দেবর্ষি ভট্টাচার্য‌

এই বিশ্বায়িত যুগে, শিক্ষক দিবসের পুণ্যদিনেও আদর্শ শিক্ষকের মূল্যায়নের চিরাচরিত মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ থেকে যায়। বিশেষত উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে। আদর্শ শিক্ষক নির্ধারণের কোনও লিখিত মানদণ্ড না থাকলেও, গুরুজনদের দাক্ষিণ্যে ছেলেবেলা থেকে একথা মস্তিষ্কের গভীরতম কোষে প্রোথিত হয়ে রয়েছে যে, শিক্ষক মানেই প্রাতঃস্মরণীয় নমস্য ব্যক্তি, সহজ–সরল জীবনযাপন কিন্তু মহৎ ভাবনায় মগ্ন, স্খলন–পতন–ত্রুটি বিহীন অতিমানবও বটে! আম ভারতবাসীর মধ্যবিত্ত মানসিকতা, মধ্যমমেধার ধ্যানধারণা, মধ্যমপন্থী অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষক সম্বন্ধে এক মহামানবীয় অবয়ব সেই বর্ণ পরিচয়ের সময় থেকেই আমাদের মননে, চেতনে, স্বপনে দৃশ্যমান করে এঁকে দেওয়া হয়েছে। সরলরৈখিক জীবনশৈলী, সুদৃঢ় অথচ সংবেদনশীল ব্যক্তিত্ব, অন্তহীন কষ্টের মাঝেও আদর্শ রক্ষায় অবিচল, বিলাস–বিনোদন বিমুখ জীবনপ্রবাহ এবং অবশ্যই জ্ঞান আহরণ ও ততোধিক জ্ঞান বিতরণের একমাত্র
শর্তে যাঁদের জন্মগ্রহণ, বেঁচে থাকা, ইহকাল, পরকাল। শিক্ষককুলের এহেন নিটোল চিত্ররূপ আজও সমাজের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে, শিরায়–‌উপশিরায় এতটাই বিস্তৃত, যেন মনে হয় শিক্ষকেরা কোনও জৈবিক উপাদানে সৃষ্ট নন, শুধুমাত্র আইডিয়ার পাহাড়ে সমৃদ্ধ!
এ জগতে সকল সত্যই শাশ্বত নাকি? অনেক সত্যই কি আপেক্ষিক নয়? সময়, স্থান, অবস্থান, নূতন চিন্তার উন্মেষের ভিত্তিতে সত্যের সংজ্ঞা কি বারেবারে পরিমার্জিত হয়নি? তবে অভাগা শিক্ষককুলের ক্ষেত্রে সেই মধ্যযুগীয় সত্য কেনই বা চিরসত্য হয়ে রবে? যুগ যুগ ধরে একথা বলা হয়েছে যে,‌ শিক্ষকরা হলেন সমাজ গড়ার কারিগর। একথা দ্ব্যর্থহীন ভাবে সত্য যে শিক্ষকদের মুখ্য কাজই হল সমাজে শিক্ষাদান। কিন্তু আধুনিক পঠন–‌পাঠন ব্যবস্থার চরিত্র অনুধাবন করে একথা বলাই যায় যে, ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকদের সান্নিধ্যে যতটা সময় অতিবাহিত করে, তার থেকে ঢের বেশি সময় কাটায় তাদের বাবা–‌মা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং পাড়া–‌প্রতিবেশীদের মাঝে। সমাজের এতগুলো স্তরের মানুষজনদের ঘাড়ে সমাজ গড়ার দায়ের এক শতাংশও না চাপিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে পুরো দায়ভারটাই চাপিয়ে দেওয়া হল শিক্ষকদের ওপর, যাঁদের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীরা জীবনের এক–দশমাংশ সময়ও অতিবাহিত করে না!
