শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়: সব সম্পর্ক ভালবাসায় শেষ হয় না। খারাপ লাগা থেকেও কিছু সম্পর্ক আচমকা মুলতুবি হয়ে যায়। মিস শেফালির সঙ্গেও সে–‌রকমটাই হয়েছিল। শেষ বার যখন ফোনে কথা হল, তুমুল চেঁচিয়েছিলাম। বলেছিলাম, আপনার জীবনে শিক্ষা হবে না!‌ বার বার ধাক্কা খেয়েও শিখবেন না আপনি!‌
শুনে কিছু বলেননি। চুপ করে ছিলেন। অন্য সময় হলে, মুখোমুখি থাকলে, দুষ্টুমি করে ধমক–‌খাওয়া বাচ্চা মেয়ের মতো মুখ করে বলতেন, ‘‌বুঝতে পারিনি তো!‌ কী করব, বলো!‌’‌ অথবা একপ্রস্থ বকুনি খাওয়ার পর মুখ ভার করে বলতেন, ‘‌আচ্ছা, অত বকতে হবে না!‌ এবার কী করব, বলে দাও!‌’‌
আফশোস একটাই। যখন সত্যিই জিজ্ঞেস করে কাজ করার দরকার থাকত, তখনই আমাকে ফোন করার কথা মনে পড়ত না!‌ তার পর আবার চেঁচামেচি এবং আবারও— ‘‌বুঝতে পারিনি তো!‌ কী করব, বলো!‌’‌
ওঁর আত্মজীবনী ‘‌সন্ধ্যা রাতের শেফালি’‌র চিত্রস্বত্ব কিনেছে এক সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেল। পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন কঙ্কণা সেনশর্মা। কলকাতায় এসেছেন কঙ্কণা। শেফালির সঙ্গে দেখা করবেন, কথা বলতে চান আমার সঙ্গেও। শেফালির বাড়ি যাওয়াটা ব্যস্ততার অজুহাত দিয়ে এড়িয়ে গিয়েছিলাম। সেই সন্ধেয় কঙ্কণা মুচকি হেসে বললেন, মিস শেফালি বলেছেন— শীর্ষ এখন আসবে না। ওর সঙ্গে আমার একটু মান–‌অভিমান চলছে কি না!‌
আসলে অভিমান নয়, নিখাদ রাগ হয়েছিল। কেন একটা লোক কিছুতেই নিজের ভাল বুঝবে না!‌ কেন হিসেব করে চলবে না!‌ হাতে টাকা এলেই বিলিয়ে দেওয়ার কী দরকার!‌ নিজেই বলতেন, ‘‌দেওয়ার সময় কখনও টাকা গুনে দিইনি, জানো!‌ রাতের শো শেষ করে ওবেরয় গ্র্যান্ড থেকে বেরোতাম। বাইরে ভিখিরি মেয়ে–বউগুলো অপেক্ষা করে থাকত। ব্যাগের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে খামচা মেরে যত টাকা উঠত, দিয়ে দিতাম।’‌
না, হিসেব করে চলেননি কোনও দিন। ভয়ঙ্কর দারিদ্রের মধ্যে থাকা এক উদ্বাস্তু পরিবার থেকে উঠে–‌আসা আরতি দাস হয়ে উঠেছিলেন পঞ্চাশ–ষাটের দশকের কলকাতার রাতের রানি। আহিরীটোলার গুদামঘরের আশ্রয় থেকে ওবেরয় গ্র্যান্ডের বিলাসবহুল স্যুইট। চঁাদনি মার্কেটের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বাড়ির রান্নাঘরের মেঝেতে শুয়ে থাকার সময় রোজ রাতে যে গায়ে ঘুরে বেড়াত নোংরা হাত, সেই শরীরকেই শুধু একবার ছুঁয়ে দেখার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছিল শহরের বিত্তবান, অভিজাতরা। আক্ষরিক অর্থেই রানি করে রেখে দেওয়ার অজস্র প্রস্তাব। কে ছিল না সেই পাণিপ্রার্থীদের লিস্টে!‌ সবাইকে একটা কথাই বলতেন— ‘‌বিয়ে করবেন আমাকে?