আবু তাহের- শরতের আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ আর কাশফুলের হিল্লোলে শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমন। আর শারদীয় দুর্গোৎসব যাঁর কণ্ঠস্বর ছাড়া শুরুই হয় না, যিনি বাঙালির ভালবাসা আবেগ দুঃখ কষ্ট আনন্দ সব কিছুর সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছেন, তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। তঁার কণ্ঠস্বরের গাম্ভীর্যে আর আবেগমথিত স্তোত্রপাঠে মজে যাননি, এমন বাঙালি পাওয়া দুষ্কর। বাঙালির ক্লান্ত মনে তিনি ভাবরস সঞ্চারিত করেন। কথিত আছে, চণ্ডীপাঠের আগে নাকি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র স্নান সেরে পট্টবস্ত্র পরে পুরোহিতের সাজে বসতেন স্তোত্রপাঠের জন্য। কিন্তু জানা যায়, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কোনও দিন সেরকম পুজো–‌আচ্ছা তো দূরে থাক, ঠাকুরকে একটা ধূপ অবধিও দেখাননি!‌ কিন্তু সেই মানুষটির ভক্তিভরা কণ্ঠস্বরের সঙ্গে বাঙালির আদি পরিচয়। একসময় বেতারে সরাসরি তাঁর স্তোত্রপাঠ শোনা যেত। এখন তো চাইলেই সারা বছর তাঁকে শুনতে পারেন বাঙালি, ইউটিউবের মাধ্যমে।
ছোটবেলা থেকে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন বীরেন্দ্র। ১৯০৫ সালের আগস্ট মাসে বীরেন্দ্রর জন্ম। বাবা কালীকৃষ্ণ ভদ্র, মাতা সরলাসুন্দরী দেবী। রামধন মিত্র লেনে তাঁদের বাড়িটি কিনেছিলেন তাঁর ঠাকুমা। ছিলেন উচ্চশিক্ষিত, জানতেন ইংরেজি ও সংস্কৃত ভাষা। পাঞ্জাবের নভা স্টেটের মহারানির নিজস্ব গৃহশিক্ষক হিসেবে তিনি নিযুক্ত ছিলেন।
শোনা যায়, অঙ্কে নাকি মন ছিল না একেবারে বীরেন্দ্রর। তাই তিনি ম্যাট্রিক পাশ করার পরে বীজগণিত, পাটীগণিত, জ্যামিতির বই গঙ্গার জলে ছুঁড়ে ফেলেন। তবে ছোটবেলা থেকেই প্রখর স্মৃতিশক্তি। তাঁদের রামধন মিত্র লেনের কাছেই তেলিপাড়া লেনে থাকতেন রাজেন্দ্রনাথ দে‌। তিনি ছোট্ট বীরেন্দ্রকে খুব স্নেহ করতেন। ওঁর কাছেই দশ বছর বয়সে প্রথম চণ্ডীপাঠ করেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ। এর পরে টাউন স্কুলে ভর্তি হলেও তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। একবার এই রাজেনবাবু একটি আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় বীরেনের নাম লিখিয়ে দেন। যে–‌সে কবিতা নয়, বীরাঙ্গনা কাব্য। অত কঠিন শব্দ সংবলিত কবিতা মুখস্থ করা চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু বালক বীরেন্দ্রর সেদিকে কোনও খেয়ালই নেই। প্রতিযোগিতার তিন–চার দিন আগে টনক নড়ল। চল্লিশ পাতার কবিতা। একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী হওয়ার কারণে নির্দিষ্ট দিনে আবৃত্তি করতে উঠলেন। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে যতটুকু আবৃত্তি করা যায় তা তো করলেনই, পরে আবার এক বিচারকের অনুরোধে তাঁকে আরও কিছুটা আবৃত্তি করে শোনাতে হয়। সেই প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলেন তিনি।
