সুখেন্দুশেখর রায়

বেশ কয়েকদিন ধরে দেখছি, কলকাতার দেওয়ালে প্রণব মুখার্জির কার্টুন আঁকা হয়েছে। তাঁর মাথায় টুপি, মুখে পাইপ। শিরোনাম— ‘‌আঙ্কেল ডাঙ্কেল’‌। তখন তিনি বেশিরভাগ সময় দিল্লিতে থাকতেন। তবে নিয়মিত আমার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ হত। তাঁকে জানালাম ওই দেওয়াল লিখন আর ব্যঙ্গচিত্রের কথা। কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। তখন বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় ‘ডাঙ্কেল প্রস্তাব’ নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। আগামী দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কীভাবে ‘অভিন্ন বাণিজ্য চুক্তি’‌–‌তে স্বাক্ষর করে সর্বসম্মত বাণিজ্যিক নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করবে, ডাঙ্কেল ‌প্রস্তাবে ছিল তারই খসড়া রূপরেখা। বামপন্থী ও বিজেপি–‌সহ অন্য বিরোধী দল তা নিয়ে দেশ জুড়ে হইচই শুরু করেছে। ইতিমধ্যে প্রণবদা কলকাতায় এসে কীর্ণাহারের পথে রওনা হলেন। গাড়িতে যেতে যেতে প্রায় এক ঘণ্টা উনি আমাকে ডাঙ্কেল প্রস্তাবের খঁুটিনাটি বোঝালেন। মূল বিষয়টি বুঝতে পারলেও অনেকটাই মগজে ঢুকল না। আমি একের পর এক প্রশ্ন করছি। উনি শিক্ষকের মতো আমাকে বোঝাচ্ছেন। হঠাৎ গাড়ি সজোরে ব্রেক কষল। সামনে পুলিশের পাইলট গাড়ি থেমে গেছে। রক্ষীরা আমাদের গাড়ি ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখি, বিপরীত দিক থেকে সি পি এমের কিসান সভার মিছিল স্রোতের মতো এগিয়ে আসছে। মুখে তাদের স্লোগান— ‘‌ডাঙ্কেল প্রস্তাব মানছি না, মানব না’‌, ইত্যাদি। তাদেরই কেউ কেউ গাড়িতে প্রণবদাকে দেখতে পেয়ে কুকথা বলতে শুরু করে। গাড়িতেও দুমদাম করাঘাত করে। অবশ্য পুলিশি হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত আমরা কীর্ণাহার এসে পৌঁছলাম। এই সময়টুকু প্রণবদা গাড়িতে আর একটি কথাও বলেননি। শুধু ঘনঘন পাইপের ধোঁয়া ছেড়েছেন। পরের দিন সকালে আমাকে বললেন, সোমেনের সঙ্গে কথা হয়েছে। তুই কলকাতা ফিরে গিয়ে দু’‌দিনের মধ্যে সভার আয়োজন কর। দলের প্রাদেশিক ও জেলার কর্মকর্তাদের ডাকবি। আমি ‘‌ডাঙ্কেল প্রস্তাব’‌ নিয়ে বলব। তখন সোমেন মিত্র প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন। আশুতোষ মিউজিয়ামের শতবর্ষ হলে সভা হল। প্রণবদা প্রায় দু’‌ঘণ্টা বক্তব্য রাখলেন। কর্মকর্তাদের যাবতীয় প্রশ্নের উত্তরও দিলেন। পুরো বক্তব্য রেকর্ড করেছিলাম। প্রণবদার সেই বক্তৃতার ক্যাসেট বের করলাম। পুস্তিকাও প্রকাশ করা হল। দলে যারা ভাল বক্তা ছিলেন প্রাদেশিক, জেলা, এমনকি ব্লক স্তরেও তাদের সবাইকে নির্দেশ দিলেন সোমেনদা। সমস্ত রেল স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, হাটে–‌বাজারে ওই