তাপস গঙ্গোপাধ্যায়- আগামী বছর, ২০১৯–‌এ এদেশে বেসরকারি ব্যাঙ্কের জাতীয়করণের ৫০ বছর পূর্ণ হবে। জানি না এই উপলক্ষে কেন্দ্রীয় সরকার বা ব্যাঙ্কগুলির কর্তাদের সংগঠন ব্যাঙ্কার্স অ্যাসোসিয়েশন কোনও উৎসব পালন করবে কিনা, তবে এটা আজ আমরা সবাই জানি, এই মুহূর্তে কেন্দ্রীয় সরকারের গলার সবচেয়ে বড় কাঁটাই হল সরকারি ব্যাঙ্ক এবং তাদের তহবিল। সরকারি ব্যাঙ্কগুলি ৪৯ বছরের মাথায় চলছে সরকারি ভর্তুকিতে। আর এর কারণ, যে দুটি প্রধান উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার জন্য প্রথমে ১৪টি পরে মোট ২৭টি বেসরকারি ব্যাঙ্কের দায় ও দায়িত্ব সরকার হাতে নিয়েছিল, তার একটিও পূরণ হয়নি। বরং উল্টোটাই হয়েছে।
সেই উদ্দেশ্য, যা ছিল প্রকাশ্যে ঘোষিত, কী ছিল?‌ এর উত্তর দিতে গেলে তখনকার কংগ্রেস ও তার পরিচালিত সরকারের অবস্থাটা কী ছিল, আগে বলে নেওয়া দরকার। ১৯৫১–‌৫২–‌র প্রথম সাধারণ নির্বাচন থেকে ১৯৬২–‌র তৃতীয় সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য কেন্দ্রে তো বটেই, অধিকাংশ রাজ্যেও ছিল। ব্যতিক্রম কেরল। কিন্তু ১৯৬৭–‌র নির্বাচনে কেন্দ্রে টায়টোয় ক্ষমতায় ফিরলেও উত্তর ভারতের অনেকগুলি রাজ্য, বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের হাতছাড়া হয়। এই নির্বাচনী অসাফল্যকে কেন্দ্র করেই কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির মূল ভরকেন্দ্র— যাকে তখন বলা হত সিন্ডিকেট— এই দুয়ের মধ্যে তুমুল দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সিন্ডিকেটের সদস্যরা ছিলেন কে কামরাজ (‌তামিলনাড়ু)‌, এস নিজলিঙ্গাপ্পা (‌কর্ণাটক)‌, এস কে পাটিল (‌মহারাষ্ট্র)‌, অতুল্য ঘোষ (‌পশ্চিমবঙ্গ)‌ প্রমুখ। সিন্ডিকেটের জন্য মোরারজি দেশাইকে হারিয়ে ইন্দিরা প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছিলেন। কিন্তু হয়ে দেখলেন, ক্ষমতা তাঁর হাতে নয়, ওই আঞ্চলিক নেতারাই সর্বেসর্বা। ইন্দিরা ঠিক করলেন এই সিন্ডিকেটের জারিজুরি ভেঙে একদিকে যেমন প্রধানমন্ত্রীর পদকে করে তুলবেন ক্ষমতার মূল কেন্দ্র, তেমনি কংগ্রেস দলটিকেও গড়ে তুলবেন নিজের চাহিদামতো। সেই সুযোগ এসে গেল দেশের চতুর্থ রাষ্ট্রপতির নির্বাচনকে ঘিরে। সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন ১৯৬৭ সালে অবসর নেন। তাঁর জায়গায় তৃতীয় রাষ্ট্রপতি হলেন ড.‌ জাকির হোসেন। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই ১৯৬৯–‌এ তাঁর মৃত্যু হওয়ায় চতুর্থ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনিবার্য হয়ে উঠল।
