তাপস গঙ্গোপাধ্যায়‌: ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সাতটি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন শিল্প সংস্থাকে, লাভ বা ক্ষতি যেভাবেই সেগুলি চলুক না কেন, বেচে দেবে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ভাগে পড়েছে দুটি— কলকাতার মানিকতলায় মূল কেন্দ্র নিয়ে বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, আর হাওড়ার ব্রিজ অ্যান্ড রুফস। দুটিই এখন লাভে চলছে।
বেঙ্গল কেমিক্যালের কথা উঠলেই বাঙালির মনে পড়তে বাধ্য একগাল গোঁফদাড়ি ও চুলের জঙ্গলে ঢাকা শীর্ণমুখ এক ঋষির কথা, যার নাম প্রফুল্লচন্দ্র রায়। রবীন্দ্রনাথ ও প্রফুল্লচন্দ্র সমসাময়িক। দুজনেরই জন্ম ১৮৬১ সালে। প্রফুল্লচন্দ্র বয়সে ৩ মাসের ছোট। তাঁকে বাঙালি জানে ভারতীয় আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানচর্চার জনক বা আচার্য বলে। যৌবনে তিনি যে অনায়াসে ঐতিহাসিকও হতে পারতেন এবং তার জ্বলন্ত প্রমাণ India Before And after The Mutin‌y‌ বলে একটি বইও লিখেছিলেন। এ সত্য ঐতিহাসিক হলেও, বইটির বাজারে অনুপস্থিতিতে তাঁর ওই পরিচয়টি বস্তুত অজ্ঞাতই থেকে গেছে। ২০০৭ সালে দীনহাটা কলেজের (‌কোচবিহার)‌ বাংলার অধ্যাপক প্রয়াত হিতেন নাগ লুপ্তপ্রায় বইটির, আচার্য নিজে যে প্রকাশক হিসেবে একবার ছেপেছিলেন, তার একটি কপি উদ্ধার করে এডিট করে নতুন ভাবে বাজারে ছাড়ার আগে অজানাই ছিল। আজও ক‌জন এই বইটির কথা জানেন!‌ বই লিখবেন বলে কিন্তু প্রফুল্লচন্দ্র লেখেননি। লিখেছিলেন একটি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় নেমে। ১৮৮৫–তে ব্রিটেনে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে ডিএসসি–র জন্য যখন প্রস্তুত হচ্ছেন, তখন ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বিষয়:‌ ভারত সিপাহি বিদ্রোহের আগে ও পরে।
প্রফুল্লচন্দ্র যোগ দিলেন। তখন বয়স ২৫। এই প্রতিযোগিতায় ভাল ভাবে লেখার জন্য ফরাসি ভাষা শিখে ওই পর্বের ভারতে ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে ফরাসিতে লেখা তাবৎ দলিল–‌দস্তাবেজ, বই, কাগজ, জার্নাল জোগাড় করলেন ও পড়লেন। সেই সঙ্গে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত সমস্ত বই, ম্যাগাজিন, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মন্ত্রী ও সদস্যদের বক্তৃতার সঙ্কলন সংগ্রহে এনে খুঁটিয়ে পড়লেন। দেখলেন, ১৭৭৪ সাল থেকে ১৮৮৫ (‌যখন প্রবন্ধটি লিখছেন)‌ মোট ১৯ জন গভর্নর জেনারেল ভারত শাসন করেছেন। এর মধ্যে একজন— লর্ড কর্নওয়ালিশ— দুবার। সিপাহি বিদ্রোহ হয় ১৮৫৭ সালে।
তাঁর প্রবন্ধ, পরে যা তিনি বই আকারে ছাপেন, এই গভর্নর জেনারেলদের শাসনকাল ঘেঁটে দুটি মূল তথ্য সামনে তুলে ধরেন। এক, এদের অধিকাংশই ব্যস্ত ছিলেন ব্রিটেনের ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশমতো ভারত শোষণে। দুই, ভারত যখন দুর্ভিক্ষে, মহামারীতে উচ্ছন্নে যাচ্ছে, তখন এই মহামতি গভর্নর জেনারেলদের চূড়ামণিরা ব্যস্ত ছিলেন, ব্রিটিশ ভারতের টাকায় কখনও বর্মা, কখনও আফগানিস্তান, কখনও ইরান, কখনও মিশর, কখনও আবিসিনিয়া, কখনও