ডাকনাম ঝন্টু। ভাল নামও ঝন্টু। ভাল ফিজিওথেরাপিস্ট। বয়স ৪৬। সিপিএম। চোদ্দো বছরের পার্টি মেম্বার। বারো বছর ধরে চিনি। হঠাৎ হাজির একরাশ ক্ষোভ নিয়ে। অভিযোগ মিডিয়ার বিরুদ্ধে, আজকালের বিরুদ্ধে। ওঁদের গুরুত্ব দিচ্ছে না কেউ, তীব্র অভিমান। রাগ। বললাম, তোমার সব কথা শুনব, তবে বলতে হবে আধ ঘণ্টার মধ্যে। তার আগে, কয়েকটা প্রশ্ন করি। যা শুধু এই উটকো সাংবাদিকের নয়, পথে ঘাটে, ঘরে ঘরেও শোনা যাচ্ছে। ধৈর্য ধরে শুনল দশ মিনিট। আধ ঘণ্টা নয়, সাঁইত্রিশ মিনিট বলে গেল, চা ঠান্ডা। যেসব কথা জানতে চেয়েছিলাম, যেসব প্রশ্ন উঠছে, ধরে ধরে উত্তর দিল। সিপিএম। দশ মিনিট যখন বলছিলাম, নোট করেছে।
.‌.‌.‌ দাদা, মানছি যে বিজেপি বেড়েছে। কিন্তু বলুন তো, দায়ী শুধু আমরা? হ্যাঁ, ২০১১–‌র পর, বিশেষ করে ২০১৪–‌র পর, পার্টির গাফিলতি ছিল। বিজেপি এত বেড়ে যেতে পারে, আমাদের থার্ড প্লেসে নামিয়ে দিতে পারে, নেতারা ভাবেননি, আমরাও বুঝিনি। কিন্তু, আপনাদের কথা শুনে আর লেখা পড়ে মনে হয়, আমরা যেন ইচ্ছা করে ওদের বাড়তে দিয়েছি!‌
.‌.‌.‌ সরকার যাওয়ার পর প্রথম ধাক্কাটা এসেছিল তৃণমূল থেকে, অনেক কর্মী ওদিকে চলে গেল। বেনো জল, ক্ষমতার দিকে চলে যেতে চায়। কেন এত ‘‌বেনো জল’‌ ঢুকতে দেওয়া হয়েছিল, আপনার প্রশ্নটায় ভুল নেই। .‌.‌.‌ আমরা বোধহয় ভেবেছিলাম, লোক যত বাড়বে, পার্টি তত বাড়বে। বোধহয় ভেবেছিলাম, বামফ্রন্ট সরকার একশো বছর থাকবে। হয় না। বুঝিনি। বুঝলেও মানিনি। দ্বিতীয় ধাক্কাটা যে বিজেপি–‌র দিক থেকে আসছে, বুঝতে দেরি হয়ে গেল। নেতারা কেন বুঝবেন না?‌ আমরা তো কাজ করি স্থানীয়ভাবে। যাঁরা সব জেলার খবর রাখেন, দায়িত্বে ছিলেন বা আছেন, তাঁরা ধরতে পারলেন না কেন?‌ দাদা, বলতে পারেন, কেন আমাদের এত ভুল হয়?‌ ভুল স্বীকার করার আগেই তো যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে যায়।
.‌.‌.‌ আমরা তৃণমূল সরকারকে সাপোর্ট করব, মমতাকে সাপোর্ট করব, তা তো হয় না। বিরোধিতা করতে গিয়ে এমন বাড়াবাড়ি, যে, ফাঁকতালে বিজেপি ঢুকে গেল?‌ বলছেন বটে, কিন্তু ব্যাপারটা কি এত সহজ? আরএসএস–‌এর শাখা বেড়ে চলেছে, সঙ্গে অঢেল টাকা, ২০১৪–‌র পর পরিস্থিতি বড় দ্রুত পাল্টে গেল। এটা বোঝা সহজ ছিল না। মানছি, আমাদের কিছু নেতা (‌সবাই নয়)‌ মমতাকে অ্যাটাক করতে গিয়ে নতুন বিপদটার দিকে তাকাননি। টিভি–‌তে কারও কারও কথা শুনে খারাপ লেগেছে, কিন্তু কী করতে পারি?‌ আমার লেভেলের কমিটিতে বলেছি, ফল হয়নি। কিন্তু, সেই অভিমানে পার্টি থেকে দূরে সরে যাইনি। যাব না।
