আমরা ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ বলব না। বাংলায় নতুন আমদানি–‌করা আওয়াজকে অগ্রাহ্য করব। ওরা র‌্যাগিং করতে চাইছে। মুখ্যমন্ত্রী যখন রাজ্যে শান্তি ফেরাতে এবং সাংগঠনিক পুনরুজ্জীবনে তৎপর, তখন কিছু লোক গাড়ির সামনে গিয়ে বলছে ‘‌জয় শ্রীরাম’‌। এই লোকগুলো কী করে একটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর গাড়িতে কার্যত হামলা করার চেষ্টা করতে পারছে, প্রশাসন দেখবে। সন্দেহ নেই, র‌্যাগিং, যাতে মমতাকে নিজের আশু কর্তব্য থেকে বিচ্যুত করা যায়। নেত্রী সেটা নিশ্চয় বুঝছেন এবং উপেক্ষা করবেন। উপেক্ষাই শ্রেষ্ঠ জবাব।
তবে, শুধু উপেক্ষাই যথেষ্ট নয়। আমাদের আরও কিছু করার আছে। আমরা, যারা বাংলা ও বাঙালি আবেগের ওপর কুৎসিত আক্রমণকে সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিহত করতে চাই, চুপ করে বসে থাকব না। মুখ্যমন্ত্রী দুটো কথা বলেছেন, জয় হিন্দ, জয় বাংলা। ‘‌জয় হিন্দ’‌ স্লোগান নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর। সেই নেতাজির, যিনি ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে আপসহীন ছিলেন, যিনি আজাদ হিন্দ ফৌজে হিন্দু ও মুসলমান সেনাদের একসঙ্গে বসে খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন, খাবার ভাগাভাগিকেও উৎসাহিত করতেন। প্রথম দিকে একদিন দেখেন, রাতের খাওয়া চলছে, একদিকে হিন্দুরা, অন্যদিকে মুসলিমরা। তিনি কী করলেন?‌ বললেন, জায়গা পাল্টাপাল্টি কর। এদিক থেকে ওদিকে, ওদিক থেকে এদিকে। হিন্দুদের থালার সামনে মুসলিমরা, মুসলিমদের থালার সামনে হিন্দুরা। সর্বাধিনায়কের নির্দেশ মানলেন সবাই। তারপর থেকে মিলেমিশে বসে খাওয়া চালু এবং বাধ্যতামূলক। পরে আর বাধ্যও করতে হয়নি। মসৃণভাবে চলতে থাকল। ‘‌জয় হিন্দ’‌ ভারতবাসীর ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্যের প্রতীক। আমরা থাকব। অত্যুগ্র জাতীয়তাবাদ, চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িকতা ও যুদ্ধ–‌জিগিরের জেরে আপাতত বিজেপি ‘‌ভারত দখল’‌ করে নিয়েছে বলে আমরা নিজেদের ‘‌ভারতীয়’‌ বলার গর্ব ত্যাগ করব না। জয় হিন্দ।
‘‌জয় বাংলা’‌ প্রসঙ্গে আসার আগে ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ ধ্বনির অর্থ ও উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করব। পবিত্র সরকার বলছেন, ‘‌রাম’‌ যে সাম্প্রদায়িক প্রচারের অস্ত্র হতে পারে, ভাবাই যেত না। ‘ভূত আমার পুত পেত্নি আমার ঝি/‌‌রাম–‌লক্ষ্মণ সাথে আছে করবি আমার কী’‌— তো হিন্দু–‌মুসলিম নির্বিশেষে বাঙালি–‌মুখে শোনাই যায়। সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থে রাম–‌এর ব্যবহার নতুন এবং বিপজ্জনক। সুবোধ সরকার বলছেন, ২০০২ গুজরাট গণহত্যা থেকেই ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ ধ্বনি মারাত্মক অর্থ নিয়ে আসে। সরাসরি সাম্প্রদায়িক–‌রাজনৈতিক। শঙ্খ ঘোষ বললেন, রাম আর ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ এক নয়। এই ধ্বনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিপজ্জনক।
