প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে আসার পর বিজেপি–‌র প্রতিক্রিয়া:‌ রাহুল ফেল, তাই প্রিয়াঙ্কা!‌ হাস্যকর। কারণ, অনেক ফেল করার পর সম্প্রতি একটু পাশ করতে শুরু করেছেন রাহুল। তোলা হয়েছে রবার্ট ভদ্র প্রসঙ্গ। স্বাভাবিক। হওয়ারই কথা। তবু, প্রিয়াঙ্কা–‌অভিষেকে কিছু সুবিধা পেতেও পারে কংগ্রেস। রাজীব গান্ধীর মেয়ে, ইন্দিরা গান্ধীর নাতনি, গ্ল্যামারাস, কংগ্রেস কর্মীরা খানিকটা চাঙ্গা হতেই পারেন। এমন নয় যে, প্রিয়াঙ্কা আসায় রাজনৈতিক ছবি পাল্টে গেল। এমনিতেই ঘোর বিপদে বিজেপি। কলঙ্কিত, ব্যর্থ সরকার। গালভরা প্রতিশ্রুতি থেকে গেছে প্রতিশ্রুতিই। বিদেশের কালো টাকা ফেরেনি, নোট–‌বাতিল ও জিএসটি ১ কোটি ৮৭ লক্ষ মানুষের রুজি কেড়ে নিয়েছে। দলিত ও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন ওদের মুখোশ খুলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে শুধু ৫ রাজ্যে হারেনি বিজেপি, উপনির্বাচনেও অবস্থা কাহিল।
স্পষ্ট আভাস, বাংলা থেকে মমতা এবং তামিলনাড়ু থেকে স্ট্যালিন প্রায় সব আসন নিয়ে যাবেন লোকসভায়। সব রাজ্যেই প্রধান বিজেপি–‌বিরোধী দল ভাল ফল পাবে। সাধারণ অঙ্কেই মোদির বিদায় প্রায় নিশ্চিত। ওদের আশা ছিল, মায়াবতীকে ভয় দেখিয়ে সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে জোট আটকে দিতে পারলে, উত্তরপ্রদেশে ভরাডুবি হবে না। অখিলেশের সঙ্গে মজবুত জোট করে সেই আশায় জল ঢেলেছেন মায়াবতী। রাহুলের নিশ্চয় বাঘা বাঘা পরামর্শদাতা আছেন। কিন্তু দেখা গেল, উত্তরপ্রদেশে বিজেপি–‌র বিপর্যয় নিশ্চিত করা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। অমেঠি ও‌ রায়বরেলি কংগ্রেসের জন্য ছেড়ে রেখেছে সপা–‌বসপা জোট। ইঙ্গিত অস্পষ্ট নয়, বারাণসী–‌সহ আরও ৩–‌৪টি আসন কংগ্রেসকে দিতে প্রস্তুত ওরা। কৌশলগত রফায় কংগ্রেস ৪–‌৫ আসন পেতেও পারে। এবং বিজেপি–‌কে ৮০–‌র মধ্যে দশের কমে নামিয়ে ফেলা সম্ভব। তা হলে মোদির ফেরার সম্ভাবনা শূন্য হয়ে যায়।
প্রথমেই কংগ্রেস জানাল, ৮০ আসনেই লড়বে। অখিলেশ ও মায়াবতী সম্পর্কে ভাল ভাল কথা বললেন কংগ্রেস সভাপতি, কিন্তু বোঝা যাচ্ছে, ভেতর থেকে মানতে পারছেন না। প্রিয়াঙ্কাকে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে আনার ঘোষণার দিনই স্পষ্ট হল, বিজেপি–‌জমানার অবসানের চেয়েও রাহুল বেশি ভাবছেন কংগ্রেসের বেশি আসনের কথা, যা তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ সুগম করবে। একটু ত্যাগও করতে রাজি নন তিনি। পড়ে রয়েছে দেশের অনেক রাজ্য, ১৭০ আসন নিয়ে আসুন না আগে, বিজেপি–‌বিদায়ের আগেই নিজের প্রধানমন্ত্রিত্বের কথা ভাবছেন কেন কংগ্রেস ‌সভাপতি?‌
রাহুল বলছেন, উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেস ব্যাকফুটে নয়, ফ্রন্টফুটে খেলবে। সপা–‌বসপা জোটকে সামনে এগিয়ে দিয়ে, উত্তরপ্রদেশে ব্যাকসিট নেওয়া উচিত নয়?‌ একটু ব্যাকফুটে খেলা উচিত নয়?‌ বিস্ময়ের সঙ্গে আমরা শুনলাম, রাহুল বলছেন, উত্তরপ্রদেশে সর্বশক্তি নিয়োজিত হবে, দলকে অনেক ভাল জায়গায় নিয়ে আসতে হবে, রাজ্যে বদল ঘটিয়ে সরকার গড়বে কংগ্রেসই!