সৌম্যেন্দ্র ব্যানার্জি: ইদানীং বিশ্বকবির স্মৃতি বিজড়িত বোলপুর–শান্তিনিকেতন অঞ্চলের বিভিন্ন অবাঞ্ছিত ঘটনাবলী যখন নিয়মিত ভাবে সংবাদপত্রে জায়গা করে নেয়, ঠিক তখনই এক সুখবর। বীরভূমের বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ সুশোভন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মশ্রী খেতাবে এই মুহূর্তে বোলপুরবাসী উচ্ছ্বসিত। মানবসেবাই যঁার জীবনের মূল মন্ত্র, সেই আত্মপ্রচার বিমুখ গরিব মানুষের ভগবান ডাঃ সুশোভন বন্দ্যোপাধ্যায়।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি মাত্র এক টাকার বিনিময়ে জেনারেল প্র্যাকটিশনার হিসেবে চিকিৎসা করে চলেছেন মুমূর্ষু রোগীদের। বছরের পর বছর উপকৃত হয়ে আসছে বীরভূম ও তাঁর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের এক বিরাট সংখ্যক হতদরিদ্র মানুষ। আমাদের সমাজে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া অগ্নীশ্বরের এক উজ্জ্বল নিদর্শন বোলপুরের এই সুসন্তান, যিনি এই অঞ্চলের অগণিত দরিদ্র মানুষের কাছে ভগবানতুল্য।
কয়েক দশক আগের কথা। বিশ্বভারতীতে কর্মরত আমার স্বর্গীয় পিতা দুলালচন্দ্র ব্যানার্জির অত্যন্ত স্নেহভাজন ছ’‌য়ের দশকের আরজিকর মেডিক্যাল কলেজের প্যাথলজিতে স্বর্ণপদক প্রাপক ডাঃ সুশোভন বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ১৯৭৮ সালে ইংল্যান্ডের শেফিল্ড থেকে মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার জন্য দেশের বাড়ি বোলপুরে পাকাপাকি ভাবে ফিরে এলেন, তখন আমি পাঠ ভবনের শিশু বিভাগের এক ছাত্র। বোলপুর শহর ও
শান্তিনিকেতন মিলিয়ে জনসংখ্যা তখনও দশ হাজার ছাড়ায়নি। বোলপুরের সমস্ত বাসিন্দার মধ্যে ছিল এক অকৃত্রিম আত্মীয়তার বন্ধন। বোলপুর শহরই যেন ছিল এক বৃহৎ পরিবার। বোলপুরের বাসিন্দারা সেই সময় সবাই খুশি হয়েছিলেন বিলেত ফেরত চিকিৎসক ছেলেকে কাছে পেয়ে। পারিবারিক সখ্যতার জন্য ছোটবেলা থেকেই তাঁকে দেখে আমি বড় হয়েছি। সৌজন্যবশত চিকিৎসার প্রয়োজনে আমাদের পরিবারের থেকে কোনদিনও উনি কখনও ফিজ গ্রহণ করেননি।
বীরভূম জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ইনস্পেক্টর বিনয়কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র সুশোভন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পড়াশোনার হাতেখড়ি হয় বোলপুর বালিকা বিদ্যালয়ের নিম্ন বুনিয়াদি বিভাগে। আটের দশকের প্রথম দিকে নিম্ন বুনিয়াদি বিভাগের প্রধান শিক্ষিকা শ্রদ্ধেয়া বীণা রায়, যিনি আবার সুশোভন বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রত্যক্ষ শিক্ষিকা ছিলেন, সর্বদা বড়াই করে আমাদের কাছে বলতেন তাঁর সুযোগ্য ছাত্রের কথা।
ইংল্যান্ড থেকে ফিরেই তিনি শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর পিয়ারসন মেমোরিয়াল হাসপাতালে ডেপুটি চিফ মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে কয়েকমাস যুক্ত থাকার পর, চাকরি ছেড়ে বোলপুরের হরগৌরীতলায় গাছ–গাছালিতে ভরা পৈতৃক বাড়িতেই চিকিৎসক হিসেবে তাঁর কর্মযজ্ঞ শুরু করেন। সঙ্গে গড়ে তোলেন এক প্যাথলজিক্যাল ল্যাব। ন্যূনতম মূল্যে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার সুবিধেও পেতে থাকে রোগীরা। পরবর্তীকালে গরিব মানুষদের কথা ভেবে তিনি নিজের বাড়িতেই স্বল্প বেডের এক নার্সিংহোম তৈরি করেন। ১৯৮০ সালে প্রণব মুখার্জি যখন লোকসভা নির্বাচনে বোলপুর কেন্দ্রের প্রার্থী, তঁার উৎসাহে সুশোভন বন্দ্যোপাধ্যায় জাতীয় ইন্দিরা কংগ্রেসে যোগদান করেন। তিনি ইন্দিরা গান্ধী, ও বিশেষ করে রাজীব গান্ধীর অত্যন্ত স্নেহধন্য ছিলেন।