.‌.‌.‌ দিদি–‌মোদি তত্ত্ব মানুষ নিচ্ছেন না, কতবার লিখেছেন। আচ্ছা, আমরা একইসঙ্গে মোদি আর মমতার সমালোচনা করব না?‌ তত্ত্বটা বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না বিশেষ, বলতে পারেন। কিন্তু, একইসঙ্গে দুই বড় শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে একটা স্ট্র‌্যাটেজি তো লাগে। ‘‌দিদি–‌মোদি’‌ বলে আমরা বিজেপি–‌কে বাড়িয়ে দিতে চাইনি। কেন চাইব?‌ বিজেপি–‌কে তৃণমূলের মেন অপোজিশন–‌এর জায়গা থেকে সরাতে হবে, আমরা চাই না?‌ নিজেদের পায়ে কুড়ুল মারব?‌
.‌.‌.‌ মানছি, পার্টির কর্মীদের একটা অংশ বিজেপি–‌কে ভোট দিচ্ছে। যারা সরাসরি চলে গেছে, তাদের কথা থাক। আবর্জনা। কিন্তু যারা আছে, তাদের মধ্যেও কয়েকজন বলছে, আমরা জিতব না, বিজেপি–‌কে ভোট দেব। আগে তো তৃণমূল যাক, কমুক। বোঝাচ্ছি সুইসাইড হচ্ছে। আমাদের ভোট যতটা সম্ভব ধরে রাখতে হবে, বাড়াতে হবে। বিজেপি–‌কে সরিয়ে মেন অপোজিশন হতে হবে। বলছেন, মমতাকে আমরা এত ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছি যে, সমর্থকরা তৃণমূলকেই প্রধান শত্রু ভাবছে, বিজেপি–র‌ দিকে ঢলে পড়ছে। হতে পারে। কিন্তু ইচ্ছাকৃত নয়। বলুন তো, নিজেদের ক্ষতি কেউ চায়?‌ হ্যাঁ, এটা মানছি, একবগ্গা মমতা–‌বিরোধিতা করতে গিয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে বড় লড়াইটাকে কম গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছি। আসলে, ভাবিইনি, বিজেপি সেকেন্ড হতে পারে।
.‌.‌.‌ কংগ্রেসের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা, আমিও বুঝি না। ২০১৬ সালে জোট হল। কংগ্রেসের ভোট আমাদের দিকে ট্রান্সফার হল না। আমরা ওদের ভোট দিলাম। কংগ্রেস ৪৪, বামফ্রন্ট ৩৩— এটা তো বাস্তব অবস্থা ছিল না। তবু ভেবেছি, এত বিতর্কের পর যখন পথটা জোটের, ধরে রাখতে হবে। পার্টিতে সিদ্ধান্ত হল, কিন্তু একমত নয় সবাই। প্রকাশ কারাতের কথা বলছিলেন। হ্যাঁ দাদা, এই নেতার ব্যাপারস্যাপার বুঝি না। ২০০৮ সালে কেন ইউপিএ সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার?‌ সেই সরকারের সঙ্গে থেকে আমরা তো বেশ কিছু ভাল কাজও করিয়ে নিতে পারছিলাম। যখন আমরা একসঙ্গে তৃণমূল আর বিজেপি–‌র বিরুদ্ধে লড়ছি, বিজেপি–‌কে বাড়তে দিতে চাইছি না, উনি কেরলে বলে দিলেন, বাংলায় ভাল ফল করবে বিজেপি। ভাবুন, আমাদের অবস্থাটা কী?‌ এত বড় নেতা, কী কাণ্ড!‌