একথা সর্বৈব সত্য যে ছাত্রছাত্রীদের নৈতিক চরিত্র গঠনে সহায়তা করার দায়বদ্ধতা শিক্ষকদের, বিশেষত যে সকল শিক্ষকেরা প্রাথমিক ও মধ্য শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত, ভীষণভাবে থেকে যায়। কিন্তু সেই দায়ভার কি শুধুই শিক্ষকদের? বাকি নাগরিক সমাজের কারও নয়? উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা যতটা না ছাত্রছাত্রীদের নৈতিক চরিত্র গঠনের জন্য, তার থেকে ঢের বেশি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্বন্ধে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সম্যক ধারণা প্রতিষ্ঠা করার। আধুনিক পঠন–‌পাঠন ব্যবস্থায় ছাত্রছাত্রীরা মহাবিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান আহরণ ও পরীক্ষায় চমকপ্রদ ফল প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে, নৈতিক উপদেশে সমৃদ্ধ হয়ে ‘মধ্যপ্রদেশ’ বৃদ্ধি করার তাগিদে নয় কিন্তু। তাহলে যে শিক্ষক অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে অতি সহজ–সরল–সাবলীল ভাষায় সংশ্লিষ্ট বিষয় ছাত্রছাত্রীদের সামনে উপস্থাপনা করতে সক্ষম, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তথাকথিত শিক্ষক জীবনের সংজ্ঞার পরিধির মধ্যে চলাফেরা করেন না, তাঁকে কি তাহলে যথার্থ শিক্ষক বলা যাবে না? নাকি যে শিক্ষক অনিয়মিত এবং গয়ংগচ্ছভাবে ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়ে কোনওমতে ‘দিনগত পাপক্ষয়’ করে চলেছেন, অথচ তাঁর ব্যক্তিজীবন তথাকথিত আদর্শ শিক্ষক সংজ্ঞার পরিবৃত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তাহলে কি তিনিই আদর্শ শিক্ষক?
শিক্ষাদানের কাজকে যেহেতু একটি পেশা হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে, সেহেতু একজন আদর্শ এবং যথার্থ শিক্ষকের মূল্যায়ন কি হওয়া উচিত নয় শিক্ষাদানের পেশার প্রতি তিনি কতটা দায়বদ্ধ, কতটা নিষ্ঠাবান, কতটা নিবেদিত প্রাণ— এই সকল গুণগত মানদণ্ডের ভিত্তিতেই। শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত হতে যে শর্তগুলো পূরণ করতে হয় বা যে সাক্ষাৎকারের মুখোমুখি হতে হয়, সেখানে শিক্ষকের ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার পরিধি সম্বন্ধে কোনও মানকসূচি বেঁধে দেওয়া থাকে না। অথচ শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ করার পর থেকেই বিশ্বায়নের এই বিস্ফারিত চোখেও শিক্ষকদের ব্যক্তিজীবনের পরিধি সামাজিক চশমার লেন্সে অনেকাংশেই সঙ্কুচিত করে রাখা হয়, যাকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি উদাহরণ বলা হলে বোধহয় অত্যুক্তি হবে না। বিশ্বায়নের আলোকে উদ্ভাসিত দেশের ছাত্রছাত্রীরা
মহাবিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসে নিজেদের কেরিয়ার গড়ার তাগিদে। ছাত্রসমাজের জীবনের এই লক্ষ্য যথাযথভাবে পরিপূর্ণ করার জন্য মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণায় নির্মিত তথাকথিত আদর্শ শিক্ষকের থেকে আজকের পৃথিবীতে একজন যথার্থ পেশাদার শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি নয় কি? বিশ্বায়নের বিশ্বগ্রাসে এই মহাপৃথিবীর সর্ব অঙ্গ যখন পরিবর্তনের আলোয় ঔজ্জ্বল্যমান, তখন শিক্ষক সম্বন্ধে মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণার লন্ঠনটি কেনই বা আজও টিমটিম করে জ্বলতে থাকবে!
