দেবাশিস পাঠক: আর–একটা বড়দিন কাটল। কাটল পার্ক স্ট্রিটের আলোকমালা আর ভিড়ে। বো ব্যারাকে ক্যারল–‌উচ্ছলতায়। অজস্র বর্ণিল ‌‘‌মেরি ক্রিসমাস’‌ মেসেজ মোবাইলে মোবাইলে ছড়িয়ে।
কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ থাকল নিজস্ব মেজাজে। কেকের গন্ধে। ঠিক যেমন করে গত ইদেও নিজস্ব মেজাজে ছিল পুরনো দিল্লি, জামা মসজিদের আশপাশের এলাকাগুলোর আলোকসজ্জায়, কাবাবের গন্ধে।
কিন্তু সারা ভারত সম্পর্কে কি একথা বলা যাবে?‌
বোধহয় না।
কারণ, কলকাতার বড়দিনের বা পুরনো দিল্লির ইদের একটা সম্প্রদায়মুক্ত চরিত্র আছে। কেবল খ্রিস্টধর্মাবলম্বী বা ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের উৎসব নয় তা। কিন্তু সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে এবারের বড়দিন তার সেই চরিত্র–‌ধর্মটি অটুট রাখতে পারেনি। শঙ্কায় সে গুটিয়ে থেকেছে। বিদ্বেষের আগুনে তার শরীর পুড়েছে। বড়দিনের কেকে এবার তাই সাম্প্রদায়িকতার পোড়া দাগ। সৌজন্যে হিন্দুত্ববাদীদের অশিক্ষিত মোড়লি। ব্যাপারটা নিয়ে হইচই তেমনভাবে হয়নি, কারণ বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটানো হয়েছে উত্তর ভারতের গ্রাম আর ছোট ছোট শহরগুলোয়। মেট্রোপলিটন শহরের কসমোপলিটন আদিখ্যেতায় তা আড়াল হয়েছে।
কিন্তু ঘটনাগুলো ঘটেছে। এবং সেগুলো একটা বিপজ্জনক আগামীর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই যেমন ১৪ ডিসেম্বরের একটা ঘটনা। ঘটনাস্থল মধ্যপ্রদেশের সাতনা। ক্যারল গাইছিল একদল খ্রিস্টান। প্রাণের উৎসব আসার আনন্দে মনের খুশি প্রকাশের তাগিদে। বজরং দলের তৎপরতায় পুলিস তাদের গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ, তারা নাকি ধর্মান্তরকরণের চেষ্টা চালাচ্ছিল। মামলা রুজু করল পুলিস ১৫৩ খ, ২৯৫ ক ধারায়। প্রথমটি জাতীয় সংহতিবিরোধী কার্যকলাপের জন্য, দ্বিতীয়টি কারও ধর্মবিশ্বাসে আঘাত দেওয়ার জন্য। কয়েকজন খ্রিস্টান যাজক ধৃতদের জন্য থানায় গেলে তাঁদেরও আটক করা হয়। বজরং দলের কর্মীরা ওই যাজকদের গাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।
খ্রিস্টমাসের গির্জা মোমবাতির নরম আলোয় সেজে ওঠার আগে ভয়জাগানিয়া বহ্ন্যুৎসব। তা সত্ত্বেও দেশের শাসকদলের কর্মকর্তারা ‘‌বিচ্ছিন্ন ঘটনা’‌র যুক্তি দিলেন। কিন্তু ঘটনাগুলো ঘটতেই লাগল নিরবচ্ছিন্নভাবে।
১৮ ডিসেম্বর। এবার উত্তরপ্রদেশের আলিগড়। হিন্দু জাগরণ মঞ্চ থেকে মিশনারি স্কুলগুলোতে সাফ জানিয়ে দেওয়া হল, খ্রিস্টমাস পালন করা চলবে না। মঞ্চের স্থানীয় সভাপতি সোনু সবিতা। তিনি কোনও রাখঢাক না করেই বলে দিলেন, সুকুমারমতি হিন্দু শিক্ষার্থীদের ওপর ওসব খেরেস্তানি কেতা আরোপ করা চলবে না। কারণ, এসবই হল ধর্মান্তকরণের প্রচেষ্টা। খ্রিস্টান বানানোর প্রথম ধাপ। এরকম কোনও কাজ হলে, অর্থাৎ স্কুলগুলোতে খ্রিস্টমাস পালনের কোনও তোড়জোড় হলে, তা যেন স্কুলগুলো নিজ দায়িত্বে করে। ঝামেলার কোনও দায় হিন্দু জাগরণ মঞ্চ নেবে না।
একেবারে খুল্লমখুল্লম হুমকি।