.‌.‌.‌ রাহুল গান্ধীর সঙ্গে সীতারাম ইয়েচুরির অন্তরঙ্গ ছবি দেখি। সেই রাহুল গান্ধী প্রদেশ কংগ্রেসকে কড়া নির্দেশ দিতে পারলেন না, সিপিএম–‌এর জেতা দুটো সিট ছেড়ে দিতে হবে?‌ এদিকে, বুঝলাম না, বেছে বেছে অধীর আর ডালুবাবুর বিরুদ্ধে প্রার্থী না দেওয়ার রাজনীতিটাই বা কী?‌ সঙ্গীদের বোঝাতে পারছি না।
.‌.‌.‌ বিজেপি–‌র পক্ষে আমাদের কেউ নয়। বিজেপি–‌ই প্রধান শত্রু বলছেন না নেতারা?‌ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য স্পষ্ট লিখেছেন, তৃণমূলের বদলে বিজেপি মানে ‘‌ফ্রম ফ্রাইং প্যান টু ফায়ার’। তপ্ত কড়াই থেকে আগুনে ঝাঁপ দেওয়া। মানিক সরকার বলে গেলেন, তৃণমূলকে সরাতে গিয়ে বিজেপি–‌কে ডেকে আনবেন না। খাল কেটে কুমির ডেকে আনবেন না। ওঁরা স্পষ্ট কথা বলছেন। কিন্তু কিছু নেতার কথাবার্তা গোলমেলে। মুশকিলে পড়ছি আমরা, যারা নীচের দিকে লড়ে যাচ্ছি।
.‌.‌.‌ দাদা, তবু একটা কথা বলি, এবার ভোটে আমাদের ফল যত খারাপ হবে ধরে নিচ্ছেন, তেমনটা হবে না। দুটো সিট আশা করি জিততে পারব, তার চেয়ে বড় কথা, অনেক আসনে ভাল ভোট পাব। ঘুরে দাঁড়ানো শুরু হয়েছে।
.‌.‌.‌ আমাদের দিকটা ভাবুন। জ্যোতিবাবু দীর্ঘদিন যথাসাধ্য করে গেছেন। কিন্তু, অনিল বিশ্বাসের অকালমৃত্যু ক্ষতি করে দিল। ২০১১–‌য় হারের পর বুদ্ধদা ভাবলেন, সব দোষ তাঁর। শরীর খুব খারাপ, কিন্তু সব দায় নিজের ভেবে নেওয়ায় আরও বিধ্বস্ত হলেন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সামনে থেকে ঘুরে দাঁড়ানোয় নেতৃত্ব দিলে, আমরা পারতাম। নিরুপম সেন চলে গেলেন। গৌতম দেব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এত ফাঁক ভরাট করা মুখের কথা?‌ ভুল হয়েছে অনেক, কিন্তু আমাদের দিকটাও ভাবুন।
.‌.‌.‌ একটা কথা জিজ্ঞেস করছিলেন, কতদিন লড়ে যেতে পারব?‌ আমার কথা বলতে পারি। আমার মতো আরও অনেকের কথা। তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়ব, বিজেপি–‌কেও জমি ছেড়ে দেব না। বেনো জল গেছে, ভাল হয়েছে। সময় লাগবে ফিরে আসতে, তা লাগুক। লড়াইটা চলবে। বিজেপি–‌কে বাড়িয়েছে মিডিয়া, আপনারা। যেন তৃণমূল–বিরোধী বলতে আছে বিজেপি–‌ই। না। এবারও আমরা মোটামুটি ভাল ভোট পাব, অন্তত ১৫টা আসনে। পূর্ণেন্দু পত্রীর একটা কথা বলছিলেন, ‘‌শাঁখা সিঁদুর’‌। যা–‌ই হোক, যত ক্ষতিই হোক, আমরা পার্টি কর্মীরা ‘‌শাঁখা–‌সিঁদুর’‌ নিয়ে মরতে রাজি। বেশ তো। মরব। কিন্তু, মরার আগে মরব না। লড়ছি। ক্ষতি হয়েছে। দাদা, বলছি, আর ক্ষতি হবে না।‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top