সুব্রত চট্টোপাধ্যায়: দেশটা আমাদের সেকুলার। কিন্তু ধর্মে একরকম বুঁদ। দেশে থাকার কথা এক বিশেষ জীবনযাপন প্রক্রিয়া। নেই। রাষ্ট্রীয় জীবনেও এখানে দেবদেবীরা মান্যতা পেয়ে যাচ্ছেন। নেতারা চলছেন আমজনতার নাড়ি বুঝতে বুঝতে। আমজনতা ডুবে ধর্মে। তো নেতারাও সেখানে ধর্মকর্ম ছাড়া একপা–ও চলতে পারেন?‌ চললে যে জনতা হাতছাড়া হবে!‌ তখন?‌ বুদ্ধিজীবীরা দেখছেন— ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে ধর্মপ্রাণরা ওঁদের দিকে ঢিল ছুঁড়বে। সুতরাং স্পিকটি নট। দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা লঙ্ঘিত হচ্ছে ধরে নিয়ে আপনি ছুটবেন আদালতে?‌ আইনজীবীদের কাছে?‌ ভিন্ন ভিন্ন জাতের সব আমমক্কেল নিয়ে ওঁদের কারবার। ধর্মে ঘা দিয়ে সেসবদের ঘাঁটাতে চাইবেন তাঁরা?‌ খরিদ্দার ফল্‌ করবে যে!‌ আগে চাই গণসংযোগ। কোথায় কোথায় মানুষের ভিড় সেখানে সেখানে যাও, মন্দির–‌হজ–‌তীর্থ জনতায় জনতায় ছয়লাপ। সেখানে যাও, ওদের মতো করে মায়ের পায়ের জবা হয়ে ফোটো, মানুষ খুশি হবে, হয়ে তোমার পাশে থাকবে, গণসংযোগ বাড়বে। এই হল সেকুলার দেশ। গণসংযোগের নামে ‘‌গো অ্যাজ ইউ লাইক’‌। ইহার নাম ভারত আমার ভারতবর্ষ। এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকি তুমি?‌
ছোটবেলা থেকেই এখানে মানুষকে ধর্মমনস্ক করে তোলার পাকাপাকি ব্যবস্থা। সবার প্রায় ছোটবেলাগুলো ধর্মে জারিত। খুদেরা চোখের সামনেই দেখছে— তাদের মাস্টারমশাইরা ধর্মে গা ঠেকিয়ে আছেন, পুজোর মন্ত্র পড়ছেন, নামাজ পড়ছেন। স্কুলে কর্তৃপক্ষ পড়ুয়াদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন— কাল অমুক পুজো, ক্লাস বন্ধ, তালপাতার বাঁশি বাজাবি আর মেলা ঘুরবি, ভক্তিভরে মাকে ডাকবি, পরশু থেকে যথারীতি ক্লাস। ক্লাসের এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলে, ‘‌ও, তোদের সেই রথটানাটানি?‌ রথে কারা যেন থাকে?‌ বন্ধুর উত্তর:‌ আমাদের এসব শুনে তোদের লাভটা কী শুনি?‌ ভাবুন একবার— ক্লাসেই ‘‌তোরা–‌আমরা’‌। নিজস্ব আইডেন্টিটির দিকে পা। কতবার কাজিয়া হয়েছে। একদল বলেছে, স্কুলমাঠে আমাদের অনুষ্ঠান করতে দিতে হবে। আরেক দল বলছে, তা কেন, এখানে তো আমাদেরটাই আবহমান কাল ধরে চলে আসছে। কাজিয়ার পর আপাতত কোনও পক্ষের কোনওটাই নয়। কিন্তু ক’‌বছর পর আবার যে–‌কে–‌সেই। কত কাজিয়াই হয়ে গেল, অথচ এরকম একটা সিদ্ধান্ত কোনওদিনই হল না যে— আসুন না, ওসব ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাখি, পাবলিক প্লেসে ওসব আর নয়। কত সেকুলার–‌সেকুলার সিদ্ধান্ত দেখুন তো। কিন্তু সেকুলার দেশে এমন সিদ্ধান্ত কোনওদিনই হল না। প্রতিক্ষণ আমাদের ভয় যে— কথা একটু এদিক–‌ওদিক হলেই দাঙ্গা। আর দাঙ্গায় ঘটিবাটি ঘরদোর সব পুড়ে ছাই হবে। খুদেরা এসব দেখতে দেখতেই বড় হচ্ছে। আর বড় হয়ে কোনও–‌না–‌কোনও পক্ষে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।