ক্যাসেট প্রতিদিন বাজাতে হবে। আর পুস্তিকায় যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তা বক্তৃতায় তুলে ধরতে হবে। একমাস চলল এই কর্মসূচি। কার্যত বামপন্থীদের প্রচার ফাঁপা বেলুনের মতো চুপসে গেল। এই প্রথম একটি জটিল আর্থিক বিষয়ে সংগঠিত কর্মসূচির মাধ্যমে অপপ্রচারকে প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছিল। তার মূল কারিগর ছিলেন, অবশ্যই প্রণবদা আর সোমেনদা। এর কিছুদিন পরেই ভারতের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বাণিজ্য মন্ত্রী প্রণব মুখার্জি। যে চুক্তি ততদিনে ‘‌জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড’‌ বা ‘‌গ্যাট চুক্তি’‌ হিসেবে পরিচিত হয়েছে। যারাই প্রণবদার সংস্পর্শে এসেছেন তাঁরা জানেন, তিনি ছিলেন নিপাট ‘‌বাঙালি ভদ্রলোক’‌। অন্তর্মুখী ছিলেন। হয়তো তাই তাঁর প্রচারবিমুখতাও ছিল তীব্র। তিনি যখন ৭৫ বছরে পা দিলেন, আমি তাঁকে জানালাম যে, আমি তাঁর ওপর বই তৈরির কাজে হাত দিয়েছি। খুব একটা সায় ছিল না। তবু জানতে চাইলেন বইয়ের খুঁটিনাটি। প্রণববাবুকে যাঁরা রাজনীতিবিদ, প্রশাসক বা বন্ধু হিসেবে কাছ থেকে দেখেছেন তাঁদের মতামত থাকবে বইয়ে। আর যাঁরা দূর থেকেও তাঁর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ওয়াকিবহাল তাঁরাও লিখবেন। আমি শুধুমাত্র সম্পাদনা করব। বইটির নাম কী ভেবেছি জানতে চাইলেন। যেই বলেছি ‘‌প্রণব মুখার্জি— দ্য অল সিজন ম্যান’‌, উনি হই হই করে উঠলেন। বললেন, একেবারে ব্যাকরণগতভাবে ভুল। আসলে ওটি হবে— ‘‌ম্যান ফর অল সিজনস্‌’‌। মজা করে বললাম, আপনার সঙ্গে অথবা আপনার নামের সঙ্গে আমার কোনও ব্যাকরণগত সম্পর্ক নেই। তারপর তাঁকে একটি ইংরেজি গানের কয়েক লাইন শোনালাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমরা গাইতাম। জনি ওয়েকলিনের বিখ্যাত গান, যা লেখা হয়েছিল ‘‌বক্সিং কিং’‌ মহম্মদ আলিকে নিয়ে। প্রথম ছত্রে এই কথাগুলি ছিল— “‌মোহাম্মদ, মোহাম্মদ আলি/‌হি ফ্লোটস্‌ লাইক আ বাটারফ্লাই/‌অ্যান্ড স্টিঙ্গস্‌ লাইক আ বি/‌মোহাম্মদ, দি ব্ল্যাক সুপারম্যান.‌.‌.‌”‌ থামলাম। বোঝালাম ‘‌দি ব্ল্যাক সুপারম্যান’‌–‌এর মধ্যে যে বলিষ্ঠ ছন্দ আছে ‘‌দি অল সিজন ম্যান’‌–‌এও তা জোরালোভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। প্রণবদা হেসে বললেন, ‘‌ভাগ্যিস আমাকে দি ব্ল্যাক সুপারম্যান শিরোনাম দিসনি।’‌ আমার ছোট্ট জবাব ছিল— ব্ল্যাক সুপারম্যান যে সারা বিশ্বে একজনই ছিলেন। দিল্লির প্রগতি ময়দানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বইমেলাতে ওই বইটি প্রকাশিত হয়। প্রণব মুখার্জিকে নিয়ে লেখা প্রথম বই। আজও আমি তার জন্য গর্ব অনুভব করি।
