ধীমান দাশগুপ্ত: দুটি অপরিচিত মানুষের আলাপ হল, ধরা যাক রবিবারের বেলাশেষের কোনও মন্থরগতি ট্রেনের কামরায়। দীর্ঘ যাত্রার অবসাদ কাটাতে এলোমেলো গল্প— সংসার, রাজনীতি, মাছের দাম, খেলাধুলো, কী নেই তাতে!‌ কষ্ট করে কেনা পারশে মাছ নিয়ে গেছে ‘বিড়ালে’, শুনে অন্যজন সহসা প্রশ্ন করে বসলেন, ‘‌মশাই, বুঝি ওপার বাংলার?’‌
পারশে মাছের শোক ভুলে উত্তর দিলেন অন্যজন, ‘‌আমরা ময়মনসিংহের! তা আপনিও তো মনে হচ্ছে.‌.‌.‌’‌
প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই উত্তর এল— ‘‌আমরা পাবনার। ওই নদীর এপার–ওপার আর কি!’‌
আলোচনা ঘুরে গেল অন্যদিকে। বরিশাল আর দিনাজপুরের নিন্দেমন্দ, পদ্মার ইলিশ, শাঁখারিবাজার থেকে এপার বাংলার কুখ্যাত রান্না। 
একইভাবে দু’জন মাঝবয়সি মানুষের আলাপ, ধরা যাক নিউ ইয়র্কের কোনও পানশালায়। একই ধরনের আলাপচারিতা গভীরতা পায় নামের আদানপ্রদান হলে। জোন্স শুনে একজন শুধোন, ‘‌আপনি তাহলে ওয়েলশ? আমরা ও’ক্যালাহানরা আইরিশ। তবে আমার মায়ের ঠাকুরদাদার বাবা অবশ্য ইতালির টাস্কানি থেকে এসেছিলেন।’‌ ব্যাস শুরু হয়ে গেল ইংরেজদের নামে নিন্দে, ফরাসিদের প্রতি কটাক্ষ! মধ্যপ্রাচ্যের এক শহরে ফুটপাথ লাগোয়া খাবারের দোকানে, একজন বাঙালি, ক্যাশিয়ারকে বলেছিলেন, ‘‌দেখে তো ভারতীয় মনে হচ্ছে!’‌ উত্তর এসেছিল, ‘‌কুমারাকোম, কেরল। তা আপনি কোন রাজ্যের?’‌ পশ্চিমবঙ্গ শুনে খানিকক্ষণ জ্যোতি বসু আর ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ নিয়ে কথা চলল, থামল আরবদের কেচ্ছা থেকে পাকিস্তানের ক্রিকেটে।
পুলওয়ামায় ৪৪ জন সিআরপিএফ জওয়ানের মৃত্যু এবং তারপর বালাকোটে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বোমা ফেলা, পাক সেনার হাতে বৈমানিক অভিনন্দন বর্তমানের গ্রেপ্তারি এবং দু’‌দিনে মুক্তি— দেশপ্রেমের জোয়ারে দেশ ভেসে যাচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে আমার ক্ষৌরকার নকুল প্রামাণিক, কেউ বাদ ছিল না। চুল কাটার ফাঁকে নকুলকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‌তোমার ভাইকে দেখছি না তো, সে কোথায়?’‌ নকুল হেসে জানাল, সপ্তাহের শেষ তিনটে দিন ওর ভাই দেশে যায়। দেশ কোথায়? মেদিনীপুরের ঘাটালে। কী বুঝলেন ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপ কাঁপানো বীর দেশপ্রেমিকরা। ভারতও দেশ, ঘাটালও দেশ! পাবনাও দেশ আবার বাংলাদেশও দেশ! এ আবার হয় নাকি!‌ এ তো তোর বোন আমার বোনের মতো, আর আমার মা তোর মায়ের মতো, আয় ভাই দাওয়ায় বসে মুড়ি খাই।
দেশ বা কান্ট্রি হল যেখানে আমার শিকড় আছে। এই নিয়ে ইংরেজি তথা সব ইউরোপীয় ভাষার সঙ্গে ভারতীয় ভাষাগুলির একটা মিল আছে। চলতি ইংরেজিতে কান্ট্রি মানে গ্রাম, বাংলাতেও দেশ মানে গ্রাম। দেশ মানে সেই স্থান যেখানে আমার মুখের ভাব, মুখের ভাষা সবাই বোঝে। সেখানের মাটির গন্ধ আমার চেনা, জলের স্বাদ অনন্য, বাঁধানো বটতলার প্রতিটা ঝুরি আমায় চেনে, দিঘির শানবাঁধানো ঘাট আক্ষেপ করে বলে, কতদিন বাদে এলি রে। হলই বা পার্ক সার্কাসে জন্ম! ঠাকুমা–দিদিমার মুখে শোনা গল্পে পদ্মার কোটালের ইলিশ, ঢাকার শাঁখারি, অক্ষয় তৃতীয়ার কাসুন্দি, কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল, কালাপাহাড়ের হাতে ভাঙা পোড়ামাটির দেউল— সবই দাগ কেটে গেছে মনের গভীরে স্লেটের ওপর হাতেখড়ির মতন। 