যারা ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ হুঙ্কার তুলছে, তাদের মধ্যে অধিকাংশই  বাল্মীকির রামায়ণ পড়েনি, কৃত্তিবাসের রামায়ণ–‌ও না। রামায়ণ–‌এর সংক্ষিপ্ত সংস্করণ বা চটি বই–‌ও নয়। হিংসায় ও সাম্প্রদায়িকতায় উন্মত্ত কিছু লোকের দরকার ছিল একটা গা–‌গরম–‌করা স্লোগান, পেয়েছে। গুজরাট, ‌উত্তরপ্রদেশ ইত্যাদি রাজ্য হয়ে বিদ্যাসাগর–‌রবীন্দ্রনাথের বাংলায় পৌঁছেছে। আমরা বিরোধিতা করব। বিরোধিতার একটা দিক হল, উপেক্ষা, প্ররোচিত না–‌হওয়া, যা ওরা চাইছে। দ্বিতীয় দিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ।
এবং সেই প্রতিরোধে আমাদের শান্তিপূর্ণ শক্তিশালী অস্ত্র, বাঙালিত্ব। বাঙালিয়ানা। যদি কেউ ভেবে থাকেন, আমরা সঙ্কীর্ণ প্রাদেশিকতায় ঢোল পেটাতে চাইছি, ভুল ভাবছেন। ২০০০ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আমরা পথে নেমেছিলাম, নামফলকে বাংলা ব্যবহারের দাবিতে। কলকাতায় এগারোটা মিছিল, দোকানে–‌দোকানে, দপ্তরে–‌দপ্তরে অনুরোধ। তিনদিনেই লক্ষ্য করলাম, এক পাগড়িধারী প্রৌঢ় হাজির, স্লোগানে মুখর। এগারো দিনই এসেছিলেন। নাম সুখনন্দন সিং। মুগ্ধতা প্রকাশ করতেই বললেন, ‘‌এতে মুগ্ধ হওয়ার কী আছে ভাই?‌ বাংলায় থাকি, বাংলায় কথা বলি, না–‌পারলেও বাংলায় গানও গাই, বাংলা ভাষার দাবিতে থাকব না?‌’‌ সুখনন্দনের চেয়ে বেশি ‘‌বাঙালি’‌ আমি–‌আপনি?‌
২০০১। করে সমতা আনার লক্ষ্যে গঠিত কেন্দ্রীয় সরকারের কমিটি সিদ্ধান্ত নিল, মিষ্টির ওপর ৮ শতাংশ কর বসবে। ছোট দোকানকেও সেই কর দিতে হবে। মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী সমিতির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসলাম। শুনলাম, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি গাঙ্গুরাম–‌এর প্রবীণ কর্ণধার। ‘‌নবজাগরণ’‌–‌এর দপ্তর সম্পাদক রতন বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, ‘‌আমাকে নোট করতে হবে, কিন্তু হিন্দিতে বললে পারব না তো!’‌‌ এলেন। লম্বা ঝুলের ফুলহাতা শার্ট, ধুতি। পরিষ্কার  বাংলায় বললেন, ‘‌দুটো কথা ভাবতে হবে। গোটা দেশে সব মিষ্টির জন্য একই হারে কর। কিন্তু আমরা, বাঙালিরা তো ছানার মিষ্টি বানাই যা দেড়দিনেই নষ্ট হয়ে যায়। ক্ষতি হয়। অন্য রাজ্যে যারা খোয়ার মিষ্টি বানায়, ছানা ছুঁয়ে দেখে না, তাদের সঙ্গে আমাদের এক করে ফেলা যায়?‌ বাংলার গ্রামেও মিষ্টির দোকান। যিনি মালিক, তিনিই কর্মী। তিনি কীভাবে করের ঝামেলা সামলাবেন?‌ কোনওরকমে সংসার চলে তাঁর, তিনি বাঁচবেন?‌’‌ আমরা শুনলাম। কর সমতা কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন অসীম দাশগুপ্ত। তাঁকে বললাম। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দিলাম। এবং সেই কর প্রত্যাহৃত হল। যখনই তা নিয়ে ভাবি, তখনই গাঙ্গুরাম–‌এর প্রবীণ কর্ণধারের কথা মনে আসে। বাঙালি নয়?‌ আমার–‌আপনার চেয়ে বেশি ‘‌বাঙালি’‌। সমবেত বাঙালি–‌শক্তি নিয়েই আমরা প্রতিরোধ গড়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
মুশকিল হল, জন্মসূত্রে বাঙালি কিছু মানুষও বাংলা ও বাঙালি নিয়ে ভাবা দূরের কথা, বিরোধিতা করেন। ভি বালসারা বলেছিলেন, ‘‌আপনাদের সঙ্গে আছি, কিন্তু দেখবেন, কিছু তথাকথিত বাঙালিই উল্টো কথা বলবে।’‌ ক্রমশ বুঝেছি। দেখছি–‌শুনছি, বাংলা ঠিকঠিক বলাটাও আর জরুরি মনে করে না কিছু ‘‌বাঙালি’‌। হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ তাদের গ্রাস করেছে, অজান্তে। এর বিরুদ্ধেই আমাদের লড়াই।‌ ‘‌আমরা বাঙালি’‌ নামে একটা সংগঠন ছিল, সে তো বিরাট বিচ্ছিরি। ‘‌আমরা বাঙালি’‌ সংগঠন করব না। কিন্তু মনে তো রাখতেই হবে এবং গর্বিত থাকতেই হবে, আমরা—বাঙালি।

জনপ্রিয়

Back To Top