সুব্রত বাগচী

সৃষ্টির জগতে চোখধাঁধানো আলো ছড়িয়েও দীপ্তিমান কালোমানুষেরা অবিরত ক্ষতবিক্ষত। বিশ্ব জুড়ে ‘ব্ল্যাক লাইভস্ ম্যাটার’ আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে সম্প্রতি এনতিনি, ফিল্যান্ডার, ডুমিনি, এনগিডি–‌সহ দক্ষিণ আফ্রিকার ৩১ জন কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটার ‘ক্রিকেট সাউথ আফ্রিকা’কে চিঠি দিয়ে আর্জি জানিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ব্যবস্থাকে বর্ণবিদ্বেষের মতো কলুষ থেকে মুক্ত করতে। এর ঠিক দিন কয়েক আগে সাউদাম্পটনের রোজ বোল স্টেডিয়ামে সবুজ গালিচায় দাঁড়িয়ে ব্যাটসম্যানের হাড় হিম করা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিশ্বত্রাসী ফাস্টবোলার মাইকেল অ্যান্টনি হোল্ডিংয়ের কথাগুলো যেন গ্রিনটপ উইকেটে ‘আনপ্লেয়েবল ডেলিভারি’র মতো ধেয়ে আসছিল বর্ণবিদ্বেষী সভ্যতার (?) দিকে। পরে স্কাই ক্রিকেট চ্যানেলের সাক্ষাৎকারে কান্নায় প্রায় ভেঙে পড়া মসৃণ বোলিং রান খ্যাত হোল্ডিং গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা তাঁর অসংখ্য অনুরাগীকে শোনান তাঁর নিজের বাবা–‌মায়ের কথা। তাঁদের বুকে পাথর হয়ে জমে থাকা দুঃখের কথা, নিদারুণ কষ্টের কথা।
হোল্ডিংয়ের মুখে শুনতে পাই কুরে কুরে খাওয়া এক জীবনযন্ত্রণার কথা— যা তাঁর বাবা–মাকে বিদ্ধ করেছে সারাজীবন। নিজের স্ত্রী–‌র তুলনায় তাঁর গায়ের রং কয়েকগুণ বেশি কালো— এই ছিল তাঁর বাবার অপরাধ! বিস্ময় জাগে যে এই অপরাধে হোল্ডিংয়ের মাতৃকুলের কেউই তাঁর বাবার সঙ্গে বাক্যালাপ পর্যন্ত করতেন না। ছোট মাইকেল বড় হয়ে দুনিয়া কাঁপানো খেলোয়াড় হলেও বাবার প্রতি ছুঁড়ে দেওয়া সেই অপমান আজও তাঁর মজ্জায় মজ্জায় থেকে গেছে। বর্ণান্ধদের এই অপমান সত্যিই মানবতার হন্তারক। ব্যষ্টি ও সমষ্টির চৈতন্যকে হত্যা করে বর্ণবিদ্বেষের মারণাস্ত্র দেশকাল নির্বিশেষে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ও বিভাজনের হাতিয়ার, যা প্রায় সর্বত্র গলায় বড়শির মতো বিঁধে রয়েছে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে মার্টিন লুথার কিং, বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকায় গান্ধীজির অহিংস আন্দোলন ও সেখানে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের প্রধান চরিত্র সিসিল রোডস্–‌এর উত্তরাধিকারী দখলদার ব্রিটিশ ও ডাচ–ক্যালভিনিস্ট বোয়ারদের বিরুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গদের মুক্তির জন্য নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে সংগ্রামের ইতিহাসকে নস্যাৎ করে আগ্রাসী বর্ণবিদ্বেষ এখনও জর্জ ফ্লয়েডদের মতো কালোমানুষের ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। তাই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে শ্বেতকায় পুলিশকর্মী ডেরেক শভিন–‌এর হাতে খুন হতে হয় মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডকে। তাঁর মৃত্যুর প্রতিবাদে হোল্ডিং এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটারদের সরব ভূমিকা নিঃসন্দেহে বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে এক জোরালো সওয়াল।
ইতিহাস জানায় মানুষের কাছে হত্যা, এমনকী স্বজাতি হত্যাও নতুন কিছু নয়। হিংসার বীজ তার শরীর ও মনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জাতিবিদ্বেষে হাত পাকানো জার্মানির নাৎসিদের হাতে আউশভিৎস ক্যাম্পের গ্যাস চেম্বারে অজস্র ইহুদি খুন তো ইতিহাসের এক কুখ্যাত অধ্যায়। গেস্টাপোদের হাত থেকে বাঁচতে অসামান্য বিদূষী ইহুদি মহিলা হানা আরেন্ড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও আরও একজন বিদগ্ধ ইহুদি ব্যক্তিত্ব ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের ওয়াল্টার বেঞ্জামিন ১৯৪০ সালে জার্মানির সীমান্ত পেরিয়ে ফ্রান্স থেকে স্পেন হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছনোর আগে গেস্টাপোদের হাতে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আত্মহত্যা করেন। এভাবে একটি বা দুটি নয়,