ওই কফি টেবিল ‌বুক–‌এ লিখেছিলেন কন্ডোলিজা রাইস, সোনিয়া গান্ধী, মনমোহন সিং, সোমনাথ চ্যাটার্জি, মমতা ব্যানার্জি, লালকৃষ্ণ আদবানি, স্বরাজ পল, এস কে বিড়লা, আর পি গোয়েঙ্কা, রাহুল বাজাজ, পণ্ডিত যশরাজ, কপিল দেব, আজহারউদ্দিন, মিঠুন চক্রবর্তী–‌সহ সমাজের বিভিন্ন বর্গের কৃতী ব্যক্তিত্ব। প্রণবদা খুব খুশি হয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরে কলকাতা থেকে দিল্লি ফেরার পথে বিমানে প্রণবদা কোনও নেতার কাছে ‘‌তাঁরই প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত’‌ এমন কথা কি বলেছিলেন?‌ এই বহুচর্চিত বিষয়ে দু–‌একটি কথা বলব। বাংলার চারজন দলীয় নেতা পরস্পর হাত মিলিয়েছিলেন। তাঁরা সবাই আজ প্রয়াত। আমার চোখে তাঁরা ছিলেন ‘‌গ্যাউ অফ ফোর’‌ বা দুষ্ট চতুষ্টয়। তাঁরাই কলকাতা ও দিল্লির বিশেষ কয়েকজন সাংবাদিকের মাধ্যমে রটনা শুরু করেন প্রণববাবু প্রধানমন্ত্রী হতে চান। দিল্লির রাজনৈতিক মহলে দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে। তখন রাজীব গান্ধীর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ছিলেন একজোড়া তরুণ। অরুণ নেহরু ও অরুণ সিং যারা পরে রাজীব মন্ত্রিসভায় যথাক্রমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষা দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রীর জায়গা পান। এই দুই অরুণ এবং পাঞ্জাবের নেতা বলরাম জাখর সদ্য মাতৃহারা রাজীবের কানে প্রণবদার বিরুদ্ধে বিষ ঢালতে থাকেন। পরিণামে প্রণববাবু মন্ত্রিসভা, ওয়ার্কিং কমিটি, সংসদীয় বোর্ড থেকে বাদ পড়েন। তাঁকে অল্প সময়ের জন্য বাংলার সভাপতি করা হয়। কলকাতা পুরসভা নির্বাচনে এক আসনের জন্য দল বোর্ড দখল করতে ব্যর্থ হয়। সেখানেও ছিল অন্তর্ঘাত। দুষ্ট চতুষ্টয় জানত, তাদের প্রথম চাল সফল হয়েছে। কিন্তু যদি পুরবোর্ড প্রণববাবুর নেতৃত্বে দল দখল করে তাহলে তিনি আবার বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবেন। তাদের রাজনৈতিক কেরিয়ার বাধাপ্রাপ্ত হবে। তাদের ষড়যন্ত্রেই এবার প্রণববাবুকে প্রদেশ সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। অদম্য প্রণবদা এবার জেলায় জেলায় কংগ্রেসের বাণী প্রচার করতে শুরু করলেন। ‘‌শতবর্ষের আলোকে জাতীয় কংগ্রেস’‌ শীর্ষক আলোচনা সভায় অসংখ্য দলীয় কর্মী ও সমর্থক ভিড় করতে শুরু করে। উৎকণ্ঠিত দুষ্ট চতুষ্টয়। এবার চরম আঘাত। ‘‌প্রণব মুখার্জিকে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করা হল’‌— এক লাইনের প্রেস বিবৃতিতে জানাল এআইসিসি। বিস্মিত প্রণবদা আমাদের বললেন, কী অপরাধে আমাকে বহিষ্কার করা হল তা আমাকে জানানো হল না!‌ এই কথাগুলি লিখলাম এই কারণে যে আজও কিছু সংবাদমাধ্যমে একদল কীর্তনীয়া সমানে গেয়ে চলেছেন— ‘‌প্রণববাবু কংগ্রেস দল ছেড়ে অন্য দল তৈরি করেন।’‌ এই অসত্য ভাষণ তাঁর মৃত্যুর পরেও সমানে চলছে।
