ডাঃ পল্লব বসুমল্লিক

যা কিছুই নতুন এবং প্রথম, তাতেই একধরনের অদ্ভুত উন্মাদনা, শিহরন, চমক। অসম্ভবকে সম্ভব করা যুদ্ধ জিতলেও ব্যাপারটা তাই। যতই তা হোক না কর্পোরেট ওয়্যার। বৈশ্বিক অতিমারীকে হার মানানোর যুদ্ধে প্রথম সাফল্যের সিঁড়ি চড়া সম্ভব হল একসঙ্গে বহু দেশকে একসূত্রে গেঁথে। মগজাস্ত্র বিশ্বের ১০০ ধনী জার্মানের অন্যতম এক বিজ্ঞানীর। জন্মসূত্রে তিনি আবার তুরস্কের। তাঁর গরিব অভিবাসী বাবা কপর্দকশূন্য অবস্থায় পৌঁছন কোলনে। চাকরি জোটে জার্মানিতে ফোর্ড কারখানায়। সেই বিজ্ঞানী ডঃ উগুর সাহিন এবং তাঁর স্ত্রী ওজলেম টুরেচি যৌথ মালিকানায় বায়োএনটেক গবেষণাগার চালান। সেটা কিন্তু বেলজিয়ামে। তাঁদের বাণিজ্যিক মেলবন্ধন মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল জায়েন্ট ফাইজারের সঙ্গে। সাহস করে ফাইজারকে প্রথম বরাত দেয় ইংল্যান্ডের এনএইচএস অর্থাৎ জাতীয় স্বাস্থ্য কাউন্সিল। সাহিন যে প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন তা বিশ্বে প্রথম। মেসেঞ্জার আরএনএ। শরীরে কোভিড–‌১৯ ভাইরাস না ঢুকিয়ে শুধু তার বার্তা পাঠিয়েই কেল্লা ফতে। তৈরি হতে শুরু করে রোগপ্রতিরোধকারী অ্যান্টিবডি এবং টি–‌সেল। মার্কিন আরেক বহুজাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারক মডার্নাও অবশ্য এম–‌আরএনএ ব্যবহার করছে। আমার সন্ধেয় পাঠানো ই.‌মেল–‌এর উত্তর এ প্রতিবেদন লেখার সময় অবধি আসেনি। তবে উগুর সাহিন ব্রিটেনের ‘‌‌দি গার্ডিয়ান’–‌কে জানিয়েছেন, ‘‌অবশ্যই আমার টিকা কোভিড–‌১৯ নির্মূল করবে’‌।
ভারতে আমাদের কী উপকার হবে?‌ মেডিসিন অতি–‌বিশেষজ্ঞ এবং বাংলায় কোভিড টাস্ক ফোর্সের বরিষ্ঠতম সদস্য ডাঃ সুকুমার মুখার্জি বললেন, কিস্যু না। যে কোল্ড চেন তৈরির কথা বলা হচ্ছে তা কুলতলি বা জঙ্গলমহলে বাস্তবে সম্ভব?‌ মাইনাস ৭০ ডিগ্রি!‌ শুনছি দামও পড়বে ৭০ ডলারের কাছাকাছি (‌ভারতীয় মুদ্রায় পাঁচ হাজার টাকারও বেশি)। আমি এখনও বলছি মাস্ক এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কোভিড–‌১৯ অনেকটা রোখা যায়। প্রায় বিনা খরচে। সরি, ফার্স্ট বয়কে কিন্তু হাততালি দিতে পারছি না।‌ প্রখ্যাত ক্যান্সার সার্জেন ডাঃ দীপ্তেন্দ্র সরকার জানালেন, খুব উন্নতমানের ভ্যাকসিন। কিন্তু সমস্যা হল মাইনাস ৭০ ডিগ্রিতে সংরক্ষণ। ব্রিটেন ভ্যাকসিন প্রয়োগ নিয়ে সবার আগে পথ দেখাল, এখন দেখার অন্যরা কী করে। আমাদের দেশের পরিকাঠামো ও দেশবাসীর জন্য যে ভ্যাকসিন সবচেয়ে বেশি কার্যকর তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গণটিকাকরণের মাধ্যমে প্রয়োগে যেতে হবে। আমাদের দেশে উৎপাদন হবে আর অন্য দেশ ভ্যাকসিন নিয়ে যাবে এটা যেন না হয়। ভ্যাকসিন প্রয়োগে দু’‌রকম পদ্ধতিই থাকতে হবে— ১)‌‌ সরকারের পক্ষ থেকে গণটিকাকরণ এবং ২)‌‌ যাঁরা কিনতে পারবেন তাঁরা সরকারের জন্য অপেক্ষা না করে নিজেরাই কিনে নেবেন। মূল নিয়ন্ত্রণ অবশ্য সরকারের হাতেই যেন থাকে। পিয়ারলেস‌ হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজিস্ট অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোল অফিসার ডাঃ ভাস্করনারায়ণ চৌধুরি বললেন, আরএনএ ভ্যাকসিন প্রোটিন বা