দীপ্তেন্দ্র রায়চৌধুরী: কী হল, কেন হল, সাত দিন পরেও কিছু কি বোঝা গেল?‌ 
দেশের ইতিহাসে প্রথমবার সাংবাদিক বৈঠক করলেন চার বিচারপতি। বললেন, সুপ্রিম কোর্টের কাজকর্ম ঠিকঠাক চলছে না। বললেন, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা যদি না–থাকে তবে গণতন্ত্র বাঁচবে না। অভিযোগ অতি গুরুতর। কিন্তু তার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল না। সেটা ১২ তারিখের কথা। সেদিন ছিল শুক্রবার। জনমানসে প্রবল প্রতিক্রিয়া হল। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় উঠল। কেউ বললেন, চার বিচারপতি এক্কেবারে ঠিক কাজ করেছেন। কেউ বললেন, এভাবে শৃঙ্খলা ভেঙে ঘোর অন্যায় করেছেন তাঁরা। সাংবাদিক বৈঠকের অব্যবহিত পরেই মুখ্য বিক্ষুব্ধ বিচারপতি জে চেলমেশ্বরের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন সিপিআই নেতা ডি রাজা। আশ্চর্যের কথা, বিচারপতি দেখাও করলেন। ফলে অভিযোগ উঠল, বিচারপতিরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজ করছেন। আবার উল্টোদিকে এই জল্পনাও জোরদার হল যে সরকার বিচারবিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ করছে বলেই বিচারপতিরা এভাবে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন। 
তারপর শনি–রবিবার আদালত বন্ধ ছিল। সোমবার সকালে যথারীতি সব বিচারপতি লাউঞ্জে এলেন। তাঁদের মধ্যে কথাবার্তা হল। তারপর ওই চার বিচারপতি নিজেদের আদালতে (‌সিনিয়রিটির কারণে তাঁরা দুই, তিন, চার ও পাঁচ নম্বর এজলাসে বসেন, প্রধান বিচারপতি বসেন এক নম্বর এজলাসে)‌ মামলা শুনতে থাকলেন। কেন্দ্রীয় সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল, ৮৬ বছর বয়সী দিকপাল আইনজীবী কে কে বেণুগোপাল বললেন, ‘‌চা-‌খেতে খেতে পাঁচ বিচারপতি সব সমস্যা মিটিয়ে নিয়েছেন।’‌ সেদিনই সংবেদনশীল কিছু মামলা শোনার জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে তৈরি হল নতুন সংবিধান বেঞ্চ। তাতে বিক্ষুব্ধ চার বিচারপতি স্থান পেলেন না। পরদিন ওই বিচারপতিদের ঘনিষ্ঠমহল উদ্ধৃত করে খবর হল, গন্ডগোল মেটেনি। মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি ওই চার বিচারপতির সঙ্গে বৈঠকে বসলেন। ঠিক এই সময়েই প্রশান্ত ভূষণ কোনও প্রামাণ্য কারণ ছাড়াই একটি দুর্নীতির মামলায় প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে তদন্তের আর্জি পেশ করে বললেন, এই আর্জি নিয়ে যেন পাঁচ সিনিয়রমোস্ট বিচারপতি (‌যাঁদের মধ্যে চারজন সাংবাদিক বৈঠক করেছিলেন)‌ সিদ্ধান্ত নেন!‌
তারপর বিচারপতিদের মধ্যে আরও বৈঠক হয়েছে এবং হবে। কিন্তু গণতন্ত্র কেন বিপন্ন হয়েছিল অথবা বিপন্নতামুক্ত হয়েছে কী না, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। এর মধ্যে যোগেন্দ্র যাদব বিচারপতিদের প্রকাশ্য বিক্ষোভের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘এক অদৃশ্য হাত দেশের বিচারব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তাই বেছে বেছে এমন সমস্ত ব্যক্তিকে শীর্ষপদে বসানো হচ্ছে যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, যাতে দুর্নীতি ফাঁস করার ভয় দেখিয়ে তাঁদের ইচ্ছামতো চালনা করা যায়।’ ভয়ঙ্কর অভিযোগ। প্রশ্ন হল, এমন সব অভিযোগের নিষ্পত্তি বিচারপতিদের গোপন বৈঠকে মিটে যাবে কী করে?‌ আর সেভাবেই যদি মেটাতে হয়, তাহলে শৃঙ্খলা ও ঐতিহ্য ভেঙে বিচারপতিরা সাংবাদিক বৈঠক করলেন কেন?‌  বিশেষ করে জে চেলমেশ্বরের মতো একজন শ্রদ্ধেয় বিচারপতি (‌যিনি দীপক মিশ্রের সঙ্গে একই দিনে সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন) বললেন কেন গণতন্ত্র বিপন্ন হতে চলেছে? ‌ 
