পর্ণালী ধরচৌধুরি

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এডওয়ার্ড জেনারকে টিকার জনক বলে মানে। ১৭৯৬ সালে তিনি প্রথম স্মল পক্সের টিকা প্রয়োগ করেছিলেন এক কিশোরের শরীরে এবং তার ফল পাওয়া গিয়েছিল। এরপর লুই পাস্তুরের পরীক্ষা–‌নিরীক্ষায় আবিষ্কৃত হল কলেরার ভ্যাকসিন। সেটা ১৮৯৭ সাল। অ্যানথ্রাক্স জীবাণুর সঙ্গে লড়াইয়ে সাফল্য এল ১৯০৪ সালে। পরবর্তীকালে আবিষ্কৃত হল প্লেগের ভ্যাকসিন। গত ৭০ থেকে ১২০ বছর, এই সময়টাতে ব্যাক্টিরিয়ার বিরুদ্ধে লড়ার জন্য বিভিন্ন টিকা আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। বিসিজি তো এখনও দেওয়া হয় শিশুদের।
আজ যখন করোনা অতিমারীর কবলে গোটা পৃথিবী থরহরি কম্পমান, তখন স্বাভাবিকভাবেই যে প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে, সেটা হল, ভ্যাকসিন আবিষ্কার হবে কবে?‌ মাস ছয়েকের বেশি কেটে গেছে কোভিড আক্রমণের, এখনও সেভাবে কেন দেখা গেল না আশার আলো?‌ বিশ্বের নানা দেশে যেসব বিজ্ঞানী দিনরাত গবেষণা করছেন এই নিয়ে, তঁাদের সামনে চ্যালেঞ্জটা ঠিক কতখানি কঠিন?‌ যদি এই মুহূর্তে নাই আবিষ্কার হয় ভ্যাকসিন, আমাদের কী করণীয়?‌ দ্বিতীয় পর্যায়ের আক্রমণের সামনে কী হবে আমাদের রণকৌশল?‌
এইসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা সহজ কাজ নয়। এমনকী গত ১১ জানুয়ারি এই ভাইরাসের জিনের গঠন পুরোপুরি জেনে ফেলার পর সাড়ে পঁাচ মাস কেটে গেলেও নয়। খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে, যে সারফেস গ্লাইকোপ্রোটিন মুড়ে রাখে করোনা ভাইরাসকে, সেটি যখন মানুষের শরীরের কোষকে আক্রমণ করে, তখনই সংক্রমণ ঘটে। সাধারণ লোকে বলতেই পারেন, এই এস–‌প্রোটিনকে কোষের সংস্পর্শে আসতে না দিলেই তো হয়। সেজন্য টিকা আবিষ্কার করতে এত সময় লাগছে কেন?‌ এক কথায় এর উত্তর হল, কাজটা এত সহজ নয় কারণ করোনার এই প্রোটিন আবরণ খুব দ্রুত আকৃতি বদলায়। ফলে ভ্যাকসিনে তার নাগাল পাওয়া কঠিন।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রাণপাত করছেন বিজ্ঞানীরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, ১১৫টি জায়গায় কোভিড–‌১৯ ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চলছে। সবগুলিই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা তার আগের পর্যায়ে রয়েছে। এদের টাকা জোগাচ্ছে কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনস। সহায়তা করছে ইউ এন ফাউন্ডেশন, ওয়েলকাম ট্রাস্ট, বিল অ্যান্ড মিলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। এছাড়া ইওরোপের আটটি দেশ অর্থসাহায্য করছে। যেহেতু এখনও পর্যন্ত কেউ জানে না কোন ভ্যাকসিন কাজে আসবে, তাই সমান্তরালভাবে কাজ চলছে নানা দেশে। লক্ষ্য একটাই, যে করে হোক, ১৮ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে টিকা আবিষ্কার। এজন্য যেভাবে কঁাধে কঁাধ মিলিয়ে লড়ছেন বিজ্ঞানীরা, তাকে কুর্নিশ জানাতেই হয়।
আন্তর্জাতিক স্তরে এই যে সহযোগিতার ছবি, সেটা বজায় রাখতে পারলে করোনার টিকা আবিষ্কার ও তার প্রয়োগ শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এর আগে বারবার মহামারীর সময়ে এমন একটি সমস্যা দেখা দিয়েছে যার সমাধান গবেষণাগারে সম্ভব নয়। বরং সেটা কূটনীতির বিষয়। ২০০৯–‌এর সোয়াইন ফ্লু বলুন কি ২০১৪–‌র ইবোলা, লড়াইয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের মধ্যে ঐক্যের অভাব প্রকট হয়ে উঠেছিল। আশার কথা, করোনার বেলায় এখনও পর্যন্ত তত মারাত্মক হয়ে ওঠেনি এই সমস্যা। তবে ঈশান কোণে একচিলতে কালো মেঘ দেখা দিয়েছে কারণ ধনী রাষ্ট্রগুলি ইতিমধ্যেই সম্ভাব্য ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী সংস্থাগুলির সঙ্গে একচেটিয়া চুক্তি করার জন্য উদ্যোগী হয়েছে।
‌লেখক, মহামারী বিষয়ক গবেষক,
জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি, আমেরিকা

জনপ্রিয়

Back To Top