বামপন্থীরা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ–‌২ সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিল। কারণ, তাদের আপত্তি অগ্রাহ্য করে কংগ্রেস সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘‌অসামরিক পারমাণবিক চুক্তি’‌ স্বাক্ষর করতে চলেছে। প্রণবদার দৌত্য কাজে আসল না। বামপন্থী ও রামপন্থীরা একযোগে কংগ্রেস সরকারের ‘‌আস্থা প্রস্তাব’‌–‌এর বিরুদ্ধে ভোট দিলেন। বিস্তর হইচই হল। স্টিং অপারেশন হল। লোকসভার টেবিলে থলি রেখে গুচ্ছ গুচ্ছ টাকা প্রদর্শিত হল, যা নাকি উৎকোচ দেওয়া হয়েছিল। মামলা হল। তদন্ত কমিটি তৈরি হল। কিন্তু সরকার পড়ল না। ২০–‌২৫ ভোটের ব্যবধানে রক্ষা পেল। এবার হাইকমান্ড নড়েচড়ে বসল। বামপন্থীরা তো আর সমর্থন দেবে না। তাহলে পশ্চিমবাংলার ৪২টি আসনের মধ্যে অধিকাংশ আসন পেতে হলে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধতে হবে। প্রণবদাকেই দায়িত্ব দিলেন সোনিয়া গান্ধী। প্রণবদার সঙ্গে মমতা দিদিমণির বরাবর একটা অদ্ভুত সম্পর্ক লক্ষ্য করেছি। হিন্দি ছায়াছবির অনুকরণে বলা যেতে পারে— ‘‌কভি হাঁ, কভি না’‌। কিংবা ‘‌কভি খুশি, কভি গম’‌। আসলে সম্পর্কের নিয়ম হল— যত গভীর হবে, ততই খুনসুটিও চলবে। কিন্তু এবার অন্তত কয়েক যুগ পরে হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে— সিপিএমকে হটাতে হবে। প্রণবদা আমাকে বললেন, ‘‌তুই মমতার সঙ্গে আমার একটা বৈঠকের ব্যবস্থা কর’‌। তা আমি বললাম, আপনি একটা ফোন করলেই তো ভাল হয়। উনি জানালেন, ‘‌ওই পাগলি আমার ওপর হয়তো কোনও কারণে রেগে আছে। দিল্লি থেকে দু’‌বার ফোন করেছিলাম। কিন্তু যোগাযোগ হয়নি’।‌ আমি বার কয়েক দিদিমণির কাছে গেলাম। দিদি বললেন, ‘‌আপনি তো তিনযুগ ধরে দেখেছেন বামেদের সঙ্গে হাইকমান্ডের গোপন বোঝাপড়া। আমি একাই লড়ব। মানুষ আমার সঙ্গে আছে।’‌ শেষপর্যন্ত অবশ্য প্রণবদা আর মমতার বৈঠক হল। দিনটি ছিল ২০০৯ সালের ১ মার্চ। বৈঠকে এলেন তৃণমূলের পক্ষে মমতা ব্যানার্জি, সুব্রত বক্সি, মুকুল রায়, ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস আর মদন মিত্র। কংগ্রেসের পক্ষে প্রণবদা, দিল্লির পর্যবেক্ষক কেশব রাও আর আমি। সংবাদপত্রে আমাকে তখন বলা হত ‘‌প্রণবের দূত’‌। আর আমার দলের অকৃত্রিম বন্ধুরা বিধানভবনে বসে আমার নাম দিয়েছিলেন ‘‌যমদূত’‌। অর্থাৎ প্রণবদা যম, আর আমি তাঁর দূত। যাই হোক প্রথমদিকে আলোচনা স্বাভাবিক গতিতে এগোলেও শেষ পর্যন্ত থমকে গেল। কে কত আসনের ভাগ নেবে তা নিয়ে অচলাবস্থা। আমি প্রণবদা, কেশব রাওকে বোঝালাম জোট হলে ভাল। নইলে মমতা একাই লড়বে। আমার ধারণা, মমতা একা লড়লে তৃণমূল ২০–‌২৫টা আসন পাবেই। আর আমাদের ৬টি আসনের মধ্যে বড়জোর ২/‌১টি বাঁচাতে পারব। যেভাবে রাস্তাঘাটে, বিয়েবাড়িতে