দাউদ হায়দার: মনে পড়ছে না সঠিক, ৫০ বছর আগের ঘটনা। হতে পারে ১৯৬৯ কিংবা ১৯৭০ সাল। তারিখ, মাস ভুলিনি। একুশে ফেব্রুয়ারি। শহিদ মিনার। সকাল। খালি পা প্রত্যেকের। ভিড়ের একজনকে চিনি। সঞ্জীব দত্ত। সঙ্গে সুবেশী মহিলা। তিনিই কী সঞ্জীব দত্তর স্ত্রী, ঋত্বিক ঘটকের যমজ বোন?‌ মণীশ ঘটকের বোন?‌ জিজ্ঞেস করি না, শরম লাগে।
অগ্রজদের মুখে শুনেছি সঞ্জীব দত্ত তুখোড় আড্ডাবাজ, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ‘‌পাকিস্তান অবজারভার’‌–এর সম্পাদকীয় বিভাগে, যুক্তিতক্কোগপ্পে কেউ ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে না তাঁর। নানা বিষয়ে জ্ঞানগম্যি, পাঠ। উপরন্তু ভাষাসৈনিক, পাকিস্তান সংসদের ডাকসাইটে সাংসদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তর সম্তান। সৈয়দ শামসুল হকের বহু খ্যাত দীর্ঘ কবিতা ‘‌বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা’‌য় সঞ্জীব দত্তর উল্লেখ আছে।
অবজারভার–এ সঞ্জীবকে দেখেছি, সুপুরুষ, নায়কতুল্য চেহারা, পোশাকে সাহেব, চাল চলনে ঠাট, যেচে আলাপ করার হিম্মত হয়নি, উপরন্তু বয়সে বড়। পণ্ডিতদের ছায়া মাড়াতে ভয়।
শোনা কথা (‌যাচাই করিনি কখনও)‌ সঞ্জীব দত্ত দেশভাগের পরে কুমিল্লা থেকে কলকাতায়, কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী, তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা, ধরা পড়লে নির্ঘাত দণ্ড, চলে আসেন। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতীতি দেবীর সঙ্গে কখন মায়ায় জড়ালেন?‌ — অজানা। প্রতীতি দেবীর জন্ম ঢাকায়, হৃষিকেশ দাস লেনে, সুরেশ ঘটকের কন্যা। ঋত্বিক (‌ডাকনাম ভবা)‌ আর প্রতীতি দেবী (‌ডাক নাম ভবি)‌। প্রতীতি অর্থ বোধ, জ্ঞান, প্রত্যয়, বিশ্বাস ইত্যাদি। ভবা বা ভবির কোনও মানে নেই। হতে পরে ‘‌ভব’‌ থেকে)‌। পাঁচ মিনিট আগে পরে জন্ম। ভবির থেকে ভবা পাঁচ মিনিটের বড়। 
ভারতে যদি এক ডজন এলিট ফ্যামিলির নাম করতে হয়, ঘটক ফ্যামিলি অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত। এই ফ্যামিলির সঙ্গে চক্রবর্তী ফ্যামিলি, চৌধুরি ফ্যামিলি যুক্ত। মাতৃকুলে কবি অমিয় চক্রবর্তী, শচীন চৌধুরি, শঙ্খ চৌধুরি, গায়িকা–বাদিকা, অভিনেতা–অভিনেত্রী লেখিকা, কে নেই। শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির যথার্থ কুলীন বংশ। ‘‌আপিলা চাপিলা’‌ জীবনগ্রন্থে অশোক মিত্র লিখেছেন কিছু।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন (‌তুলনামূলক সাহিত্য, ১৯৭৫–৮০)‌ ইংরেজি বিভাগের ঊর্মিমালা লাহিড়ীর সঙ্গে পরিচয়। যোধপুর পার্কে একই এলাকার বাসিন্দা। ঊর্মিমালার ডাকনাম ইনামিনা। এখন আর্ট কালেক্টর, আর্ট সমালোচক। রবি পুরিকে বিয়ে করে ইনা পুরি নামে খ্যাত।
