কতদিন?‌‌ মহারাষ্ট্রে অদ্ভুত কাণ্ডকারখানার পর, শেষ পর্যন্ত তিন দলের জোট সরকার। মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে। রাজনীতি ভিন্ন। শিবসেনার সঙ্গে সরকারে যাবে কংগ্রেস এবং এনসিপি, অভাবনীয় ছিল। রাজনীতি সম্ভাব্যতার শিল্প। তবু, এই জোট সরকার অসম্ভবেরই কাছাকাছি। প্রশ্ন, কতদিন?‌ দেবেন্দ্র ফড়নবিশ, বিজেপি নেতারা বলছেন, অচিরে ভেঙে যাবে। যেতে পারে, থেকেও তো যেতে পারে। কতদিন?‌
শিবসেনার উত্থান মারাঠি অস্মিতা ও অধিকারের জায়গা থেকে। একটা সময় পর্যন্ত দেখা গেছে, মুম্বইয়ে বিশেষত বেসরকারি চাকরিতে মারাঠিদের সংখ্যা নিতান্ত কম। সরকারি কাজেও ভিন্ন রাজ্যের মানুষ প্রচুর। ক্ষোভ জমছিল। তাকে সংহত চেহারা দিলেন বালাসাহেব ঠাকরে। মহারাষ্ট্রের শহরাঞ্চলে শিবসেনার প্রভাব তরতরিয়ে বাড়ল। কিন্তু, বাল ঠাকরে মারাঠি অস্মিতার সঙ্গে জুড়ে দিলেন উগ্র হিন্দুত্বকে। তখন মোদিরা ছিলেন না। বাজপেয়ী, এমনকী আদবানিও এক ধরনের সংযত হিন্দুত্বের পথে চলছিলেন। দল বাড়ানোর, নিজের প্রভাব বাড়ানোর স্বার্থে বাল ঠাকরে হয়ে গেলেন উগ্রতর, ভয়ঙ্ক‌‌র ‘‌হিন্দু হৃদয়সম্রাট’‌। মুম্বইয়ে দাঙ্গার জন্য প্রধানত দায়ী ঠাকরে, কমিশন বলে দেয়। মুম্বইয়ে ভারত–‌পাকিস্তান ম্যাচ বন্ধ করে দিল 
শিবসেনা, পিচ খুঁড়ে, হুমকি দিয়ে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা শিবসেনার, 
দাবি বাল ঠাকরের। বললেন, এজন্য তিনি গর্বিত!‌ বিজেপি–‌র সবচেয়ে পুরনো শরিক, উগ্রতর শরিক। এই শিবসেনার সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ দল দুটির জোট!‌ হল। .‌.‌.‌কতদিন?‌
একটু বদল আসছিল। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিভা পাটিল ও প্রণব মুখার্জিকে বিজেপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে সমর্থন করে শিবসেনা। উদ্ধবের পুত্র আদিত্য দলটাকে আধুনিক ও সংযত করার পথে হাঁটলেন। নানা ধর্মের মানুষের কাছে গেলেন, নানা ভাষায় নানা পোশাকে নির্বাচনী প্রচার করলেন। চাপা স্বভাবের উদ্ধব ঠাকরে মদত দিলেন। নোটবন্দির 
দেড় ঘণ্টার মধ্যে তীব্র প্রতিবাদ জানান মমতা ব্যানার্জি। পরদিন, শিবসেনা। নানা ইস্যুতে, 
জোটে থাকলেও, কেন্দ্রীয় সরকারকে আক্রমণ 
চলতে থাকল মুখপত্র ‘‌সামনা’য়। আগ্রাসী বিজেপি মহারাষ্ট্রে ক্রমশ দুর্বল, অসহায় শরিকে পরিণত করায় ফুঁসছিল শিবসেনা। এবার একেবারে বিরোধী শিবিরেই। কতদিন?‌
শিবসেনা যে ক্রমশ সরে যাচ্ছে, বিরোধী জোটের সম্ভাব্য শরিক, প্রথম ভেবেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। যখন সব বিরোধী দলের নেতারা অস্পৃশ্য ভেবেছেন শিবসেনাকে, মুম্বইয়ে উদ্ধব–‌আদিত্যর 
সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। সেজন্য তখন কংগ্রেস–‌সিপিএম নেতারা কটূক্তি করেছিলেন। মমতা ঠিক দরজায় কড়া নেড়েছিলেন, প্রমাণিত।
মহা–‌নাট্যের পর নতুন সম্ভাবনা। প্রথমত, একটা ধাক্কা দেওয়া গেল বিজেপি–‌কে। মোদি–‌শাহ জমানায় প্রথম অপ্রত্যাশিত ধাক্কা। মোদি সর্বশক্তিমান, অমিত শাহ ‘‌চাণক্য’‌— সুতরাং অপরাজেয়, সেই
মিথটা ভাঙল।