জাতি বৈরিতার বলি হয়ে যায় হাজার হাজার নিরপরাধ ইহুদি শিশু, নারী ও পুরুষ। ইহুদি হত্যা ছিল হিটলারের নাৎসি জমানার রোজের রেওয়াজ। তাই গোটা ইয়োরোপ ও আমেরিকায় কয়েক দশক জুড়ে শুরু হয় প্রাণভয়ে ভীত ঘরবাড়ি থেকে উৎপাটিত ইহুদিদের এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে আশ্রয় খুঁজতে এক মর্মন্তুদ নিষ্ক্রমণ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাতিবিদ্বেষী নাৎসি জার্মানির হারের পর প্রত্যাশা হয়েছিল যে মানবহত্যা ও জাতিবৈরিতার দিন হয়তো ফুরিয়েছে। কিন্তু মেকি সভ্যতার কার্পেটের নীচে লুকিয়ে থাকা হন্তারক আদিম প্রবৃত্তির চিরমৃত্যু দুরাশা বৈ তো কিছু নয়! আরোপিত বিশ্বায়নের ছত্রছায়ায় থাকা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রসাধনী প্রলেপের নীচে লোভ, বৈরিতা, জিঘাংসার লাভা ফের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং তা দুর্বলদের ওপর খোলাখুলি আক্রমণ শানাতেও দ্বিধা করে না। অতঃপর গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ঘোষিত পীঠস্থানে শ্বেতাঙ্গদের হাতে কালোমানুষেরা লাঞ্ছিত, নির্যাতিত ও প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হতে থাকে। এভাবে অনেক জর্জ ফ্লয়েডের খুন ইতিহাসের পাতায় কখনও স্বল্পকালের জন্য ঠাঁই পেলেও অচিরে জনমন থেকে হারিয়েও যায়। একই সমাজের দুই ভিন্ন জীবনবৃত্তে কালোমানুষদের জীবনে হানা দেয় অনাহার, বেকারি, মৃত্যু ও হত্যার করালছায়া, অন্যদিকে কেনেথ গলব্রেথ বর্ণিত সম্পদশালী সমাজের (দি অ্যাফ্লুয়েন্ট সোসাইটি, ১৯৫৮) অফুরান বৈভবশালীদের দোসর রাষ্ট্র ও তার পুলিশ–মিলিটারির মিলিত পরাক্রমের নগ্ন প্রদর্শনীতে ক্ষমতার আস্ফালন লাগামহীন।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে শ্বেতাঙ্গ–শাসিত পশ্চিমি আধুনিক সভ্যতা থেকে অবদমিত কৃষ্ণাঙ্গ মনস্তত্ত্বের বিচ্ছিন্নতা এখন গভীর থেকে গভীরতর। দিনে দিনে এ ফাটল চওড়া হয়ে চলেছে। ১৯৬৪ সালে কিংবদন্তি বক্সার ক্যাসিয়াস ক্লে খ্রিস্টধর্ম ছেড়ে মুসলিম হয়ে মহম্মদ আলি নাম নেন। কারণ আফ্রিকান–আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ ক্যাসিয়াস ক্লে–‌র মনে হয়েছিল যে খ্রিস্টীয় নামটি তাঁর দাসত্বের পরিচয় বহন করে। কালোমানুষেরা কখনওই খ্রিস্টান নয়। খামারে দাস হিসেবে উদয়াস্ত খাটিয়ে নেওয়ার জন্য সাদা–চামড়ার লোকেরা কালা–আদমিদের ধরে নিয়ে এসে চাবুক মেরে খ্রিস্টান বানিয়েছিল। এক কৃষ্ণাঙ্গ খবরের কাগজ বিক্রেতার অনুরোধে ‘মহম্মদ স্পিকস‌্’ সংবাদপত্রটি পড়ে প্রভাবিত হয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বক্সার ক্যাসিয়াস ধর্মান্তরিত হন এবং সোজাসাপ্টা বলতে থাকেন যে ইসলামে ধর্মান্তরের পর তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত মানুষ। কয়েকবছর পর ১৯৬৬ সালে তাঁকে ভিয়েতনামে গিয়ে যুদ্ধে যোগ দিতে বলা হলে উনি তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। সে সময়ে তাঁর সাড়াজাগানো বিবৃতি— ‘My conscience won’t let me go shoot my brother, or some darker people, or some poor hungry people in the mud for big powerful America,’...And shoot them for what? They never called me nigger, they never lynched me, they didn’t put no dogs on me, they didn’t rob me of my nationality, rape and kill my mother and father. Shoot them for what? How can I shoot them poor people? Just take me to jail.’