দেখুন না একসময় এখানে লক্ষ্মী ভাসান বন্ধ হওয়ার জোগাড়। কার্তিক ভাসান চৈত্রসংক্রান্তি মেলা নিয়েও বেশ হইচই। দুর্গা, গণেশ, সরস্বতী পুজো নিয়েও কথা উঠল। এক কথায় শিবঠাকুরের পুরো টিমটাই বিপাকে। আপাতচক্ষে মনে হল, সেকুলার দেশে বুঝি প্রকাশ্য পুজোপার্বণে বাধা পড়ছে। তাহলে কি কোনও বিজ্ঞান সংগঠন মাঠে নেমে গেল?‌ ও মা, শেষমেশ দেখি তা নয়। এটা দু’‌পক্ষের একটা কাজিয়া। একবার গুজরাটে কী দেখলেন? স্কুলে পুজোটা বাধ্যতামূলক করতে নির্দেশিকাও পাঠাল। যুক্তি দেখাল— ওটা নাকি ধর্মানুষ্ঠান নয়, একটা শিক্ষামূলক প্রক্রিয়া। ভারী অদ্ভুত যুক্তি!‌
উত্তর দিনাজপুরে এবার হলটা কী— জেলা প্রাথমিক সংসদের ছুটির তালিকা থেকে সরস্বতী পুজোটা বাদ পড়ে গেল। দেবীর জন্য কোনও ছুটিই বরাদ্দ হয়নি। কী হইচই!‌ পুজো বাদ?‌ প্রথম প্রথম মনে হতেই পারে— জেলা প্রাথমিক সংসদ বুঝি সেকুলার। পুজোবর্জন। দুঃসাহসিক কাজ। কিন্তু দু’‌দিন পর শোনা গেল, গতবারের তালিকাটাই নাকি এবার চালিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, সে–তালিকায় জানুয়ারিতে পুজো ছিল না, ছিল ফেব্রুয়ারিতে। এক নিমেষেই মেরামত হয়ে গেল তালিকা। আমজনতা তবেই ঠান্ডা হল। আজ বিদ্যার দেবীর পুজো নিয়ে উত্তাল হল সেকুলার দেশ। কিন্তু একসময় ছুটির তালিকা থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি বাদ পড়েছিল। মিনিমাম দুঃখপ্রকাশও হয়নি। ‘‌পালনীয়’‌ কথাটা লেখা থাকলেও অনেক স্কুলে দিনটি পালিতও হয় না। কোনও দুঃখপ্রকাশ নেই। প্রতিবাদও ওঠে না। সেবার বাংলা ভাষা দিবসে (‌১৯ মে)‌ ভোটগণনা হল। ভাষা দিবস ফ্লপ, পঁচিশে বৈশাখও নির্বাচন উপলক্ষে ফ্লপ। ১৯ মে–‌টা বরাদ্দ হল কেন?‌ উত্তর নেই। এ–সবের মাপ হয়, কিন্তু পুজোর ক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটলে উপায় থাকে না। জেলা প্রাথমিক সংসদের না–হয় হাত–‌পা বাঁধা। কোনও বিজ্ঞান সংগঠনও এগিয়ে এসে বলতে পারল না যে— এরকমটা হয়েছে তো কী হয়েছে, ঠিকই তো হয়েছে, তালিকাটা এইরকমই থাক না। সংশোধন কেন। ছুটি বরাদ্দ না হলেও কোনও স্কুল চাইল তো পুজো হল, না চাইল তো পুজো হল না। পুজো ঐচ্ছিক বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলতে পারত। কিন্তু সেকুলার দেশে এমন ঘটবে?‌ তাহলেই হয়েছে।
দেশটা সেকুলার। কিন্তু ঠিকঠাক চলছেই বা কারা। তারা ক’‌জন। ক’‌জনকে নিয়ে এদেশ সেকুলার। সর্বত্রই প্রায় ধর্মনির্ভরতা। আড়াল–‌আবডালের বালাই নেই। এভাবে আর কতকাল!‌ অনন্তকাল?‌ দিনবদলের ভোরটাই বা কতদূর?‌ ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top