মেধাবী ছাত্র ছিলেন বটে, তবে স্কুলে মোটেই শান্তশিষ্ট ছিলেন না। নতুন কেউ স্কুলে‌ এলে তাকে বেশ ফাঁপরে পড়তে হত বীরেনের পাল্লায় পড়ে। একদিন তো চুলের সঙ্গে নকল টিকি পরে এসে সহপাঠীদের চমকে দিয়েছিলেন। কিশোর বয়সে খেলাধুলোয় বিশেষ উৎসাহ পেতেন না। সেই অজ্ঞতার মাশুল দিতে হয়েছিল বেতারে একবার ফুটবলের ধারাবিবরণী দিতে গিয়ে। উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। গোলের দিকে বল আসতেই তৎপর গোলকিপার বলটি নিজের হাতে ধরে নিলেন। কিন্তু বীরেন্দ্রকৃষ্ণ তখন আফসোস করছেন, এই রে, এই রে, হ্যান্ডবল হয়ে গেল! এক সহকারী বাধ্য হয়ে ধারাবিবরণীর মধ্যেই তঁার ভুল শুধরে দিলেন। আর একবার গোল হয়ে গেছে, কিন্তু বুঝতেই পারেননি। সেবারও পাশ থেকে আরেকজন ঘোষণা করে দিয়েছিলেন।
কিন্তু তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভার দৃষ্টান্তও ভূরি ভূরি। বেতারে নানা ধরনের অনুষ্ঠান করেছেন। রেডিও–‌নাটকে তিনি ছিলেন অবিসংবাদিত পথিকৃৎ। রঙ্গমঞ্চে অনুষ্ঠিত দীনবন্ধু মিত্র, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, শচীন্দ্র সেনগুপ্ত প্রমুখের নাটক বীরেন্দ্রকৃষ্ণের প্রযোজনায় বেতারে প্রচারিত হয়েছে। তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রযোজনা ছিল দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘‌চন্দ্রগুপ্ত’‌ নাটকটি।
১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শরীরের অবনতি হয়ে চলেছে ক্রমশ। বেতার কেন্দ্র থেকে প্রতি পনের মিনিট অন্তর কবিগুরুর স্বাস্থ্যের হাল–‌হকিকত জানানো হবে। নলিনীকান্ত সরকার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে ফোন করে জানাতে থাকলেন খবর। আর সেই খবর পৌঁছে যেতে থাকল বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে শ্রোতাদের কাছে। কিন্তু বেশিক্ষণ প্রচারের সুযোগ হয়নি। সেই দিনই বেলা ১২টা ১৩ মিনিটে বিশ্বকবি প্রয়াত হন। কবির শেষযাত্রার ধারাবিবরণীও দিয়েছিলেন তিনি। এর পরেও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিধানচন্দ্র রায় প্রমুখের প্রয়াণের ঘোষণা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র তাঁর নিজের কণ্ঠে করেছিলেন। 
বেতারে ‘‌মহিলা মহল’‌ পরিচালনা করতেন। তঁার প্রথম দিকের কাজ সেটা। ‘‌মেঘদূত’‌ ছদ্মনামে তিনি অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করতেন। ভগিনী নিবেদিতা, সাবিত্রী, দ্রৌপদী প্রমুখ নারীর সম্বন্ধে জানানোর পাশাপাশি সাহিত্যে নারীদের অবস্থান, ইউরোপীয় নারীদের কথা, এরকম নানা বিষয়ে আলোকপাত করতেন, যা শ্রোতামহলে বেশ সাড়া ফেলেছিল। দিনকয়েক পরে এই অনুষ্ঠানটি ‘‌বিষ্ণুশর্মা’‌ ছদ্মনামে প্রচার করা শুরু করেন। অননুকরণীয় বাগ্মিতায় অল্প সময়ের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন বিষ্ণুশর্মা।
তারপর শুরু হল সেই অনুষ্ঠান, যার সঙ্গে বাঙালির স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ জড়িয়ে গেল। যঁার কণ্ঠস্বরে ঘোষিত আগমনিবার্তায় দুর্গাপুজোর উৎসব শুরু। শুনতে শুনতে কারও মনে ভেসে ওঠে মায়ের মৃন্ময়ী রূপ, কারও চোখে ভাসেন তঁার ইষ্টদেবতা। কেউ বা নিজের প্রিয়জনের হারানো মুখ দেখতে পান। সেই প্রভাতী অনুষ্ঠান ১৯৩২ সালের ষষ্ঠীর ভোরে প্রথমবার প্রচারিত হয়, পরে যার নাম