‌ উত্তরপ্রদেশে পরের বিধানসভা নির্বাচনে সরকার গড়ার জায়গায় এসে যাবে তাঁর দল, এমন দিবাস্বপ্ন দেখার মানে কী?‌ কথাটা কেউ বিশ্বাস করেন?‌ বোঝেন না, ফল হতে পারে এই যে, মায়াবতী–‌অখিলেশদের পথে কাঁটা ছড়িয়ে কার্যত থেকে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হবে বিজেপি–‌র। ২০০৯ সালে উত্তরপ্রদেশে ২১ আসনে জিতেছিল কংগ্রেস। কিন্তু, তখন মায়াবতী–‌অখিলেশ জোট ছিল না। এই জোট উত্তরপ্রদেশে বিজেপি–‌কে শেষ করে দিতে পারে, আসন্ন লোকসভা ভোটে, পরের বিধানসভা ভোটেও। কেন্দ্রীয় সরকারের বড় দপ্তরে থাকবেন মায়াবতী, রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন অখিলেশ, এরকম বোঝাপড়া হয়ে থাকতেই পারে। হাঁটু কাঁপছে বিজেপি–‌র।
প্রিয়াঙ্কা–অভিষেকের দিন কংগ্রেস কর্মীদের সভায় রাহুল যা যা বলেছেন, সংবাদমাধ্যমের নানা সূত্রে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ‘‌উত্তরপ্রদেশকে নতুন মুখ্যমন্ত্রী দিচ্ছি আমরা!‌’‌ মানে কী?‌ প্রিয়াঙ্কা সামনে এলে দেশের নানা রাজ্যে কংগ্রেসকর্মীরা চাঙ্গা হতে পারেন, যেসব রাজ্যে বিজেপি–‌র প্রধান প্রতিপক্ষ, কংগ্রেস বেশি ভাল ফল করলে বিরোধী শিবিরেরই লাভ। সদ্য তিন রাজ্যে ক্ষমতায় ফিরেছে কংগ্রেস। সেই তিন রাজ্যে অনেক বেশি আসন তুলে আনতে কে বারণ করেছে?‌ মূল লক্ষ্য তো মোদির বিদায়। মহারাষ্ট্রে পাওয়ারকে সঙ্গে নিয়ে কংগ্রেসের আসন বাড়ার সম্ভাবনা প্রবল। দক্ষিণ ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর সময় থেকেই আধিপত্য ছিল কংগ্রেসের। তামিলনাড়ু ডিএমকে–‌র, জোটসঙ্গী হিসেবে দু–‌চারটি আসন পেতে পারে কংগ্রেস। কর্ণাটক, অন্ধ্রেও প্রিয়াঙ্কাকে প্রচারে ঝড় তোলার কাজে নামিয়ে বিজেপি–‌র বিপর্যয় নিশ্চিত করে দিচ্ছেন না কেন রাহুল গান্ধী?‌ প্রিয়াঙ্কার যতটুকু ইতিবাচক প্রভাব, তা উত্তরপ্রদেশেই কাজে লাগাতে চাইছেন কেন?‌ অখিলেশ–‌মায়াবতী জোটকে অস্বস্তিতে ফেলে বিজেপি–‌কে সুবিধা করে দিতে?‌ মিলিয়ে–‌যাওয়া হাসি মোদি–‌শাহদের মুখে ফিরিয়ে আনতে?‌
দল হিসেবে কংগ্রেসের পুনরুত্থান হোক, নিশ্চয় চাইবেন কংগ্রেস সভাপতি। সেটাই তাঁর দায়িত্ব। কিন্তু, শুনতে কি পাচ্ছেন না, দেশ জুড়ে একটাই আওয়াজ— আগে বিজেপি যাক? আগে ওরা যাক?‌ যে–‌সর্বনাশ করেছে ও করে চলেছে মোদি সরকার, তার থেকে দেশবাসীকে রেহাই দেওয়ার দায়িত্বটা কি অনেক বেশি নয়?‌ উত্তরপ্রদেশে ‘‌ফ্রন্টফুটে খেলে’‌ বিজেপি–‌র মুখে হাসি ফেরানোতেই কি অগ্রাধিকার?‌ ভবিষ্যতের কথা ভবিষ্যৎ বলবে, আগামী পনেরো বছরের মধ্যে দেশের বৃহত্তম রাজ্যে সরকার গড়তে পারবে না কংগ্রেস। প্রিয়াঙ্কাও মুখ্যমন্ত্রী হবেন না। যোগ্যতররা, শক্তিশালীরা আছেন। ভোট অন অ্যাকাউন্টসকে পূর্ণাঙ্গ বাজেটে পরিণত করছে বিজেপি। একটা রাজ্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে গিয়ে যে–‌দল গুজরাট গণহত্যা ঘটাতে পারে, আগামী কয়েক সপ্তাহে তাদের নখদাঁত বেরিয়ে আসবে। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। নিজের প্রধানমন্ত্রিত্বের কথা ভেবে বিরোধী জয়কে অনিশ্চিত করে দিয়ে ভাল করছেন?‌ ‘‌আগে ওরা যাক’‌— এই আওয়াজে গলা মেলাতে চান না রাহুল?‌ ‘‌ঐতিহাসিক ভুল’‌ না করলেই নয়?

জনপ্রিয়

Back To Top