৬৭ বছর আগে, যাঁর নেতৃত্বে প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল ভারতে, সেই সুকুমার সেন বলেছিলেন, ‘‌আমরা যেভাবে প্রথম নির্বাচনটা করতে পারলাম, সারা পৃথিবীর মানুষ প্রশংসা করবেন। প্রথম নির্বাচন কমিশনারের কথা সত্যি প্রমাণিত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলেন, ভারতের থেকে অনেক কিছু শেখার আছে উন্নত দেশগুলোরও। আজ, ৬৭ বছর পর, দেখা গেল, সেই নির্বাচন কমিশন শাসক দলের নির্লজ্জ দাসত্ব করছে। কমিশনেরই নির্দেশ ছিল, প্রচারে সেনাবাহিনীর কীর্তিকে ব্যবহার করা যাবে না। নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে ১১টি নির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েছে। কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হল না।
বাংলায় কী হল, ভাবুন। বাহিনী নামানো হল দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ৬৪ হাজার। উর্দি–‌সন্ত্রাস। গুলি চালাল ৫ জায়গায়। লাইনে দাঁড়ানো মানুষকে বিজেপি প্রার্থীকে ভোট দিতেও বলা হল। আর কী কী করল কমিশন?‌ সরিয়ে দিল তিন পুলিস সুপারকে। সরানো হল কলকাতা ও বিধাননগরের পুলিশ কমিশনারকে (‌যাতে অবাধে কালো টাকা ঢুকতে পারে?‌)‌। কলকাতা পুলিশের দায়িত্ব দেওয়া হল বিজেপি–‌ঘনিষ্ঠ এক অফিসারকে, যাঁর কলকাতা পুলিশে কাজ করার অভিজ্ঞতাই নেই। ১৪ মে যে–‌তাণ্ডব চালাল গেরুয়া গুন্ডাবাহিনী, তা হতে পারল। কার্যত নেতৃত্বহীন পুলিশ প্রায় নিষ্ক্রিয় থাকল। সরানো হল এক জেলাশাসককে, যাঁর যোগ্যতা নিয়ে সংশয় নেই। অপসারিত হলেন নানা স্তরের অনেক পুলিশ অফিসার, এই বার্তা দিতে যে, রাজ্যের ওপর কোনও ভরসা নেই কমিশনের। স্বরাষ্ট্র সচিব অত্রি ভট্টাচার্য কেন্দ্রীয় বাহিনীর বাড়াবাড়ি নিয়ে একটা সংযত চিঠি দিয়ে আবেদন জানিয়েছিলেন কমিশনের কাছে। সরানো হল তাঁকে। রাজীব কুমারকে রাজ্যের কোনও পদে নয়, যেতে বলা হল কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র দপ্তরে নির্দিষ্ট কাজ ছাড়াই। এডিজি, সিআইডি নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। গত কয়েকদিনে টাকা উড়ছিল, দিলীপ ঘোষের ঘনিষ্ঠ সহযোগীর কাছ থেকে উদ্ধার এক কোটি টাকা, নানা জায়গায় পুলিশ উদ্ধার করল অঢেল অর্থ। রাজীব কুমার কাজের সূত্রেই হয়তো যুক্ত ছিলেন কালো টাকা উদ্ধারের কাজে, তাই কি নির্বাসন?‌ নিতান্তই অধিকার নেই, না–‌হলে মুখ্যমন্ত্রীকেও বোধহয় সরিয়ে দিত মোদি–‌শাহর কমিশন!‌
টাকা উড়ছে। অমিত শাহর রোড শোয়ে (রড শো?‌)‌ দশ হাজার কেজি ফুলের পাপড়ি ছড়ানো হল। বিপুল আয়োজন। কয়েক কোটি টাকা খরচ। এবং সেই মিছিল ‘‌সফল’‌!