হয় ‘‌মহিষাসুরমর্দিনী’। তবে ১৯৩১ সালে ‘‌বসন্তেশ্বরী’‌ নামে প্রথম শোনা গিয়েছিল সেই অনুষ্ঠান, যেখানে বাণীকুমার শ্রীশ্রীচণ্ডীর কয়েকটি শ্লোক পাঠ করেন। শ্রোতাদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত হয় সেই আসর। সংস্কৃত নাটকের অন্তর্গত বীথি নাট্যশৈলী অনুসরণে নতুন ভাবে ‘‌মহিষাসুরমর্দিনী’‌ লেখেন বাণীকুমার। কয়েকটি গানে পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র বালি ও রাইচাঁদ বড়াল আর অধিকাংশ গানে সুরযোজনা করেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। গ্রন্থনায় ও শ্লোক আবৃত্তিতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র।
শোনা যায়, অনুষ্ঠানের দিন সকালে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ কোনও কোনও বার গাড়ির জন্যেও অপেক্ষা করতেন না। স্নান সেরে নিজেই বেতার কেন্দ্রে পৌঁছে যেতেন। মানসিকভাবে এতটাই যুক্ত ছিলেন তিনি অনুষ্ঠানটির সঙ্গে। আবেগমথিত কণ্ঠে, যন্ত্রসঙ্গীতের ওপর একটু সুর চড়িয়ে যখন শুরু করতেন— ‘‌আশ্বিনের শারদ প্রাতে, বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর...’‌, রোমাঞ্চিত হত আপামর বাঙালি। আজ তা বাঙালির আত্মার সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে।
১৯৭৬ সালে অবশ্য মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানের পরিবর্তে শোনা গিয়েছিল ‘‌দেবী দুর্গতিহারিণীম’‌। সাধারণ মানুষের মনে প্রবল ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল সেই অনুষ্ঠান শোনার পর। পঙ্কজকুমার মল্লিক, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র কেউই আগে থেকে এই নতুন অনুষ্ঠান সম্বন্ধে জানতেন না। বাণীকুমার তখন প্রয়াত। জানতে পেরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘‌আমি কি নতুন কিছু করতে কখনও আপত্তি করেছি!‌ একটিবার তাঁরা আমায় জানাল না!’‌ 
বেতারে আক্ষরিক অর্থেই তিনি জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ— সব‌ই করেছেন। কিন্তু উপযুক্ত সম্মান কি তিনি পেয়েছিলেন বেতার থেকে! তখন স্টাফ‌ আর্টিস্টদের পেনশন গ্র্যাচুইটির ব্যবস্থা ছিল না। প্রভিডেন্ট ফান্ডের সামান্য কিছু টাকা নিয়ে তিনি অবসর নেন। যে স্মৃতিশক্তি ছিল তাঁর গর্ব, সেই স্মৃতিশক্তি আস্তে আস্তে কমে আসতে শুরু করেছিল। একবার সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি ‌‌‌ভাষণ দেওয়ার সময় বলে বসেছিলেন, ‘‌কে এই সঞ্জীব চাটুজ্যে!’‌ পরে উপহারসামগ্রী তাঁর হাতে যখন তুলে দেন সঞ্জীববাবু, তিনি তঁার হাত ধরে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তঁার শরীরের আরও অবনতি হয়। শেষ বয়সের সাক্ষাৎকারে বারবার তঁার অভিমান ঠিকরে পড়েছে। হতাশাভরা কণ্ঠে বলেছেন, ‘‌ভাবতেই পারিনি আমাকে সবাই ভুলে যাবে।’‌ আবার এ কথাও বলতেন, ‘‌আমাকে ভুলে গেলেও বছরের একটি বিশেষ দিন লোকে আমাকে স্মরণ করবেই করবে। তাতেই আমার তৃপ্তি!’‌ 
১৯৯১ সালের ৪ নভেম্বর তিনি প্রয়াত হন। বেতার তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান না দিলেও, বাঙালির মনের মণিকোঠায় তিনি আজ‌ও চির উজ্জ্বল।‌

জনপ্রিয়

Back To Top