর সক্রিয় কাজ করার পর ভারত সরকারে কাজ করেছি। তাও যে–‌সে জায়গায় নয়। প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক দপ্তর, অর্থ এবং সর্বশেষে ভারতবর্ষের সর্ববৃহৎ পাওয়ার সেন্টার রাষ্ট্রপতি ভবনে। এটা প্রণবদার জন্যই সম্ভব হয়েছিল। প্রণবদার লোকসভা নির্বাচনের দায়িত্ব নিয়ে যখন ওঁর জয় দু–‌দু’‌বার সুনিশ্চিত করতে পেরেছিলাম, তখন প্রণবদাও আমাকে ছাড়তে চাননি। উনি চেয়েছিলেন, ওঁর অসংখ্য গুরুদায়িত্বের ভাগ আমরা কেউ নিই। উনি আমাকে দল থেকে বেছে নিয়েছিলেন সরকারি কাজে। ওঁর আবেদন মানে আমার কাছে আদেশ। তাই সরকারি কাজে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা কোনও দিন না থাকলেও, প্রায় ১৪ বছর ওঁর সঙ্গে কাজ করেছি।
ওঁকে যত দেখতাম, অবাক হয়ে যেতাম। আর ভাবতাম, ভগবান প্রণববাবুকে কী দিয়ে গড়েছেন!‌ এক সঙ্গে কতগুলো কাজ করতে পারেন!‌ কথা বলছেন, কথা বলতে বলতেই ফাইল দেখছেন। আবার টেলিফোন এলে কাজ করতে করতেই কথা বলছেন। মানুষের সমস্যার সমাধানকে সব সময় নিজের কর্তব্য বলে মনে করতেন প্রণবদা। যে–‌কারণে দেশের সাংবাদিক, শিক্ষক, উপাচার্য, অধ্যাপক, সচিব, আমলা, রাজনীতিবিদ,‌ বিশিষ্ট ব্যবসায়ী থেকে অগণিত সাধারণ মানুষ এবং দলীয় কর্মীদের জন্য তঁার ছিল অবারিত দ্বার। দেখে অবাক হতাম, পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেববাবু, বিমানবাবু, সীতারাম ইয়েচুরি, করুণানিধি, বালাসাহেব ঠাকরে, মুলায়মজি, লালুজি, মায়াবতীজি, সুরজিৎ সিংজি— সবার আপনজন ছিলেন উনি।
মনে আছে, একবার প্রণবদা ‌ও তখন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং অসুস্থ জ্যোতি বসুকে দেখতে সল্টলেক ‌এসেছিলেন। তখন জ্যোতিবাবুকে বলতে শুনেছি, যদি কমিউনিস্টদের বুঝতে হয় তবে প্রণববাবুর কাছ থেকে জানতে হবে। আমি অবাক হয়েছিলাম। মনমোহন সিং সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলেন ‘‌ওই জন্যই তো আমি স্যরের সঙ্গে আপনার কাছে এসেছি।’‌ একবার করুণানিধির বাড়িতে প্রণবদার সঙ্গে গিয়েছিলাম। উনি প্রণবদাকে দেখে বললেন, ‘‌আসুন ‌বন্ধু,‌ আসুন’‌। বললেন, ‘‌আপনি না এলে ভরসা পাই না। আপনার–‌আমার সম্পর্ক প্রায় ৫০ বছরের। আপনি রাষ্ট্রপতি পদের জন্য দঁাড়িয়েছেন, ‌এটা আমার ভাগ্য বা কংগ্রেসের ভাগ্য নয়, এটা দেশের ভাগ্য।’ যখন বালাসাহেব ঠাকরের কাছে গিয়েছিলাম, উনি বললেন, ‘‌আপনি এলেন কেন?‌ আপনি একজন শিক্ষিত মানুষ, অভিজ্ঞ এবং ভাল মানুষ। আমরা তো বলেই দিয়েছি, আমরা ‌কংগ্রেস বুঝি না, আমরা আপনাকে ভোট দেব।’‌ যখন মুলায়ম সিং যাদব ও মায়াবতীজির কাছে যাওয়া হল, ওঁরা বললেন, ‌‘‌আপ তো হমারে পরিবার কে ‌দাদা‌ হ্যায়। ‌আপকো ছোড় কে কিস্‌কো ভোট দেঙ্গে’।‌‌ যখন ভারতীয় জনতা পার্টির এক বড় নেতাকে আমি নিজে দাদার জন্য ফোন করি, উনি বলেন, ‘‌‌হম সব দাদা কা হ্যায়’‌। ইয়েদুরাপ্পা, কর্ণাটকের নেতা, প্রণবদাকে ভোট দিয়েছিলেন। জগন্মোহন রেড্ডি কংগ্রেসের বিরোধিতা করলেও প্রণবদাকে ভোট দিয়েছিলেন। নাইডুজির ভোটও ছিল প্রণবদার জন্য। এটা না বললে অন্যায় হবে, আমাদের মুখ্যমন্ত্রী একটু রেগে ছিলেন। কিন্তু উনি যে প্রণবদাকেই ভোট দেবেন, আমি সেটা জানতাম। তাই উনি যেদিন বললেন, ‘‌আমরা সবাই দাদাকে ভোট দেব‌’‌, প্রণবদা সেদিন হেসে বলেছিলেন, ‘‌‌ও আমার অভিমানী বোন। ও আমাকে ভোট না দিয়ে পারে না।‌ ‌যাক, ভাল হল!‌’‌
প্রণবদাকে যত কাছ থেকে দেখেছি, তত অবাক হয়েছি উনি কীভাবে যে উত্তপ্ত লোকসভাকে ঠান্ডা মাথায় চালাতেন, উনি তো দলের নেতা ছিলেন এবং সেই অবস্থায় সমস্ত বিরোধী দলের নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করে একের পর এক বিল ‌পাশ করিয়ে নিতেন। দেখে অবাক হয়ে যেতাম। এই মানুষটাকেই আবার অবাক হয়ে দেখতাম রাতের বেলায় খুব ভাল ভাবে সবার সঙ্গে হাসতে হাসতে গল্প করতে। প্রণবদা ছিলেন এক বিচিত্র মানুষ, যঁাকে বোঝা যায় না, জানা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। উনি আজ নেই, কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস, উনি ছিলেন, আছেন, চিরকাল থাকবেন আমাদের সঙ্গে, দেশের সঙ্গে।‌

জনপ্রিয়

Back To Top