চার বিচারপতির সাংবাদিক বৈঠক ও তার আগে প্রধান বিচারপতিকে লেখা চিঠি থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট। তাঁরা মনে করছেন, তাঁদের সহকর্মী কিছু বিচারকের কিছু রায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করেছে। সেই কারণে তাঁরা জুনিয়র বিচারপতিদের পরিবর্তে সিনিয়রদের এজলাসে জনস্বার্থ মামলা ও সংবেদনশীল মামলাগুলি দেওয়ার দাবি করেন। বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি পি বি সাওয়ন্ত ও তিন অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট–বিচারপতি একটি খোলা চিঠিও লিখেছেন। তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, তাঁরা মনে করছেন, প্রধান বিচারপতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে মামলা বণ্টন করছেন। তাঁদের বক্তব্য, ‘‌যুক্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ ও ন্যায্য‌ভাবে’‌ বিভিন্ন এজলাসে মামলা বণ্টিত হলে তবেই মানুষ বুঝতে পারবেন যে ‘‌গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মামলাগুলির কোনও নির্দিষ্ট পরিণতির’‌ জন্য‌ ‘‌ক্ষমতার অপব্যবহার’‌ করা হচ্ছে না।
অর্থাৎ, সুপ্রিম কোর্টে মামলার নিষ্পত্তি মেরিট অনুযায়ী হচ্ছে না, অন্য কোনও বিবেচনা থেকে হচ্ছে। এবং জুনিয়র বিচারপতিরা ব্যর্থ হচ্ছেন। এসব কথা আমরা বললে আদালত অবমাননা হয়। কিন্তু বিচারপতিরা বলছেন, খোলা চিঠি লিখছেন। কাজেই কী ঘটছে, কেন কিছু বিচারপতিকে মামলা দিলে সুবিচার হচ্ছে না, তা জানার অধিকার আমাদের অবশ্যই আছে। এই ধরনের ঘটনায় অভিযুক্ত বিচারপতিরা সুপ্রিম কোর্টে থাকবেন কী করে?‌ তাঁদের তো ইমপিচ করা উচিত। কিন্তু ইমপিচ তো হাওয়ায় ভাসানো কথা বা ভাসা ভাসা অভিযোগের ভিত্তিতে হয় না। তার জন্য চাই তথ্য ও প্রমাণ। আমরা অপেক্ষা করছি। কিন্তু তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যাবে, এমন সম্ভাবনা তো দেখা যাচ্ছে না। এটাই চিন্তার কথা।
এটা অসম্ভব যে, বিক্ষুব্ধ চার বিচারপতি মনে করেছিলেন কিছু মামলা তাঁদের এজলাসে না–এলে গণতন্ত্র বিপন্ন হবে। এই বছরের শেষ দিনে তো চেলমেশ্বর, মদন লোকুর ও কুরিয়েন জোসেফ হয়ে যাবেন প্রাক্তন বিচারপতি। চতুর্থ বিদ্রোহী বিচারপতি রঞ্জন গগৈ অবসর নেবেন সামনের বছরের ১৯ নভেম্বর।‌ সেদিনই কি দেশে গণতন্ত্রের অবসান হবে?‌ তা তো নয়। কাজেই প্রাজ্ঞ বিচারপতিরা নিশ্চিত ভাবেই অন্য কিছু বলতে চেয়েছেন। কী সেই কথা?‌ কোনও মামলার রায় নিয়ে মতপার্থক্য তো প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে। তা ছাড়া, বিচার বিভাগের বাইরের কেউ সে কথা শুনে কী করবেন?‌ আমরা কোনও মামলার রায় শুনে বলার অধিকারী নই এই রায় সরকারকে খুশি করার জন্য বা বিরোধীদের খুশি করার জন্য দেওয়া হয়েছে। রায়ের সমালোচনা করা যায়, কিন্তু রায়ের অভিসন্ধি নিয়ে কিছু বললে বা লিখলে তা আদালত অবমাননা বলে গণ্য হয়। 