আর, বিজেপি–‌র স্বরূপ আরও স্পষ্ট হল মানুষের কাছে। যেভাবে মন্ত্রিসভায় বৈঠক ছাড়াই রাষ্ট্রপতির শাসন প্রত্যাহার করতে বললেন প্রধানমন্ত্রী, অভূতপূর্ব। ক’‌দিন আগেই ফড়নবিশ জানিয়ে এসেছেন রাজ্যপালকে, সরকার গড়ার সংখ্যা নেই। অজিত পাওয়ারকে ভাঙিয়ে সংখ্যা ‘‌এল’‌। রাষ্ট্রপতিকে সই করানো হল রাত দুটোয়। কাকভোরে রাজ্যপাল ডাকলেন ফড়নবিশ–‌অজিত পাওয়ারকে। রাজ্যবাসী সকালে চা মুখে তোলার আগেই শপথ‍‌।‌ ক্ষমতা ধরে 
রাখার জন্য কতদূর যেতে পারে, কত নীচে নামতে পারে, আগে দেখিয়েছে বিজেপি, গোয়া–‌মণিপুর–‌অরুণাচলে, কর্ণাটকে। এবার সব রেকর্ড চূর্ণ। নিরপেক্ষ, 
সাধারণ মানুষকেও আসল চেহারাটা চিনিয়ে 
গেল বিজেপি।
দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী মোদিদের হাতছাড়া। ষড়যন্ত্র প্রমাণিত। এবং, জোট সরকারের শরিক শিবসেনাকে আসতে হল অভিন্ন কর্মসূচিতে, যেখানে ‘‌ধর্মনিরপেক্ষ’‌ শব্দটা স্পষ্টভাবে উচ্চারিত। শপথের পরই মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে বললেন, অনেক বেআইনি কাজ হয়েছে, তদন্ত হবে। মোদির সাধের বুলেট ট্রেন প্রকল্প নতুন করে খতিয়ে দেখা হবে। মেট্রো কারশেডের জন্য অ্যারে অর‌ণ্যাঞ্চলের হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে, আরও হতে যাচ্ছিল, আটকে দিল নতুন সরকার। প্রতিবাদ করে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন যে–‌তরুণরা, তাঁদের মামলা থেকে মুক্ত করার ঘোষণা। কী হবে, কতটা হবে, দেখা যাবে। কতদিন, প্রশ্নও থাকবে। কিন্তু বদলের নিশ্চিত সূচনা।
কংগ্রেসের কিছু করার ছিল না। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি ঘটিয়ে, বিজেপি–‌কে সুযোগ করে দিচ্ছিল কংগ্রেস। শেষ পর্যন্ত, সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বিজেপি–‌বিরোধী শক্তি হিসেবে অস্তিত্ব ধরে রাখার জন্য সমর্থন। আর, সেই যুগ আর নেই, যখন কেন্দ্রে বা রাজ্যে সরকার ফেলাটা ছিল কংগ্রেসের প্রিয় খেলা। রাহুল গান্ধী চাননি, অ্যান্টনি চাননি, সুশীল সিন্ধে চাননি, কিন্তু সোনিয়াকে নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে হল। কংগ্রেসকে এই বাধ্যবাধকতার জায়গায় এনে ফেলা শারদ পাওয়ারের বড় সাফল্য। প্রায় আশি বছর বয়সেও, তুমুল বৃষ্টিতে ভিজেও নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যিনি বিজেপি–‌কে প্রতিহত করেছেন। 
শিবসেনা এবং এনসিপি দেখল, মহারাষ্ট্র দেখাল, শক্তিশালী আঞ্চলিক দলকে পিষে মারার, শেষ করে দেওয়ার গেরুয়া স্বপ্ন ভূলুণ্ঠিত। আঞ্চলিক দল যদি শক্তিশালী হয়, যদি রাজ্যবাসীর আবেগকে ধরতে পারে, যদি থাকে নিশ্চিত ও জনপ্রিয় নেতৃত্ব, দেশে এক বা দুই–‌দলীয় ব্যবস্থা চলবে না। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর পক্ষে মহারাষ্ট্রের ঘটনা উপকারী। 
স্পষ্ট বার্তা।
কতদিন?‌ শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যারা শত্রুতাবশত মৃত্যুর দিন গোনে, তাদের জবাব দিচ্ছে জোট সরকার। যদি দু–‌বছরও থাকে (‌পাঁচ বছরও থাকতে পারে)‌, ভারতীয় রাজনীতিতে মহা–‌নাট্য ইতিবাচক সম্ভাবনার পথ খুলে দিল।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top