‌ স্ত্রীর মর্যাদা দেবেন সংসারে, সমাজে?’‌ অথচ সত্যিই যেদিন বউ হওয়ার প্রস্তাব এসেছিল, যঁাকে প্রথম ভালবেসেছিলেন, সত্যিই ভালবেসেছিলেন, তঁার কাছ থেকে‌, সেদিন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। একটাই কারণে। নাচ ছাড়তে পারবেন না। যে–‌নাচ তঁাকে শিল্পীর স্বীকৃতি দিয়েছে, সমাজে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে, তঁার পরিবারের মুখে ভাত তুলে দিয়েছে, সেই ক্যাবারে তিনি ছাড়তে পারবেন না।
ভাত খুব প্রিয় ছিল। ফিরপোজ–এর গেস্ট হাউসে জার্মান সিলভারের ট্রে–‌তে সাজিয়ে, বোন চায়নার থালা–বাসনে সরু চালের ভাত আসত। সেই ভাতে জল ঢেলে সারা রাত রেখে দিতেন। সঙ্গে লুকিয়ে–‌রাখা পেঁয়াজ, কঁাচালঙ্কা। সকালে পান্তা খাবেন। থিয়েটার করতেন যখন, শোয়ের আগে এক থালা ভাত নিয়ে বসতেন। সবাই বলত, শেফু, মোটা হয়ে যাবি!‌ মুখ বেঁকিয়ে বলতেন, ‘‌ও মা, ভাত খাব না!‌ দুটো ভাতের জন্যেই তো এত কিছু করা!‌’‌ শুধু নিজের নয়, সবার মুখে যাতে ভাত ওঠে, সেই চেষ্টায় ছিলেন আন্তরিক। খুব গর্ব করে বলতেন, কত অভাবী ঘরের মেয়েকে তিনি কাজ পাইয়ে দিয়েছেন এক কালে। নিজের বাড়িতে রেখে, খাইয়ে–‌পরিয়ে, নাচ শিখিয়ে শহরের বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরঁা, নাইট ক্লাবে ক্যাবারে নাচার কাজ। পরে নিজে যখন থিয়েটারে বেশ প্রভাব ছড়িয়েছেন, তখন থিয়েটারেও। বলতে বলতে গলা ধরে আসত— ‘‌আর আমাকেই বলা হল বিষকন্যা!‌ আমি নাকি বাঙালির সিনেমা–থিয়েটার বিষিয়ে দিচ্ছি, নষ্ট করে দিচ্ছি বাংলার সংস্কৃতি!’‌‌
খুব কষ্ট পেতেন। সব ছেড়ে কেন তঁাকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল! ‘‌মেয়েগুলো খারাপ পথে যায়নি, পরিশ্রম করে দুটো ভাত রোজগার করছে। সেটা ভুল করেছিলাম?‌ বলো?‌’‌
না, ঠিক কাজই করতেন। লোকে ভুল বুঝত। আর যে–‌ভুলগুলো করেছিলেন, সেগুলো নির্দ্বিধায় স্বীকার করতেন। আত্মজীবনী মানেই নিজের খারাপটা আড়াল করে ভালটা তুলে ধরা। সে–‌চেষ্টাই করেননি। শুধু একটা কারণেই থমকাতেন। যখন দ্বিতীয় কারও সম্মান জড়িয়ে থাকত কোনও ঘটনার সঙ্গে। বার বার জিজ্ঞেস করতেন, ‘‌এটা লিখলে কিছু মনে করবে না তো?‌ ওর দুর্নাম হবে না তো?‌’‌
খুব উদ্বিগ্ন থাকতেন অন্যের দুর্নামে, অন্যের অন্নচিন্তায়। শুধু নিজেরটা বুঝতেন না। হাতে টাকা এলেই খরচ করে ফেলতেন। মূলত দানধ্যানে। সারা জীবন ধরে বহু তঞ্চকতার শিকার হয়েছেন। তবু শিক্ষা হয়নি। একই ভুল বার বার করতেন। কারণ ও–‌ই। হিসেবনিকেশ করে বঁাচতে শেখেননি কোনও দিন। হাত মুঠো করে যা উঠেছে, বিলিয়ে দিয়েছেন।  

আরতি দাস ওরফে মিস শেফালি। ছবি: সুপ্রিয় নাগ ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top