অপরিচিত লোকজন আমাদের দেখলেই বলে— জোট করুন। নইলে আপনারা ভোট পাবেন না। এবার আমরা সিপিএমকে হটাব। মমতার দলকেই ভোট দেব। প্রণবদা–‌কেশবকে ফর্মুলা দিলাম। তৃণমূল প্রধান বিরোধী দল। ওরা নিক দুই–‌তৃতীয়াংশ। আর কংগ্রেস এক তৃতীয়াংশ। প্রণবদা ফোনে সোনিয়ার সঙ্গে কথা বললেন। যে–‌কোনও মূল্যে জোট করতে হবে এমন নির্দেশই দিয়েছিলেন তিনি। সেদিন রাতে সাংবাদিকদের কাছে প্রণবদা–‌মমতা ঘোষণা করলেন, কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস একজোট হয়ে লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। কে ক’‌টা আসনে, বা কোন আসনে লড়বে তা আগামী সপ্তাহে আবারও আলোচনা করে ঠিক করব। এরপর বিস্তর আলোচনা, ফোনালাপ। কিন্তু আসন ভাগাভাগির জট কাটছে না। আমার সামনে ২৮/‌১৪ ফর্মুলা আলোচনা করে ঠিক হয়েছিল। ইতিমধ্যে যে দলের জোট বিরোধীরা দিল্লি গিয়ে নানাভাবে জোট বিরোধিতায় নেমেছে জানতাম না। এবার মমতা আল্টিমেটাম বা চরম ঘোষণা করলেন। আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেস তাদের অবস্থান না জানালে আমি বিয়াল্লিশ আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করে দেব। রাত এগারোটায় দিল্লি থেকে ফোন এল প্রণবদার। জরুরি তলব। সকালের বিমানে ছুটলাম তাঁর কাছে। আমাকে তালকোটরার বাসভবনে বসিয়ে চলে গেলেন সোনিয়ার সঙ্গে দেখা করতে। দিনটি ছিল ২০০৯–‌এর ১২ মার্চ, বৃহস্পতিবার সেদিন আবার দোলযাত্রাও ছিল। ওই দিন বিকেলেই দিল্লি থেকে ফিরে বিমানবন্দর থেকে সোজা কালীঘাট পৌঁছে গেলাম মমতার কাছে। পথিমধ্যে বলরামের মিষ্টির দোকান থেকে এক হাঁড়ি মালপোয়া কিনেছিলাম। সেটি মমতার টেবিলে রাখতেই একগাল হেসে বললেন— ‘‌আগে বলুন, কী খবর?‌’‌ আমি সবিস্তারে জানালাম। তৃণমূল ২৮টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে দিক। কংগ্রেস কয়েকদিন পরে করবে— এই বার্তাই আমি প্রণবদার কাছ থেকে নিয়ে এসেছি। বাকিটা তো ইতিহাস। আমি আজও মনে করি, ওই লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল একা লড়েও বহু আসন পেত। ক্ষতি হত কংগ্রেসের। মমতা ব্যানার্জি ও প্রণবদার পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্নেহের সম্পর্কই সেদিন বাংলার বুকে নতুন ইতিহাস গড়তে সাহায্য করেছিল। আপামর জনসাধারণ ওই শুভ প্রচেষ্টাকে অকুণ্ঠ সমর্থন জুগিয়েছিলেন। সে কথাৈ কখনও ভুলতে পারব না। যেমন ভোলা যাবে না প্রণবদাকে যিনি আমার জীবনের ৪৫ বছর ধরে ছিলেন শিক্ষাগুরু ও পথপ্রদর্শক। আমার লেখা বই ‘‌ছায়াতরণী’‌ উদ্বোধন করতে এসে প্রণবদা গোর্কি সদনে হলভর্তি লোকের সামনে বলেছিলেন, ‘‌সুখেন্দু চার দশক ধরে আমার ছায়াসঙ্গী’‌। তো চার দশকের ছায়াসঙ্গীকে শেষ যাত্রায় সঙ্গী করলেন না কেন?‌
লেখক তৃণমূলের সাংসদ
 

জনপ্রিয়

Back To Top