নিউজিল্যান্ড দখলের যুদ্ধে, যার সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতের স্বার্থের কোনও সম্পর্ক ছিল না। একটি হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্র দেখিয়েছেন ১৮০০ থেকে ১৮৮০ এই ৮০ বছরে ভারতে শুধু দুর্ভিক্ষেই মারা যায় এক কোটি ষাট লক্ষ লোক। প্রফুল্লচন্দ্রের কৈশোরে ও ছাত্রাবস্থায় ১৮৭৬ থেকে ১৮৮০, চার বছরে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে দাক্ষিণাত্য, মধ্যভারত ও পাঞ্জাবে মারা যায় প্রায় ৫০ লাখ মানুষ। তখন এ দেশের ভাইসরয় ও গভর্নর জেনারেল ছিলেন লর্ড লিটন। সুলেখক ও সুবক্তা হিসেবে খ্যাত লিটন তখন ব্যস্ত ছিলেন দিল্লিতে রানী ভিক্টোরিয়ার ভারত সম্রাজ্ঞী খেতাব গ্রহণের দরবার অনুষ্ঠান নিয়ে। যে অনুষ্ঠানের খরচ কয়েক কোটি পাউন্ড ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
এই সব জাঁকজমক অনুষ্ঠান ইত্যাদি ছাড়াও ভারতের বাইরে একের পর এক যুদ্ধে হাজার হাজার ভারতীয় সৈনিক যেমন মারা যাচ্ছিলেন, তেমনি হাজার হাজার কোটি ভারতীয় টাকাও জলের মতো ব্যয় হচ্ছিল। ১৮৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ সরকারের একদা প্রধানমন্ত্রী কিন্তু তখন বিরোধী দলনেতা গ্ল্যাডস্টোনের সংসদে প্রদত্ত বক্তৃতার অংশবিশেষ তুলে ধরে প্রফুল্লচন্দ্র দেখান, এই সময় ভারত সরকারের সামরিক বাজেটের পরিমাণ ছিল ২ কোটি পাউন্ড বা ২০ কোটি টাকা। সম্ভবত আর একটি মাত্র দেশ ছাড়া, এই পরিমাণ অর্থব্যয়ে যুদ্ধের জন্য অন্য কোনও দেশের বাজেটে বরাদ্দ নেই। অপর দেশটি অবশ্যই তখনকার সুপার পাওয়ার ব্রিটেন।
১৮৫৭ সালে, প্রফুল্লচন্দ্র লিখছেন, ভারত সরকারের পাবলিক ডেট বা ধারের পরিমাণ ছিল ৬ কোটি পাউন্ড। ওই ধারের পরিমাণ বিদ্রোহ মিটে যাওয়ার ৬ বছর পরে ১৮৬৩ সালে বেড়ে গিয়ে এক অবিশ্বাস্য অঙ্ক ১১ কোটি পাউন্ডে পৌঁছয়। কারণ প্রফুল্লচন্দ্র লিখছেন এই ধারের মূলে রয়েছে বিদ্রোহ দমনের জন্য ব্রিটেন থেকে নিয়ে আসা ব্রিটিশ ফৌজের তাবৎ খরচ, যা প্রায় সাড়ে চার কোটি পাউন্ড দিতে হয় ভারত সরকারকে। এর পরই প্রফুল্লচন্দ্রের তিক্ত মন্তব্য:‌ নানা সমস্যায় জর্জরিত ভারতের শুশ্রূষার জন্য ব্রিটেন একটি পয়সাও (‌ফার্দিং)‌ খরচ করেনি।
প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার ফলাফল বেরোতে দেখা গেল, প্রফুল্লচন্দ্র নন, অন্য এক প্রতিযোগী পেয়েছেন পুরস্কার। বিস্মিত প্রফুল্লচন্দ্র তখন এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তাঁর মূল লেখাটি চেয়ে পাঠালেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেটি ফেরত দিলে দেখা যায়, প্রতিযোগিতায় যে তিনটি লেখা শেষ বিচারের জন্য মনোনীত হয়েছিল, তার মধ্যে প্রফুল্লচন্দ্রের লেখাটিও ছিল। কেন সেটি পুরস্কার পেল না?‌ প্রফুল্লচন্দ্রের প্রবন্ধ সম্পর্কে বিচারকদের লিখিত মন্তব্য Remarkable‌ এবং Excellent, তবু পুরস্কারযোগ্য নয়। কেন?‌ বিচারকদের লিখিত মন্তব্য 'It is full of bitter diatribes against British Rule.'‌ (‌ভারতে ব‌্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তিক্ত সমালোচনায় ভরা এই লেখা)‌।

জনপ্রিয়

Back To Top