ইনামিনা জানালেন, মহাশ্বেতা দেবী ওঁর মামি। চমক লাগে।
ইনামিনার দৌলতেই ওঁর মা অপালা দাশগুপ্ত (‌ডাকনাম কঞ্চি)‌ এবং কবি সাংবাদিক সমীর দাশগুপ্তর সঙ্গে সম্পর্ক। পরে পারিবারিক। এতটাই, ঢাকা থেকে আত্মীয়কুল এসে ‘‌কঞ্চিদির ফ্ল্যাটে ঠাঁই।’‌ কারণও আছে, ঘটক ফ্যামিলির আদি আস্তানা আমাদের পাবনার এবং পাশের গ্রামের।
খুকুদি (‌মহাশ্বেতা দেবী)‌ বলছিলেন একবার ‘‌ভবা ভবিকে নিয়ে উপন্যাস লিখতে পারিস।’‌ কাহিনি বাতলান। বলি, ‘‌আপনিও লিখতে পারেন।’‌ ‘‌লিখব হয়তো একদিন’‌, বলেন। লেখেননি।
যোগেন্দ্র মণ্ডলকে নিয়ে রাজনীতি–ইতিহাস মাখা উপন্যাস লিখেছেন দেবেশ রায় (‌তিনিও পাবনার)‌। পড়ে, মাথায় চক্কর দেয়। মকশো করি, হয় না। দুই–একটি অপাঠ্য হয়তো পদ্য লিখতে পারি (‌চেষ্টা করলে)‌, উপন্যাস নয়। ভবা ও ভবিকে নিয়ে উপন্যাস লেখার কথা বলেছি রশিদ হায়দার, সৈয়দ শামসুল হক, সেলিনা হোসেনকে। বলেছেন, ‘‌দারুণ সাবজেক্ট।’‌ লেখেননি। উপন্যাসের নায়িকা হতে পারেন ভবি। তাঁকে ঘিরেই উপন্যাস আবর্তিত। দেশ ভাগ। রাজনীতি। ইতিহাস। প্রেম। দেশ দ্বিখণ্ডিত। বঙ্গভঙ্গ। ভাষার মর্মবেদনা, আর্তনাদ। ব্যাকুলতা। যমজ বোন ভবি বিভক্ত বাংলায়। ভিন দেশ। ভিন রাষ্ট্র। ভিন সংস্কৃতির নব্যধারা। উপন্যাসের নায়িকার চোখে, মননে দুই দেশ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, বিগত ও বর্তমান দিন, তাঁর সন্তানকে পরিচয়, নিজের পরিচয়, আত্মীয়কুল। বিস্তারিত হবে উপন্যাসে। নায়িকার কথায়, স্মৃতিচারণে কিংবা হালের দেশকালের পরিস্থিতি।
ঋত্বিক ঘটকের যমজ বোন ভবি (‌প্রতীতিদেবী)‌ মারা গেলেন ১২ জানুয়ারি, ঢাকায়, বয়স হয়েছিল ৯৫, লিখেছেন সুপাঠ্য বই, ঋত্বিককে নিয়ে। লেখার বিষয় ও স্মৃতি নিয়েও উপন্যাস হতে পারে। লেখার নানাবিধ তথ্য, তথা মালমশলা জোগাতে পারেন প্রতীতি দেবী সঞ্জয় দত্তর কন্যা অ্যারোমা দত্ত। তাঁর কাছে বহু তথ্য সুলভ হয়তো।
মায়ের (‌প্রতীতি দেবী)‌ স্মৃতিকথাই একটি উপন্যাসের জন্য যথেষ্ট। নায়িকা ভবি। গবেষণার জন্যে ঘটক চক্রবর্তী চৌধুরি ফ্যামিলির জন্য বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয় না। বহুগ্রন্থে বিস্তৃত।
অপেক্ষা, কেউ লিখবেন। ভবি যার নায়িকা।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top