যুদ্ধ–‌জিগির জাগানো গেছে, সুতরাং জিতেই যাচ্ছে বিজেপি?‌ না। মোদি উত্তেজনা ছড়াবেন প্রচারে, সন্দেহ নেই। সেবার গুজরাটে পুরভোটে ভাল ফল করেছিল কংগ্রেস, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে সাফল্যের আশাও জোরদার হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বুঝেছিলেন, হার এড়ানো যাবে না। তারপর ভয়ঙ্কর দাঙ্গা। গণহত্যা, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ। জিতে হাসলেন মোদি। এবারও পুলওয়ামা–‌বালাকোট ঠিক তেমনই পরিস্থিতি নিয়ে হাজির। হার প্রায় অনিবার্য, সাম্প্রদায়িক বিষ ও যুদ্ধের জিগির মিশিয়ে শেষ চেষ্টা করতেই হল। কিন্তু, জিতেই গেল, বলা যাবে না। নোটবন্দি, জিএসটি, সংখ্যালঘু ও দলিত নিগ্রহ, কৃষক দুর্গতি, কর্মসংস্থানের ব্যর্থতা। স–‌ব ভুলে যাবেন দেশবাসী?‌ টাটকা রাফাল। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, যা নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। নানারকম অসঙ্গতির খবর তো আসছিলই, এখন সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল বললেন, ফাইল হারিয়ে গেছে!‌ নথি লোপাট। সামনের কয়েক সপ্তাহে বিরোধীরা যখন সোচ্চার হবেন, হয়তো আরও মারাত্মক তথ্য বেরিয়ে আসবে, শুধু চিৎকার করে বা চোখ রাঙিয়ে সামলানো কঠিন। সুতরাং, না। জিতে যায়নি।
এবং, পাশাপাশি একথাও বুঝতে হবে, চূড়ান্ত ব্যর্থতা ও স্পষ্ট দুর্নীতির জেরে পরাজয় যখন অনিবার্য হয়ে উঠছিল, বালাকোট দিয়ে, যুদ্ধ–‌জিগির দিয়ে, কুৎসিত সাম্প্রদায়িক প্রচার চালিয়ে খানিকটা জমি খুঁজে পাচ্ছেন মোদিরা। এই একটাই রাস্তা খোলা ছিল। জিতেই গেছে বিজেপি, ভুল। কিন্তু পরিস্থিতি একটু পাল্টাতে পারে বিশেষত হিন্দি বলয়ে ও সংলগ্ন রাজ্যে, সেদিকে চোখ বুজে থাকাও ভুল। বিকল্প সরকার হতেই পারে, কিন্তু পরিস্থিতি বুঝে নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিরোধী শিবিরকে। বলা বাহুল্য, কংগ্রেসকে সঠিক পথ বেছে নিতে হবে।
২০১৪ সালে ৪৪–এ নেমেছিল, এবার ১৪৪–‌এ ওঠার চেষ্টা করবেন রাহুল গান্ধী, স্বাভাবিক। স্বাধীন ভারতে ৭২ বছরের মধ্যে ৫৪ বছর ক্ষমতায় থেকেছে কংগ্রেস, সেই জায়গা যথাসম্ভব ফিরে পেতে চাইবে, স্বাভাবিক। কিন্তু রাহুল–‌সোনিয়া বুঝলে ভাল হয়, স্বাভাবিক চেষ্টাটা চালিয়ে গেলেও, পরিবর্তিত পরিস্থিতিটাও বুঝতে হবে। বাংলা, তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যে বিরোধী শিবির, তৃণমূল ও ডিএমকে–‌জোট ভাল করবেই। কেরল, অন্ধ্র থেকেও বিজেপি–‌র আসন কার্যত নেই। কর্ণাটকে কংগ্রেস–‌জেডিএস জোট পাকা হয়ে গেছে। কিন্তু, হিন্দি বলয়ে, সংলগ্ন রাজ্যগুলোয় একটু ঘুরে–‌যাওয়া হাওয়াটা ফের নিজেদের দিকে ঘোরাতে হবে বিরোধীদের। প্রধান দায়িত্ব কংগ্রেসের।
দিল্লিতে ৭ আসন। কংগ্রেস–‌আপ জোট হলে অন্তত ৬ নিশ্চিত ছিল। কেজরিওয়াল রফা চেয়েছেন। পাঞ্জাব, হরিয়ানায় কিছু আসনও চেয়েছিলেন। হরিয়ানা বাদ দিন, পাঞ্জাবে ২০১৪ সালে ৪ সাংসদ পেয়েছিল আপ। ৩ জন দল ছেড়েছেন। ভগবত সিং মান আছেন এবং শক্তিশালী। কেজরিওয়াল ৪ নয়, মাত্র ২টি আসন চেয়েছিলেন। ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং বলে দিলেন, একটাও না!