‌ মানুষের মধ্যে ভয় ঢোকানো গেছে, বিদ্যাসাগরের মূর্তিটা ভাঙা গেছে। ভোটের আগে ও সময়ে বহিরাগতরা ঢুকেছে দলে দলে, রং গেরুয়া। অমিত শাহর রড শোয়েও তেমন কিছু গুণধরকে দেখা গেল। বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ থেকে হিংস্র গুন্ডাদের স্পষ্ট উপস্থিতি। বারাসতে হাতেনাতে প্রমাণ, নানা জায়গায় দেখা গেল, হোটেলে, গেস্ট হাউসে, ধর্মশালায়, কর্মীদের বাড়িতে বহিরাগত বিজেপি নেতা–‌কর্মীদের ভয়ঙ্কর উপস্থিতি। মোটামুটি বড় নেতা বড় হোটেলে, মাঝারি নেতা মাঝারি হোটেলে, সাধারণ বহিরাগতরা ধর্মশালায় ও স্থানীয় কর্মীদের বাড়িতে। হিমন্ত বিশ্বশর্মা, সুনীল দেওধরের মতো কুখ্যাত নেতারা বেশ কিছুদিন পড়ে থাকলেন বাংলায়, ‘‌এলোমেলো করে দে মা’‌, বা, ‘‌লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে দাও হে হনুমান।’‌
১৪ জুন দুপুর থেকেই উত্তেজনা তৈরি করা হচ্ছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢোকার চেষ্টা ব্যর্থ, কর্তৃপক্ষ সতর্ক থাকায়, না–‌হলে স্যর আশুতোষ–‌সহ কত মনীষীর মূর্তি ভাঙত!‌ বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার পরে বিজেপি নেতারা বুঝলেন, ভুল হয়ে গেছে বিলকুল, এই হামলার জন্য শেষ দফার ভোটে নিশ্চিত শাস্তি হবে, মুখ লুকোনোর জায়গা নেই। লুকোনোর জায়গা নেই, কিন্তু গেলার মতো মুখ আছে, লজ্জা, সে আবার কী!‌‌ প্রথমে শাহ, তারপর মোদি, একেবারে উল্টো কথা, ডাহা মিথ্যা ছড়াতে চাইলেন। অমিত শাহর শান্তিপূর্ণ রোড শোয়ে নাকি হামলা চালিয়েছে তৃণমূল। এবং মূর্তিটা ভেঙেছে তৃণমূলই। বিজেপি নেতা রাকেশ সিংয়ের বার্তা প্রকাশ্যে এল, পাঁচ ফুট লম্বা বাঁশ–‌লাঠি নিয়ে যাবেন। সেই লাঠিতে পেরেক–‌পোঁতা। বিদ্যাসাগর কলেজের কেয়ারটেকার শান্তিরঞ্জন মোহান্ত বলছেন, গেট টপকে এবং ভেঙে ঢুকে পড়ে বিজেপি–‌র লোকেরা, ধ্বংস করে কলেজের সম্পত্তি। এবং ভেঙে দেয় বাঙালির ‘‌সম্পদ’‌ বিদ্যাসাগরের মূর্তি। তেজেন্দর বাগ্গা, দিল্লির যে–‌নেতা চূড়ান্ত কুখ্যাত, যিনি প্রশান্তভূষণের ঘরে ঢুকে পেটালেন, তিনি কী করছিলেন এখানে?‌ ভিডিওয় পরিষ্কার, বিজেপি–‌র গেরুয়া পোশাক ও ফেট্টি–‌পরা গুন্ডারাই তাণ্ডব চালিয়েছে।
সিপিআই(‌এমএল)‌ লিবারেশন–‌এর রাজ্য সম্পাদক পার্থ ঘোষ দ্ব্যর্থহীন বিবৃতি দিলেন, বিজেপি–‌র হিংস্র বাহিনীকে তীব্র ধিক্কার। আর, সিপিএম?‌ রাজ্য সম্পাদক বললেন, বিজেপি–‌তৃণমূলের জন্যই যত গন্ডগোল, মূর্তি ভাঙা!‌ আরও বলা হল, দুই দলেরই লক্ষ্য সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ। তৃণমূল ১৪ মে উত্তর কলকাতায় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটাচ্ছিল?‌ এভাবে বলা যায়!‌ এমন কথাও বলা যায়!‌
রুখে দাঁড়িয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। যিনি শুধু মুখ্যমন্ত্রী নন, বাংলার অবিসংবাদিত নেত্রী। প্রতিবাদ, ধিক্কার জানানো ছাড়াও আমাদের কী করার আছে?‌ আজ, ১৯ মে, শেষ দফার নির্বাচন ৯ কেন্দ্রে। ৯ কেন্দ্রের সচেতন বাঙালি আরও বেশিভাবে বিপর্যস্ত করুন গুন্ডা বিজেপি–‌কে। ভয়ঙ্কর শক্তির প্রত্যক্ষ কিছু ভোট থাকবেই। তার বাইরে একটাও নয়। আজ ওদের চরম শাস্তি দিন।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top