সিন্ডিকেট কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে অন্ধ্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, একদা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সঞ্জীব রেড্ডির নাম ঘোষণা করলেও ইন্দিরা রাজি হলেন না। তিনি শ্রমিক নেতা বরাহগিরি ভেঙ্কটগিরির নাম প্রস্তাব করলেন। ব্যাঙ্গালোরে (তখনও বেঙ্গালুরু হয়নি)‌ এই দুটি নামকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস দু’‌ভাগ হয়ে গেল। একদিকে সিন্ডিকেট ও তাদের সহচর অধিকাংশ রাজ্যের কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী বা প্রদেশ নেতারা। ইন্দিরার সঙ্গে গেলেন সিন্ডিকেট–‌বিরোধী কংগ্রেস নেতারা, যেমন পশ্চিমবঙ্গের সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, মুম্বইয়ের রজনী প্যাটেল এবং দুই কমিউনিস্ট পার্টি— সিপিআই ও সিপিএম। গোটা কংগ্রেস দল ও আম জনতার মন পাওয়ার জন্য ইন্দিরা গান্ধী জিগির তুললেন দুটি প্রধান স্লোগান সামনে রেখে। রাজন্যভাতা বিলোপ ও বেসরকারি ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ।
কেন বেসরকারি ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ?‌ তার কারণ হিসেবে সেদিন ইন্দিরা বলেছিলেন, ব্যাঙ্কগুলির আমানতের তিন–‌চতুর্থাংশ আসে উচ্চমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের সঞ্চয় থেকে, অথচ ব্যাঙ্কের ঋণ পায় মুষ্টিমেয় কয়েকজন শিল্পপতি ও বড় ব্যবসায়ী। যদি ওই সব ব্যাঙ্ক সরকারের হাতে আসে, তাহলে গ্রামের কৃষক, বেকার উদ্যোগী যুবক থেকে আম আদমির কাছে ব্যাঙ্ক লোনের দরজা খুলে যাবে।
সেদিন ইন্দিরা ব্যাঙ্কের জাতীয়করণে সফল হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী ২২ বছর ব্যাঙ্কগুলির চেয়ারম্যান ও এমডি সরকারি অনুমোদনেই নির্ধারিত হওয়া ছাড়া আম‌ আদমির কোনও কাজে এসেছে বলে জানা যায়নি। জানা গেল ১৯৮১ সালে। এক বছর আগে ১৯৮০–‌তে ইন্দিরা গান্ধী আবার ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসেন। এই দ্বিতীয় দফায় প্রথম ২ বছর তাঁর অর্থমন্ত্রী ছিলেন কর্ণাটকের জনার্দন পূজারী। পূজারীর নেতৃত্বে শুরু হল সরকারি ব্যাঙ্কের টাকায় ‘‌লোন মেলা’‌।‌ শুরুটা করলেন ইন্দিরা গান্ধী, তারপর রাজ্যে রাজ্যে চলল আম‌ আদমিকে লোন দেওয়ার নামে হরির লুঠের মোচ্ছব। যঁারা লোন বা ধার দিলেন, তঁারাই তঁাদের চ্যালাদের দিয়ে ভোটের আগে খবর দিলেন, টাকা শোধ দেওয়ার দরকার নেই, ভোট দিলেই চলবে। শুরু হল সরকারি ব্যাঙ্কগুলির রক্তমোক্ষণ। পরবর্তী ৩৭ বছর ধরে ‘‌নীরবে’‌ ব্যাঙ্কগুলির রক্তমোক্ষণ হয়ে চলেছে। সেই রক্তক্ষরণের চূড়ান্ত পরিণতি আজ পাঞ্জাব ন্যাশানাল ব্যাঙ্কের হিসেবমতো প্রায় ১১ হাজার ৫০০ কোটি আর রাহুল গান্ধীর হিসেবমতো ২২ হাজার কোটি টাকা তছরুপ। যা করেছে গুজরাটি দুই হীরে ব্যবসায়ী। মামা–‌ভাগনে। ভাগনে নীরব মোদি, মামা মেহুল চোকসি। আর ওঁরা ওই পরিমাণ টাকা হাপিশ করে ব্যাঙ্ককে পথে বসিয়ে নীরবে পালিয়ে গেছেন দেশ ছেড়ে। নীরবের সরব অস্তিত্ব পাওয়া গেছে নিউ ইয়র্কে। সেখানে জে ডব্লু ম্যারিয়ট হোটেলের ফি দিনে ৭৫ হাজার টাকা ভাড়ার সুইট ৩ মাসের জন্য ভাড়া নিয়ে আছেন নীরব।