‌ দিল্লিতে ৭–‌এর মধ্যে ৩ নিয়েই রফায় প্রস্তুত ছিলেন কেজরিওয়াল। ক্ষত এখনও শুকোয়নি শীলা দীক্ষিতের, তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালের কাছেই ক্ষমতা হারিয়েছিলেন কিনা!‌ গত বিধানসভা ভোটে ক’‌টা আসন পেয়েছে কংগ্রেস?‌ ছাপার ভুল নয়, ০। তবু রফা নয়। হতাশ কেজরিওয়াল ৬ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে দিলেন। এখনও জোটে রাজি, কিন্তু স্বয়ং রাহুল শীলাদের কথাই মেনে নিচ্ছেন। এখনও পর্যন্ত। পরিবর্তিত পরিস্থিতি, সভাপতি হিসেবে সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করুন রাহুল।
আপ ৩, কংগ্রেস ৩, দু–‌তরফের কাছে গ্রহণযোগ্য কেউ ১— এই সূত্র মেনে নিন। বোঝান, কংগ্রেস আন্তরিক। 
উত্তরপ্রদেশ। অমেঠি ও রায়বরেলি ছেড়ে ৭৮ আসনে লড়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে ফেলেছেন অখিলেশ–‌মায়াবতী। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেসের পক্ষে গুলাম নবি আজাদ বলে দিয়েছেন, ৮০ আসনেই লড়ব!‌ সিদ্ধান্ত অপ্রত্যাশিত নয়। ২ নিয়ে হাসবে কংগ্রেস, তা হয় না, যদিও ২০১৪–তে ২ আসনই পেয়েছিল। সে তো, মায়াবতী কোনও আসনই পাননি। ৮০ আসনের মধ্যে ৭৩ পেয়েছিল বিজেপি–‌জোট। সেই ৭৩–‌কে ১৩–‌য় নামিয়ে আনা সম্ভব, এখনও। কংগ্রেস চাপ দিয়েছে, বেশ করেছে। প্রিয়াঙ্কাকে পাঠিয়ে চাপ বাড়িয়েছে, বোঝা গেল। মায়াবতীর আচরণ অস্বাভাবিক, মানা গেল। পাশাপাশি, অখিলেশের চেষ্টাকেও মর্যাদা দিতে হবে। বাবা মুলায়ম জোট চান না। উল্টে লোকসভায় দাঁড়িয়ে বলে দিয়েছেন, মোদিই প্রধানমন্ত্রী থাকবেন!‌ কর্ণাটকে কুমারস্বামীর শপথ–‌অনুষ্ঠানে সোনিয়া–‌মায়াবতীর ছবি চমৎকার সম্পর্কের কথাই বলেছিল। সেই মায়াবতী অনড়, একটা আসনও ছাড়বেন না, অখিলেশকেও ছাড়তে দেবেন না। কেন এমন হল?‌
সন্দেহ নেই, মায়াবতী গোলমেলে রাজনীতিক। কিন্তু কংগ্রেসের দিক থেকেও কি ভুল হয়নি?‌ মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানে কয়েকটা আসন চেয়েছিলেন মায়াবতী। একটাও ছাড়তে রাজি হয়নি প্রদেশ নেতৃত্ব এবং রাহুল সায় দিয়েছেন। বলেননি, লোকসভা ভোট আসছে, ৩–‌৪টে আসন ছেড়ে সদর্থক বার্তা দেওয়া হোক। উত্তরপ্রদেশের বাইরে মায়াবতীর প্রভাব বেশি নয়। কিন্তু, মনে রাখা ভাল, অন্তত পাঁচটি রাজ্যে কমবেশি ৪ শতাংশ ভোট আছে। ছোট, কিন্তু ব্যাঙ্ক। তুল্যমূল্য লড়াইয়ে এই ৪ শতাংশ নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। হয়তো রাহুল ভেবেছেন, দরকার হবে না, চূড়ান্ত ব্যর্থ ও নৃশংস সরকার বিদায় নেবেই, কংগ্রেসই অনেকটা করে দেবে। পরিস্থিতি পাল্টেছে, একটু হলেও পাল্টেছে, হিন্দি বলয়ে ও সংলগ্ন অঞ্চলে পাল্টেছে, বুঝবেন না রাহুল?‌
এখনও সময় আছে। কিছু রাজ্যে একটু জায়গা ছাড়ুক কংগ্রেস, একটুই। উত্তরপ্রদেশে ১১ আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছেন রাহুল। আর বাড়বেন না। ৭১ আসনে ‘‌একের বিরুদ্ধে এক’‌ লড়াই হোক। আলোচনার পথ খোলা থাকুক। অখিলেশ ইতিবাচক, মায়াবতীর সঙ্গে কথা বলুন সোনিয়া, দেশের প্রয়োজনে ইগো ছাড়ুন। হাতের বাইরে যায়নি, কিন্তু পরিস্থিতি খানিক পাল্টেছে। বুঝে, নিজেদের ১৪৪–‌এর জায়গায় ১২২ মেনে নিয়ে, ভয়ঙ্কর মোদি সরকারকে অপসারিত করুন। সময়ের ডাক। শুনবেন না রাহুল গান্ধী?‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top