তাছাড়া অন্য একটি দিকও আছে। চার বিচারপতি যদি মনে করেন, কয়েকজন বিচারপতি সরকারের পক্ষ নিয়ে রায় দিচ্ছেন, তাহলে অভিযুক্ত বিচারপতিদেরও কোনও বক্তব্য থাকতে পারে। তাঁরা সাংবাদিক বৈঠক করছেন না, তাই তাঁদের বক্তব্য জানা যাচ্ছে না। তাঁরা যদি সাংবাদিক বৈঠক করতেন এবং বলতেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে সরকারকে ফাঁসানোর জন্য এই চার বিচারপতি ওই মামলাগুলি নিজেদের এজলাসে আনতে চাইছেন, তাহলে পুরো পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াত?‌ প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বিচারপতিদের বৈঠকে বিচারপতি অরুণ মিশ্র (‌১০ নম্বর এজলাস)‌ বলেছেন, সিনিয়ররা তাঁর ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করে দিয়েছেন। কারণ, বিচারক বি এইচ লোয়ার মৃত্যুর বিষয়টি তাঁর এজলাসে দেওয়া হয়েছিল, আর তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন সিনিয়র বিচারপতিরা। প্রকাশ্যে কোনও অভিযোগ করতে হলে, এমন অভিযোগ যা বিচারপতিদেরই কালিমালিপ্ত করে, তার জন্য তো নির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ দিতে হবে। বিচারপতিরা তো তথ্যপ্রমাণ ছাড়া মামলার রায় দেন না। সাংবাদিক বৈঠক তো করা হয়েছে দেশের মানুষকে সচেতন করতে। কিন্তু অভিযোগের মূল কারণ না জানালে আমরা কী বুঝব?‌ আর কেউ যদি কিছু না–বোঝেন তা হলে তো রাজনৈতিক আনুগত্য অনুযায়ী কেউ চার বিচারপতির পক্ষে যাবেন, কেউ বিরুদ্ধে। তা কি কোনও কাম্য পরিস্থিতি?‌
জুনিয়র বিচারপতিদের এজলাসে সংবেদনশীল মামলা পাঠানো যাবে না–ই বা কেন, তাও তো বোধগম্য হল না।‌ শৃঙ্খলা ভাঙার কারণে যদি রঞ্জন গগৈকে পরবর্তী প্রধান বিচারপতি না করা হয়, তাহলে এই বছরের ৩ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি হয়ে যাবেন এ কে সিক্রি বা শরদ ববডে, যাঁরা এখন ৬ ও ৭ নম্বর এজলাসে বসেন। তাছাড়া গত কুড়ি বছরে তথাকথিত জুনিয়র বিচারপতিদের কাছে এমন বহু মামলা গেছে, যা ছিল বিশেষ ভাবে সংবেদনশীল। যেমন ১৯৯৮ সালে রাজীব গান্ধী হত্যামামলা গেছিল আট নম্বর এজলাসে। ১৯৯৯ সালে বোফর্স মামলাও গেছিল আট নম্বর এজলাসে। আরও সাম্প্রতিক সময়ে, দোষী সব্যস্ত হলে সাংসদ–বিধায়কদের ভোটে না–লড়ার মামলাটি গেছিল ৯ নম্বর এজলাসে (‌২০০৫)‌। সোহরাবুদ্দিন সাজানো সঙ্ঘর্ষ মামলা ছিল ১১ নম্বর এজলাসে (‌২০০৭)‌‌। স্পেকট্রাম মামলাও গেছিল ১১ নম্বর এজলাসে (২০১০)‌। লালকৃষ্ণ আদবানিকে দোষমুক্ত করার বিরুদ্ধে সিবিআইয়ের আবেদন যায় ৮ নম্বর এজলাসে (‌২০১১)‌। কয়লা কেলেঙ্কারি মামলা এসেছিল ৭ নম্বর এজলাসে (‌২০১২)‌‌। ২০১৩ সালে বিসিসিআই মামলা ছিল ৬ নম্বর এজলাসে। তাহলে?‌ 
সব মিলিয়ে বিচারপতি জে চেলমেশ্বর, কুরিয়েন জোসেফ, মদন লোকুর ও রঞ্জন গগৈ যে কোনও উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক সাংবাদিক বৈঠক করলেন, কেনই–‌বা রাষ্ট্রপতির কাছে না–গিয়ে জনগণের কাছে এলেন, কিছুই বোঝা গেল না। যাবে বলেও মনে হচ্ছে না। শুধু কিছু মামলার এজলাস বদলানো, বা মামলা কীভাবে কোন এজলাসে যাবে, তার পদ্ধতি স্থির করা নিশ্চয়ই তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল না। তাই যদি হত, তাঁদের অবশ্যই উচিত ছিল তাঁদের নিয়োগকর্তা রাষ্ট্রপতির কাছে যাওয়া। কিন্তু তাঁরা তো তা করেননি। তাঁরা সাংবাদিক বৈঠক করেছিলেন। অথচ কী তাঁরা বলতে চাইলেন, তা আমাদের কাছে অস্বচ্ছই থেকে গেল।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top