এই উপমহাদেশ, বা এই ভূখণ্ড বহু হাজার দেশের সমষ্টি ছিল, অন্তত ১৭০৭ সালে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু অবধি। ইংল্যান্ডেও তাই ছিল। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব থেকে ১৮৪৮ শিল্পবিপ্লব অবধি। এসময়ে শুরু হল আধুনিক নগরসভ্যতা। গ্রামের মানুষ শিকড় ছেড়ে শহরে এলেন কাজের তাগিদে, ভিন্ন জীবনের তাগিদে। দেশের জায়গা নিল নেশন। তবে সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে জাতির সমস্যাটা একটু বোঝা যাক।
রবীন্দ্রনাথের কথায়, জাতি আর নেশন এক নয়; তাঁর কাছে জাতি মানে ‘রেস’। এবং জাতীয়তাবাদ আর ন্যাশনালিজম এক নয়। ইউরোপের ক্ষেত্রে ছয়টি জাতিসত্তার কথা উল্লেখ করা যায়— গ্রিক, রোমান, গল, নর্ডিক, গথিক এবং স্লাভিক। ভারত উপমহাদেশের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু জটিল। বৈদিক যাযাবরেরা মূলত অ্যালপিনো এরিয়ান এবং বৈদিক সময়ের মূলধারা ভারত ভূখণ্ডে ঘটেনি। ঘটেছিল ব্যাকট্রিয়ায় এবং পারস্যে। তখন গঙ্গা উপত্যকায় প্রচুর অরণ্য, এবং যেহেতু বৈদিক যুগে তামা ছিল, পরের দিকে ব্রোঞ্জ ছিল, কিন্তু লোহা আবিষ্কৃত হয়নি, জঙ্গল কেটে বসতি বানানোর যোগ্য যন্ত্রপাতি, মূলত কুঠার ছিল না। তবু এখানে অনেক জাতির বসবাস ছিল। আদি বাঙালিরা মূলত ছয়টি উপজাতির সমষ্টি— ডোম, ভিল, লোধ, শবর, বাগদি এবং পোদ, যারা সবাই অস্ট্রিক বা অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছিলেন। এঁরাই আজ থেকে সাত হাজার বছর আগে নিম্ন গাঙ্গেয় এবং ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ধানচাষ শুরু করেন। দ্রাবিড়রা নিগ্রোয়েড বা আফ্রিকার জনজাতি উদ্ভূত। লৌহযুগের পরে যখন বৈদিক যাযাবরেরা গঙ্গা উপত্যকায় ঢুকতে শুরু করে, তখন তাঁরা এইসব অঙ্গরাজ্যকে ব্রাত্য করে রাখেন। এরপর বৌদ্ধযুগে আসতে শুরু করে তিব্বতি মঙ্গোলয়েডরা। রক্তমিশ্রণ ঘটে। পরে গুপ্তযুগে, দক্ষিণের চোলরাজারা, মশলা রপ্তানির স্বার্থে, আজকের কক্সবাজার বন্দর দখল করে নেন। সেই প্রথম দ্রাবিড় আগ্রাসন, এবং রক্তমিশ্রণ। চারের শতকের বাঙালি জাতি তিন–রক্তের বর্ণসংকর।
অবশ্য আধুনিক বাঙালিরা প্রায় ৭৫ শতাংশই ১২ শতকে আসা উত্তর ভারতের মানুষ। জাতি এক সদা–চলনশীল বা পারমিয়েবল বিভাজন। শ্রীলঙ্কার তামিল রক্তে অশোকের পুত্র– কন্যার সঙ্গে যাত্রা করা বাঙালির রক্ত রয়েছে, রয়েছে পর্তুগিজ দখলদারের রক্ত। আলেকজান্ডারের সঙ্গে আসা সেনাপতি সেলুকাস দক্ষিণ–পশ্চিমে থেকে যান। কোঙ্কন তটভূমির মানুষের রক্তের সঙ্গে গ্রিক রক্ত মিশে উদ্ভূত হয় আজকের কুর্গি জাতির। দুই সহস্রাব্দ আগেই ভিলরা সরে যায় অধুনা মধ্যপ্রদেশ ছত্তিশগড়ের দিকে, গোন্ড–ভিল মিলনের ফলে মধ্য ভারতে সালাঙ্কারা জাতির উদ্ভব। এমন অজস্র জাতিসত্তা রয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে। সেই কারণে ভারত একটি জাতি নয়, বহুজাতিক সমষ্টি মাত্র।