অ্যান্টিজেন বেসড ভ্যাকসিনের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকরী। ভাইরাস মোকাবিলা শুধু অ্যান্টিবডিতে হয় না টি সেল–মেডিয়েটেড ইমিউনিটি সেল সেটাকেও অ্যাক্টিভেট করতে হবে। আরএনএ বেস ভ্যাকসিন এই দুটোই করে। ফ্লু ভ্যাকসিনের মতো বছরে একবার বা ৬ মাস অন্তর নিতে হবে কিনা আমাদের অজানা। চ্যালেঞ্জ মাইনাস ৭০ ডিগ্রিতে সংরক্ষণ। উন্নত বিশ্বেও এটা চ্যালেঞ্জ। ফাইজারের ভ্যাকসিনে খুব একটা নেগেটিভ কিছু নজরে আসেনি। তবে যেটাই দাবি করা হচ্ছে সবটাই খুব সীমিত সংখ্যক স্টাডির ওপর ভিত্তি করে। আরজিকর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন অধ্যাপক ডাঃ জ্যোতির্ময় পাল জানান, ইমার্জেন্সি ভিত্তিতে ব্রিটেন এই ভ্যাকসিন প্রয়োগের অনুমোদন দিয়েছে। প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণ করে প্যানডেমিকের সময় নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষের ওপর প্রয়োগ শুরু হচ্ছে। এখন যদি দেখা যায় সবদিক ঠিক আছে, তখনই মিলবে পাকাপাকি অনুমোদন। ইনফেকশাস ডিজিজ বিশেষজ্ঞ ডাঃ দেবকিশোর গুপ্ত বললেন, ভাল পদক্ষেপ। নিজের দেশে তৈরি ভ্যাকসিনের চেয়ে ফাইজারের ভ্যাকসিন বেশি ভাল এটা প্রমাণিত হল। উন্নত বিশ্বের কাছে ফাইজারের গ্রহণযোগ্যতাও অনেকটাই বাড়ল। পিয়ারলেস‌ হস‌পিটাল অ্যান্ড বি কে রায় রিসার্চ সেন্টার–‌এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল স্পেশ্যালিস্ট এবং ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজিস্ট অ্যান্ড ডিরেক্টর ডাঃ শুভ্রজ্যোতি ভৌমিকের মতে হেলদি ভলান্টিয়ারদের ওপর ভ্যাকসিনের প্রয়োগে দেখা গেছে ফাইজারের ভ্যাকসিন কোভিড সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ৯০ শতাংশের বেশি কার্যকর।
কোভিড ম্যানেজমেন্ট ও রাজ্য গ্লোবাল বোর্ড সদস্য ডাঃ অভিজিৎ চৌধুরি বলেন সবটাই কিনতে হবে। কর্পোরেটের ভ্যাকসিন। আমাদের দেশের জনগণের পক্ষে ফাইজারের ভ্যাকসিনের দাম অনেকটাই বেশি। আছে সংরক্ষণের সমস্যাও। এই ভ্যাকসিন আমাদের উপকারে খুব একটা নয়। যে কোল্ড চেন নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের কাছে এই ভ্যাকসিন পৌঁছনো দরকার তা আমাদের দেশে নেই। ধনীরা কিনতে পারবেন, কিন্তু প্রান্তিক মানুষের পক্ষে এই ভ্যাকসিন কেনা সম্ভব নয়। বিশিষ্ট কার্ডিয়াক সার্জেন ডাঃ কুণাল সরকার জানালেন, ভাল পদক্ষেপ। আশাকরি সবকিছু দেখে ‘‌আত্মনির্ভর’‌ ভারত কিছু একটা সিদ্ধান্ত নেবে। আমাদের হাতে প্রয়োগের মতন তেমন কোনও ভ্যাকসিন এই মুহূর্তে নেই। আমরা ফাইজারও পাব না, মর্ডানাও পাব না। অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। ইওরোপ বা আমেরিকার হাতে ফাইজার ও মর্ডানা দুটো ভ্যাকসিনেরই স্টক রয়েছে। আমরা প্রথম তিন–চার মাস যে ভ্যাকসিনের ওপর বাজি ধরেছিলাম সেটা এখন একটু নড়বড়ে জায়গায়।
শেষে জানাই, দোহাই ইংল্যান্ডে মেঘ করেছে বলে এখানে যেন ছাতা নিয়ে বেরোবেন না!‌ আমাদের এখনও মাস্ক মাস্ট। সামাজিক দূরত্বও। ভারতে ভ্যাকসিন ল্যান্ডিং এবং রোল আউটে এখনও অন্তত মাস চারেক বাকি।
তথ্য সহায়তা:‌ প্রীতিময় রায়বর্মন ‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top