অথচ, কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে কোনও হেলদোল দেখা গেল না তেমনভাবে। অরুণ জেটলি, পীযূষ গোয়েল, জে পি নাড্ডা বা স্মৃতি ইরানির মতো কোনও দায়িত্বশীল মন্ত্রী এগিয়ে এসে বললেন না, ‘‌এসব বাজে কথা। আমরাও তো মিশনারি স্কুলে পড়েছি। সেখানে খ্রিস্টমাস পালনে অংশ নিয়েছি। তাতে তো আমাদের খ্রিস্টান করা হয়নি। আমরা তো দিব্যি বিজেপি করতে পেরেছি এবং পারছি।’‌‌
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অরুণ জেটলি দিল্লির সেন্ট জেভিয়ার্সে, জে পি নাড্ডা পাটনার সেন্ট জেভিয়ার্সে, পীযূষ গোয়েল মুম্বইয়ের ডন বসকো–‌তে এবং স্মৃতি ইরানি দিল্লির হোলি চাইল্ড অকজিলিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করেছেন।
রাজস্থানেও একই ঘটনা। গঙ্গানগরের চার্চ অফ জেসাসে খ্রিস্টমাস পালনের উদ্যোগে হামলা চালানো হল। অভিযোগ একই, খ্রিস্টমাস পালনের অছিলায় ধর্মান্তরকরণের আয়োজন চলছে।
তাই, তাই–ই, কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরুর রেস্তোরাঁ আর শপিং মলে খ্রিস্টমাসের উৎসাহ–‌উদ্দীপনার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি পল্লীভারতের খ্রিস্টোৎসব পালনের আবেগ। সেখানে ভয় কাজ করছিল, স্পষ্টধারায় কিংবা ফল্গুভাবে। সেখানে জীবনের গৌরবের রূপ হরণ হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক ছিল প্রতি মুহূর্তে। ইদের আগে গোরক্ষকদের তাণ্ডবে যেমন হিমশীতল ধারা ছড়িয়েছিল মুসলমান মহল্লার শিরদাঁড়ায় শিরদাঁড়ায়, ঠিক একইভাবে বড়দিনের আগেও একইরকম ভীতি আর শঙ্কা। 
কত কিছুই ঘটল। শান্তিতে বড়দিন পালনের জন্য। ২০ ডিসেম্বর ক্যাথলিক বিশপস কনফারেন্স অফ ইন্ডিয়ার সভাপতি ব্যাসেলিও ক্লিমিস খ্রিস্টানদের জীবন–‌জীবিকা রক্ষার তাগিদে বৈঠক করলেন রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে। ২২ ডিসেম্বর এলাহাবাদ হাইকোর্ট সুস্পষ্টভাবে রায় দিয়ে জানাল, উত্তরপ্রদেশের কৌসাম্বী জেলায় বড়দিন পালনে কোনও বাধা নেই। আলিগড়ের স্কুলগুলোতে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য পুলিস সরাসরি আশ্বাস দিল।
সবই সদর্থক ঘটনা। এটা যেমন সত্যি, তেমনই এটাও সত্যি যে এবারই প্রথম স্বাধীনতা–‌উত্তর ভারতে বড়দিন পালনের জন্য এতসব ঘটনা ঘটানোর দরকার পড়ল।
এটাও তেমনই সত্যি, আরএসএস–‌এর মার্গদর্শন গোলওয়াকরের ‘‌বাঞ্চ অফ থটস’‌–‌এ লেখা রইল, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, অনাথ আশ্রমগুলো চালায় একটাই উদ্দেশ্য নিয়ে। তা হল হিন্দুদের গণহারে খ্রিস্টান করা। লেখা থাকল, এ সবকিছুই একটি বিশ্বব্যাপী পরিকল্পনার অংশমাত্র। মিশনারিরা ‘‌ওয়ার্ল্ড স্ট্র‌্যাটেজি’‌র ‘‌এজেন্ট’‌ বই অন্য কিছু নয়।
এসব লেখা রইল এবং সে–সব লেখা বিশ্বাস করার মতো লোকগুলোও থাকল।
ফলে, কলকাতার বড়দিন নিজস্ব মেজাজে থাকলেও সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বড়দিনের চেনা গন্ধ আর আলো এবার ছিল না।
ভবিষ্যতে আদৌ থাকবে কি না, সে আশঙ্কাটাও রয়ে গেল। 
আমরা এখনও আক্রান্ত নই। কিন্তু কাল যে হব না, সে গ্যারান্টি আমাদের আজই খুঁজে নিতে হবে।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top