ভারতে নেশন আসে ইউরোপীয়দের হাত ধরে। সমাজব্যবস্থার মধ্যের অন্তর্নিহিত স্থিতি ধরতে না পেরে বেঙ্গল এবং মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিকে ইন্ডিয়ান নেশন বলে চালাতে থাকে ক্লাইভ–হেস্টিংস–কর্নওয়ালিসের মতো অর্ধশিক্ষিতের দল। তাই নেশন কী জানতে তাকাতে হবে মার্কিন আইনব্যবস্থার দিকে। ১৮৯১ সালে হেনরি ক্যাম্পবেল ব্ল্যাক রচিত আইনি অভিধানকে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ‘সেকেন্ডারি লিগাল অথরিটি’র মর্যাদা দিয়েছে। এই অভিধানের মতে নেশন একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী, যার উৎস এক, ভাষা এক, একই পরম্পরা এবং সাধারণত একই রাজনৈতিক পরিচয়। এর কোনওটাই ভারতের ক্ষেত্রে খাটে না। ফলে ভারত নেশন নয়। নেশনের কাজ ছিল যুদ্ধবিগ্রহ বয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থে এক ভাববাদ তৈরি করা জনমানসে, যার ফলে নেশনের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত থাকে নাগরিক। সেই কাজটা এই কৌশলী কার্যক্রম যথার্থভাবে পালন করেছে। ভারতে ন্যাশনালিস্টরা এই ধার–করা পরম্পরা বয়ে নিয়ে চলেছে। কিন্তু ভারত, নেশন অর্থে নেশন নয়।
তবে ভারত কী? খ্রিস্টপূর্ব নয়ের শতকে কাশেয় নামের এক ধনী ক্ষত্রিয়ের সন্তান কাশ্য স্থির করেন তিনি বিশ্বনাথের মন্দির গড়বেন। মিথিলার উত্তরে এক স্থানে দুটি নদী এসে গঙ্গায় মিশেছে— ভরন্তটির নাম বরুণ আর শীর্ণকায়াটির নাম অসি— এর মধ্যবর্তী উর্বর জমিতে স্থাপিত রাজ্যের নাম বারাণসী। এখানেই স্থাপিত হয় বিশ্বনাথের মন্দির এবং কাশেয় রাজার নামে তার নাম কালক্রমে কাশীধাম হয়ে ওঠে। এখানে অথর্ব বেদ লিপিবদ্ধ হয় এবং ক্রমে এক চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে ওঠে। কাশ্যের সন্তান দীর্ঘতপঃ মেধাবী ছিলেন এবং দ্বিজত্ব লাভ করেছিলেন। কাশ্য বারাণসীর মাহাত্ম্য প্রচারের দায়িত্ব তাঁর হাতে তুলে দেন। দীর্ঘতপঃর পুত্র দীর্ঘতমঃ কাশীধামের দায়ভার হাতে নেন, গড়ে তুলতে থাকেন এক বাণিজ্যকেন্দ্র এবং চিকিৎসাকেন্দ্র। দীর্ঘতপঃ পরিব্রাজক হয়ে বেরিয়ে পড়েন কাশীধামের মাহাত্ম্য প্রচারে। এই প্রচারকের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে নানা রাজ্যে এবং অচিরেই এই রাষ্ট্রকারী প্রচারক, ‘রাষ্ট্র’ নামে পরিচিত হন। দূরদূরান্ত থেকে ব্রাহ্মণ, রাজন্য এবং বৈশ্যের দল আসতে থাকেন কাশীধামে। উদ্দেশ্য বিবিধ; বিশ্বনাথ দর্শন, ব্যবসা এবং চিকিৎসা। দীর্ঘতপঃ–রাষ্ট্রের খ্যাতি আরও বাড়ে যখন তাঁর পৌত্র ধন্বন্তরি সুশ্রুতসংহিতা রচনা শুরু করেন। 
নেশনের মতো রাষ্ট্রও প্রচারযন্ত্র, তবে বিভেদকামী নয়। ভারত ভূখণ্ডে ধর্মরাষ্ট্র মিলনকামী, অথচ অনুশাসনরহিত। রবীন্দ্রনাথের ‘বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান’ এই কর্মযজ্ঞের কথা সবিস্তারে উল্লেখিত রয়েছে বিষ্ণুপুরাণে এবং বৌদ্ধ ষোড়শ মহাজনপদ গ্রন্থে। এই ভূখণ্ডে বহুমাত্রিক ভারতীয়তা গড়ে ওঠার প্রেক্ষিতে বারাণসী এবং দীর্ঘতপঃ–রাষ্ট্রের অবদান অসীম। ধর্ম সনাতন অর্থে রিলিজিয়ান নয়। ধর্মের অর্থ চর্যা। ধর্মের অর্থ জলের মতো পাত্রের আকার ধারণ করা। প্রাচ্যের ধর্ম আর পাশ্চাত্যের রিলিজিয়ান কখনওই এক ছিল না। ভারত একটি ধর্মরাষ্ট্র, এবং বিবিধ জাতিকে একত্রিত করার একটি পন্থা। যৎসামান্য লেখাপড়া করলেই উগ্র ন্যাশনালিস্টদের ভ্রান্তি দূর হতে পারে, যদি সদিচ্ছা থাকে।‌‌

 

জনপ্রিয়

Back To Top