শ্বেতাঙ্গ–কৃষ্ণাঙ্গ বিভেদ ও বিরোধের স্বরূপ বুঝতে হলে মনে রাখা দরকার যে শ্বেতাঙ্গ বলবান ও দুর্বল কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক সম্বন্ধের নানা স্তর আছে। ঔপনিবেশিক শক্তির দাসত্বের বন্ধন থেকে আফ্রিকার কালোমানুষদের মুক্তির চেতনা জাগানোর প্রশ্নে ‘ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্ক্’ ও ‘দি রেচেড অফ দি আর্থ’–‌এর ক্ষুব্ধ লেখক ফ্রানজ্ ফ্যানন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন ফরাসি শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিকতা কীভাবে তার উপনিবেশগুলির কালোমানুষদের মানসিকভাবে (psychological) শ্বেত–‌আধিপত্যের অধীন করে রেখেছে। শ্বেত–‌সংস্কৃতি ও আদবকায়দার সংস্পর্শে এসে অনুকরণ করে শ্বেতকায় হওয়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষা, উপরন্তু শ্বেতকায় নারী ও পুরুষকে জীবনসঙ্গিনী করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা, এমনকী অশ্বেতাঙ্গ সাদা–‌কালো সংকর বর্ণের (mullato) অধিবাসীদের গাঢ় কৃষ্ণবর্ণের মানুষদের নিকৃষ্ট মনে করা কৃষ্ণাঙ্গদের সমানাধিকারের লড়াইয়ের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে রেখেছে। তাই শ্বেতবর্ণ ও শ্বেতাঙ্গ প্রভুর প্রতি নির্ভেজাল আনুগত্য ও ভক্তি এক ‘সার্বিক চৈতন্যহীনতা’র (collective unconscious) ফসল এবং সেই চৈতন্যহীনতা থেকে একমাত্র ‘সমষ্টিগত উত্তরণে’র (collective catharsis) উদ্যম কৃষ্ণাঙ্গদের বহুযুগের মনস্তাত্ত্বিক বশ্যতা ও হীনমন্যতা থেকে মুক্ত করতে পারে।
মনে পড়ে ভারতবর্ষেও প্রায় একইভাবে সাদাচামড়ার ব্রিটিশদের প্রতি নেটিভ ইন্ডিয়ানদের বশ্যতার মানসিকতা ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বদেশের মুক্তির লড়াইকে পদে পদে প্রতিহত করেছিল যার অভিঘাত আজও বিদ্যমান। স্বদেশের আঁতুড়েই জন্ম নেয় ঔপনিবেশিক শক্তির দোসর। প্রসঙ্গত মনে আসে টমাস ব্যাবিংটন মেকলের কথা। ১৯৩৫ সালে মেকলে তো এরকমই চেয়েছিলেন যে ভারতীয়রা হবে ‘‌a class of persons, Indian in blood and colour, but English in taste, in opinions, in morals, and in intellect’‌। তফাতটা ক্ষীণ!
(‌অধ্যাপক, খিদিরপুর কলেজ, কলকাতা)‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top