এই লেখার উদ্দেশ্য কিন্তু শিক্ষকদের ব্যক্তিজীবনের স্বেচ্ছাচারিতার স্বপক্ষে যুক্তি প্রতিষ্ঠা বা শিক্ষকদের নীতি ভ্রষ্ট হওয়ার আহ্বান নয়। এই ব্যতিক্রমী বিশ্লেষণের মূল উদ্দেশ্য হল শিক্ষকদের ব্যক্তিজীবন এবং পেশাগত জীবনকে
উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিলিয়ে দিয়ে তাঁদের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সঙ্কুচিত করার মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণাকে ঝাঁকুনি দেওয়া। শিক্ষাদানের পেশার সঙ্গে যুক্ত কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিজীবনের ত্রুটিবিচ্যুতিকে ‘শিক্ষকের অপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিতকরণের বিরুদ্ধাচরণই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য। স্খলন, পতন, ত্রুটি যেখানে সমগ্র সমাজটাকেই গোগ্রাসে গিলে নিচ্ছে, সেখানে এই অবক্ষয়ের করাল গ্রাস থেকে শিক্ষকেরা নিজেদের সম্পূর্ণভাবে মুক্ত রাখবে এই ধারণা কি আদৌ বাস্তবসম্মত? শিক্ষাদানের পরিপ্রেক্ষিতে বা শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে কোনও শিক্ষকের ত্রুটিবিচ্যুতি শিক্ষকের বিচ্যুতি হিসেবে চিহ্নিত করা যেতেই পারে। কিন্তু কোনও শিক্ষকের ব্যক্তি বা সমাজজীবনে ত্রুটিবিচ্যুতি ধরা পড়লে তা শিক্ষকের বিচ্যুতি বলে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে জনসমক্ষে বারংবার তুলে ধরার প্রয়াস কি আবহমানকাল ধরেই জারি থাকবে? আবার অন্যদিকে, সমাজের অন্যান্য পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের নৈতিক স্খলনের–পতনের জন্যেও পরোক্ষভাবে সুকৌশলে শিক্ষকদেরই দায়ী করা হবে!‌
শিক্ষকরা যেন অমৃতধারার এই সমাজে একমাত্র গরলকুম্ভ। সমাজব্যবস্থা যদি শতসহস্র ছিদ্র বিশিষ্ট চালুনি হয়, তবে তার অন্দরের বেনোজল আটকানোর দায় কি শুধুমাত্র শিক্ষকদের? সমাজের তনু–মন–প্রাণ যদি সর্বান্তঃকরণে কলুষিত হয়, তা নিষ্কলুষ করার দায় কেনই বা শুধুমাত্র শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে সমাজের অন্যান্য পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষজন অনায়াসে দায় এড়িয়ে যাবেন? সমগ্র সমাজই যেখানে মূল্যবোধ ক্ষয়িষ্ণুতার প্রবল জ্বরে আক্রান্ত, সেখানে শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিজীবনে স্খলন–পতন–ত্রুটি হলেই গেল গেল রব তুলে জনমানসে আপাত আতঙ্ক তৈরির চক্রান্ত শুধুমাত্র আপত্তিজনকই নয়, চরম নিন্দনীয়ও বটে।
বিস্ময়কর ভাবে একই বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের একই দিনে দুটি সমধর্মী সংবাদের ভিন্নধর্মী উপস্থাপনার উদাহরণও আমাদের নাগরিক সমাজে কোনওভাবেই তরঙ্গায়িত করতে পারে না। যে সংবাদমাধ্যম দুপুরের খবরে ‘এক যুবকের’ আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশ করে, সেই সংবাদমাধ্যমই সেইদিনের রাতের খবরে অন্য একটি ঘটনায় ‘এক শিক্ষকের’ আত্মহত্যা খবরের শিরোনামে এনে ফেলে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তি যুবক হোক বা যুবতী, কিংবা বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা— সেইসব একেবারেই গৌণ! শিক্ষক সে যে! জীবনানন্দ বুঝি মুচকি হাসলেন— ‘‌সে তো কবি নয়— অজর, অক্ষর, অধ্যাপক সে যে!’‌ হায় রে শিক্ষক! কী আশ্চর্যজনকভাবে আত্মহননেও চলকে ওঠে সেই শিক্ষক সত্তা! জীবনের, জগতের, সমাজের গরলে জর্জরিত নীলাভ এক মানব সত্তার মৃত্যু হতে আর পারল কোথায়!‌

জনপ্রিয়

Back To Top