‌প্রচেত গুপ্ত
চাল, ডাল, নুনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, আনন্দমঠ, ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি।
শুনে চমকে উঠেছিলাম। বিশ্বাসও করিনি। ওরা বললেন, এরকম একটা, দুটো, তিনটে নয়, ২০০ বই রয়েছে। আমি আরও অবিশ্বাসী গলায় বললাম, লিস্ট পাঠাতে পারবেন?‌ ওরা হোয়াটসঅ্যাপে লিস্ট পাঠালেন। আমি চোখ ভরে, মন ভরে সেই তালিকা দেখলাম। একটু জানাই?‌
রবীন্দ্রনাথের ‘‌শিশু’, অবনীন্দ্রনাথের ‘‌নালক’‌‌, ‘‌শকুন্তলা’‌, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘‌আনন্দমঠ’‌, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘‌রামের সুমতি’‌, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘‌সেরা বারো’‌,  উপেন্দ্রকিশোরের ‘‌টুনটুনির বই’‌, ‘‌শিয়াল পণ্ডিত’‌, ‘‌পান্তাবুড়ি ও আরও গল্প’‌, সুকুমার রায়ের ‘‌হযবরল’, ‘‌ছোটোদের নাটক সমগ্র’, লীলা মজুমদারের  ‘‌গুপের গুপ্তধন’‌। পঞ্চতন্ত্র, রামায়ণ, মহাভারত তো আছেই। আছে বিজ্ঞান। ভারতের বিস্ময়কর বিজ্ঞান প্রতিভা, কীটপতঙ্গের কথা, অরূপরতন ভট্টাচার্যের ‘‌অঙ্ক নিয়ে বুদ্ধি বিচার’‌, কমল বিকাশ ব্যানার্জির ‘‌অঙ্ক নিয়ে মজার খেলা’‌। আর আছে পরিবেশ, কুইজ, মহাবিশ্ব। আছেন আইনস্টাইন, বিদ্যাসাগর। ভ্রমণ, ইতিহাস তো রয়েইছে। ইংরেজি বাদ যায়নি। ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি, পিনাশিও, দ্য কল অব দ্য ওয়াইল্ড। আছেন রাসকিন বন্ডও!‌
এই ২০০ বই চলেছে কোথায়?‌
চলেছে সাগরে। ত্রাণের চালের ডালের সঙ্গে বইও বিলি হবে। অবাক না হয়ে উপায় ‌কী?‌ অবাক এবং মু্গ্ধ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ত্রাণে এই প্রথম গুছিয়ে, চিন্তাভাবনা করে এভাবে এত বই দেওয়া হচ্ছে। এর আগে যদি কিছু হয়ে থাকে তা হয়েছে বিচ্ছিন্ন ভাবে, একক উদ্যোগে। তাও মূলত শহরে। ক’‌দিন আগে আজকালে আমার নিজের কলামে লিখেছিলাম, ত্রাণে কেন শুধু চাল–‌ডাল দেওয়া হয়?‌ সঙ্গে কেন বই থাকে না?‌ তারপরেই এই চমৎকার উদ্যোগের খবর পেলাম।
অবশ্যই আমার লেখাটি পড়ে নয়, যারা একাজ করছেন, নিজেদের বুদ্ধি বিবেচনাতেই করেছেন। বুদ্ধি বিবেচনা তো থাকবেই। কারা এই ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছে দেখতে হবে যে। যাচ্ছেন ‌‘‌আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু স্মারক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা কমিটি’ সদস্যরা‌। সহযোগিতায় রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ। আজ রবিবার কমিটির ২০ জন সদস্য চলছেন কাকদ্বীপের সাগরে। সঙ্গে যাচ্ছে ৫০০ জনের ত্রাণসামগ্রী। একটা দুটো.‌.‌.‌ পঁাচটা নয়, ত্রাণে মোট ২৭ রকমের জিনিস রয়েছে এবার। চাল, ডাল, ছাতু, বিস্কুট, জামাকাপড়, সাবান, মাস্ক, ছোটদের খেলনা, গামছা, ত্রিপল, স্যানিটারি ন্যাপকিন। আর বই। হ্যাঁ, বই। এই প্রথম ত্রাণে চলেছে বই। গল্পের বই।
বইয়ের কথা মাথায় এল কেন?‌
উত্তর কলকাতার এমন এক মানুষের সঙ্গে কথা হচ্ছিল যিনি নিজের জীবনকে নানারকম সেবামূলক সংগঠনে যুক্ত করেছেন। শুধু সেবা নয়, সঙ্গে রয়েছে শিক্ষা, পরিবেশ, বিজ্ঞান, খেলা। পাঠ্যপুস্তক বিতরণ থেকে রক্তদান সবে আছেন। করোনার দুঃসময়ে তাঁর সংগঠন যা করেছে তা এলাকার মানুষ মনে রাখবে। মানুষটি বিভিন্ন দুঃসময়ে কম করে হাজার বার ত্রাণ নিয়ে ছুটেছেন দুর্গমে। বললেন, ‘প্লিজ ‌আমার নাম লিখবেন না। কাজটা সবাই মিলে করি। আমরা একা কেউ নই।’‌
বললাম, ‘‌আচ্ছা লিখব না। এর আগে ত্রাণে কখনও বই নিয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছেন?‌’
‌‘‌না। এই প্রথম।’‌
‘এবার কেন ‌নিলেন?‌’‌
‘আমফান ঝড়ে ‌যাদের ঘরবাড়ি সব গিয়েছে, তাদের তো বইও গিয়েছে। তবে লিস্টে বই থাকবে না কেন?‌’
২০০ বই দিয়েছে পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ড। অবশ্যই এটা বড়‌ চিন্তা, বড় কাজ। চাইব বুক সেলার্স গিল্ড ত্রাণে আরও বই নিয়ে এগিয়ে আসুক। এরপর থেকে সবাই ত্রাণে বই দিক। এই উদ্যোগে অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টরস ওয়েস্টবেঙ্গল ‘‌ও আর এস’‌ আর স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে হাত বাড়িয়েছে।
সাগরের এই ত্রাণ সফরটি অভিনব হয়ে ওঠবার কারণ রয়েছে আরও।
এন্টালির দুই বোন সুস্মিতা দেবনাথ আর শুভমিতা দেবনাথ ভারি সুন্দর একটা কাজ করেছে। দুই স্কুল ছাত্রী এবার জন্মদিনের টাকা জমিয়ে একশো জন দুঃখকষ্টে থাকা ছেলেমেয়েকে বিস্কুট পাঠাচ্ছে। সেই বিস্কুট নিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা কমিটির সদস্যরা চলেছেন। মেয়ে দুটি এতদিন জন্মদিনে শুধু চেনা পরিচিত মানুষের শুভেচ্ছা ভালবাসা পেয়েছে, এবার একশো জন অচেনা মানুষেরও শুভেচ্ছা পাবে। চেনা মানুষের জন্মদিনের শুভেচ্ছা খুব আনন্দের, অচেনা মানুষের শুভেচ্ছা তার থেকেও বেশি আনন্দের। তাই না?‌

জনপ্রিয়

Back To Top