নীরব মোদির ঢের আগে আরও দুই গুজরাটি ব্যবসায়ী হর্ষদ মেহতা ও কেতন পারেখ নয়ের দশকে শেয়ার কেনা‌বেচায় বিলিওনেয়ার হওয়ার উদ্দেশ্যে গুটিকয়েক ব্যাঙ্কের সর্বনাশ করে ছাড়েন। হর্ষদ মরে বেচেছেন। কেতনের মামলা এখনও চলছে। যেমন একদা কলকাতায় বড় হওয়া কন্নড় ব্যবসায়ী বিজয় মালিয়া স্টেট ব্যাঙ্ক ও অন্যান্য কয়েকটি ব্যাঙ্কের সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা হাপিশ করে লন্ডনে গিয়ে বসে আছেন।
অধিকাংশ সরকারি ব্যাঙ্কের তহবিলের একটা বড় অংশ আজ এনপিএ বা নন–‌পারফর্মিং অ্যাসেটে পরিণত। যার পরিমাণ সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি। কখন ব্যাঙ্কের লোন, যার সুদে ব্যাঙ্ক চলে, লাভ করে, এনপিএ–‌তে পরিণত হয়?‌ যখন ঋণের কিস্তি শিল্পপতিরা শোধ করেন না বা করতে পারেন না। ব্যাঙ্কের ওই অনাদায়ী ঋণের ভারে নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। যাতে শ্বাস–‌বন্ধ না হয়, সেজন্য বছর বছর কেন্দ্রের সরকার সরকারি ব্যাঙ্কগুলিকে আপনার আমার করের টাকায় ভর্তুকি দেবে, যা মূল ঋণের ভগ্নাংশ মাত্র। বলা যেতে পারে ওই ভর্তুকি দেওয়া মুমূর্ষু রোগীকে অক্সিজেন দেওয়ারই শামিল। এভাবে কতদিন চলবে?‌
পাশাপাশি দেখি দেশি বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলি চলছে রমরম করে। স্টেট ব্যাঙ্কের পরই এ দেশে সবচেয়ে বড় ব্যাঙ্ক কিন্তু কোনও সরকারি ব্যাঙ্ক নয়। বেসরকারি। আইসিআইসিআই। দ্বিতীয় স্থানেও বেসরকারি— এইচডিএফসি। কই, ওদের টাকা মার খাওয়ার কথা তো কখনও ওঠে না। প্রথমটির বর্তমান মুখ্য কর্ত্রী ছন্দা কোছার, দ্বিতীয়টির আদিত্য পুরি। এঁদের সঙ্গে তাবৎ শিল্পপতি ও রাজনৈতিক নেতাদের সুসম্পর্ক  থাকলেও, কেউ এঁদের চাপ দিয়ে বেআইনিভাবে লোন পাইয়ে দিতে পারে না। যেটা হচ্ছে দেশের ২৭টি সরকারি ব্যাঙ্কে। হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ সরকারি ব্যাঙ্কের সিএমডি–‌‌রা কী দেখে দিচ্ছেন?‌ কী সিকিউরিটি তাদের ব্যাঙ্কে জমা থাকছে?‌ আসলে জমা থাকছে দেশের কর্ণধারদের ইচ্ছা, যা কখনও সামনা–‌সামনি মুখে, কখনও বা অন্য ব্যক্তি মারফত জানানো হয়। ফোনে নয়, তাহলে রেকর্ড থেকে যাবে। আম‌আদমি যে টাকা মারে না, ছোট ছোট ঋণ যারা নেয়, তারা যে সময়ে ধার শোধ করে, তার সবচেয়ে বড় সাক্ষী এই মুহূর্তে বন্ধন ব্যাঙ্ক। বন্ধনের ১৫ আনা লোনই ছোট অঙ্কের। যারা নেয়, তারা সুদ সমেত সময়মতো শোধ দেয়। দেয় বলেই তিন বছর আগের মাইক্রো ফিনান্স কোম্পানি বন্ধন আজ পরিপূর্ণ একটি ব্যাঙ্ক। আর একদা বেসরকারি পরিপূর্ণ ব্যাঙ্ক সরকারি আওতায় এসে আজ উঠে যাওয়ার মুখে।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top