১৯৮৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি বোলপুর বিধানসভা কেন্দ্রে কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে একবার বিধায়কও হন। আটের ও ন’‌য়ের দশকে কংগ্রেস পার্টির সাংগঠনিক দুর্বল অবস্থা ও বামফ্রন্টের তীব্র দাপট সত্ত্বেও তিনি সাহস করে কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে বিধানসভা নির্বাচনে লড়তেন। পরাজিত হলেও, ব্যক্তি পরিচয়ে তিনি পেতেন প্রচুর ভোট, যা শক্তিমান বামফ্রন্টকেও চিন্তায় রাখত। গান্ধী আর্দশের গভীর বিশ্বাসে মানবসেবাকে জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করার ফলে তিনি কখনই ধূর্ত ও অসৎ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। তৃণমূল প্রতিষ্ঠার পর একটা সময় মমতা ব্যানার্জির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই নেতা কয়েক বছরের জন্য বীরভূমে তৃণমূল জেলার সভাপতির দায়িত্বও সামলেছিলেন। বিশ্বভারতীর প্রধান পরিচালন সমিতি, যা কর্মসমিতি হিসেবে পরিচিত, ’‌৮৩ সাল থেকেই তিনি সেই সমিতির রাষ্ট্রপতি মনোনীত সদস্য। বিভিন্ন রাষ্ট্রপতি তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে মনোনীত করেছেন। স্বাভাবিক ভাবেই এই মুহূর্তে তিনি বিশ্বভারতীর কর্মসমিতির প্রবীণতম সদস্য।
আমাদের আর পাঁচজন আটপৌরে বীরভূমবাসীর মতো তিনি একেবারেই দেখতে নন। সর্বদা ধুতি–পাঞ্জাবি পরিহিত, ঘাড় পর্যন্ত নেমে আসা লম্বা চুলের উজ্জ্বল গাত্রবর্ণের ৬ ফুট দীর্ঘ এই সুদর্শন, সৌম্যকান্তি, বিনয়ী পুরুষের সুমধুর ব্যবহারে তঁার কাছে আসা অসুস্থ লোকেদের অর্ধেক রোগ নিরাময় হয়ে যায়। তাঁর আন্তরিকতা মুমূর্ষু রোগীদের বেঁচে থাকার ভরসা জোগায়। একটা সময় সকাল ৮টা থেকে প্রায় রাত ১২টা পর্যন্ত তিনি পুরোমাত্রায় রোগী দেখতে ব্যস্ত
থাকতেন। তা ছাড়াও বোলপুর শহরের যে সমস্ত রোগী শারীরিক কারণে তাঁর চেম্বারে পৌঁছতে পারেন না, তাঁদের জন্য কখনও তিনি সাইকেল রিকশায়, কখনও–‌বা মোটর সাইকেলের পিছনে বসে দিনে–দুপুরে অথবা মধ্যরাত্রে রোগী দেখতে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে যান। বিদেশে নিয়মিত গাড়ি চালালেও, বোলপুরে আজ পর্যন্ত কেউ তাঁকে কখনও গাড়ি চালাতে দেখেনি। কোনও দামি চার চাকার গাড়িও তাঁর কাছে নেই। পেশার প্রথম দিন থেকেই অর্থোপার্জনের
দিকে না ঝুঁকে, বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির 
প্রলোভনে পা না দিয়ে, বিলাসবহুল জীবন যাপনের হাতছানিকে শত হস্তে দূরে সরিয়ে রেখে অত্যন্ত সাদামাটা জীবন যাপনে তিনি এখনও আগের মতোই মানবসেবায় পুরোমাত্রায় ব্যস্ত।
ডাক্তারি পেশা ছাড়াও সুশোভন বন্দ্যোপাধ্যায় বীরভূমের বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। দীর্ঘদিন তিনি বীরভূম রেল যাত্রী সমিতির সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৬ সালে রাজীব গান্ধী যখন প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বভারতীর আচার্য, তখন ডাঃ সুশোভন বন্দ্যোপাধ্যায় বিশ্বভারতীর ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে তাঁকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলেন হাওড়া থেকে বোলপুর একটি সুপার ফাস্ট ট্রেন চালু করার। ১৯৮৭ সালে শান্তিনিকেতন সুপার ফাস্ট এক্সপ্রেস চালু হয়। তাছাড়াও খানা–সাঁইথিয়া ডবল লাইন চালু করার ক্ষেত্রেও তাঁর নেতৃত্বে বীরভূম রেলযাত্রী সমিতির ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি বোলপুর মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের দীর্ঘদিনের সভাপতিও।
৮০ বছর বয়সেও ভগ্ন শরীর নিয়ে আগের মতোই সমান উৎসাহে স্কুটারের পেছনে চেপে রোগী দেখতে যেতেন ডাঃ সুশোভন বন্দ্যোপাধ্যায়, যা আজকের যুগে ভাবাই যায় না। গত বছর পুজোর পর থেকেই তিনি বেশ অসুস্থ। নিয়মিত ডায়ালেসিস চলছে। তারই মধ্যে বাড়িতে বসে চিকিৎসা করে চলেছেন দূরদূরান্ত থেকে আসা অসংখ্য রোগীর। তঁার কর্মভূমি বোলপুর ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের কাছে এখনও তিনি বাস্তবের অগ্নীশ্বর।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top