বিজেপি নেতাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, বাংলায় ক্ষমতায় এসেই গেছেন। ধীরে রজনী, ধীরে। কেউ কেউ বলেও দিচ্ছেন, ‘‌মমতা শেষ!‌’‌ কথাটা শুনেছিলাম ১৫ বছর আগেও। ২০০৪ লোকসভা ভোটে তৃণমূল মাত্র একটা আসন পেয়েছিল। শুধু মমতা। শোনা গেল, ‘‌মমতা শেষ’‌!‌ ৮ থেকে ১–‌এ নেমে আর নাকি দল ধরে রাখতে পারবেন না। ঝাঁক বেঁধে নেতা–‌কর্মীরা কংগ্রেসে ফিরে যাবেন। কী হয়েছে, তা বঙ্গবাসী জানেন। ঠিক পাঁচ বছর পর, ২০০৯ সালে ১৯ আসনে জিতেছিল তৃণমূল। দল ভাঙেনি। দয়া করে বলবেন না, ‘‌মমতা শেষ’‌, কথা গিলতে হবে।
উগ্র জাতীয়তাবাদ, বিপুল পরিমাণে টাকা (‌কয়েক হাজার কোটি)‌, কেন্দ্রীয় বাহিনীর পক্ষপাত, সব মিলিয়ে রাজ্যে বিজেপি এতটা বাড়তে পারল। আবার ভয়ঙ্কর মোদি–‌ঝড়, তারও প্রভাব। তামিলনাড়ুর ব্যাপারটা আলাদা। পালা করে সব তুলে নেয় ডিএমকে বা এডিএমকে। এবার ডিএমকে–‌র পালা। বাকি ভারতে?‌  উগ্র মোদি–‌ঝড়কে প্রতিহত করেছেন ওডিশায় নবীন পট্টনায়ক, তেলেঙ্গানায় চন্দ্রশেখর রাও, পাঞ্জাবে ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং এবং বাংলায় মমতা ব্যানার্জি। খড়কুটোর মতো উড়ে যায়নি তৃণমূল। একশো প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অধিকাংশ আসন ধরে রেখেছেন মমতা।
২০০৯–‌এ তৃণমূলের সাফল্যের দুবছর পর রাজ্যে এসেছিল পরিবর্তন। ২০০৯–‌এ তৃণমূল ১৯, শাসক বামফ্রন্ট পেয়েছিল ১৫। এবার, এত আক্রমণ সত্ত্বেও তৃণমূলের আসন ২২। তুলনা হয় না। শতাংশে পাঁচ বছরে কতটা কমল তৃণমূল?‌ বাড়ল!‌ ২০১৪ সালে মমতার দল পেয়েছিল ৩৯ শতাংশ ভোট। এবার ৪৩। ৪ শতাংশ বৃদ্ধি। তবু কেন আসন কমল?‌ পরিষ্কার। ২০১৪ সালে বামফ্রন্ট পেয়েছিল প্রায় ৩০ শতাংশ। এবার ৭।‌ কমেছে ২৩%‌। বিজেপি কত বাড়ল?‌ ২০১৪ ভোটে পেয়েছিল ১৭%‌, এবার ৪০%‌। বাড়ল ২৩%‌। সিপিএম তথা বামফ্রন্টের যত কমল, বিজেপি‌–‌র সেটাই বাড়ল। হতে পারে, কংগ্রেস থেকেও কিছু গেছে। কিন্তু ২৩ এবং ২৩, এতটাই মিল সংখ্যায়, মূল বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়া বাম নেতাদের পক্ষেও সম্ভব নয়। দিদি–‌মোদি, প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি বলে সিপিএম নেতারা যা–‌ই বোঝানোর চেষ্টা করুন, বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। হ্যাঁ, একটা সাফল্য দাবি করতে পারেন নেতারা। বহরমপুর ও দক্ষিণ মালদায় কংগ্রেস প্রার্থীদের সরাসরি সমর্থন করেছিল সিপিএম। প্রকাশ্য প্রচারও দেখা গেছে। এবং অধীর ও ডালুবাবু জিতেছেন। সাফল্য নয়?‌!‌
ভোট এসেছে ৪৩ শতাংশ, লোকসভা ভোটের হিসেবেও ১৫৮ কেন্দ্রে এগিয়ে (‌১২ কেন্দ্রে হারের ব্যবধান অতি সামান্য)‌, এই তথ্য নিয়ে বসে থাকার মানুষ নন মমতা ব্যানার্জি। পর্যালোচনা শুরু হয়ে গেছে। কোথায় কোথায় সাংগঠনিক গাফিলতি, কিছু অন্তর্ঘাত হয়েছে কিনা, প্রকাশ্যে তৃণমূলে থেকেও ভেতরে বিজেপি–‌কে মদত দিয়েছেন কিনা কিছু সংগঠক, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা মানুষের কাছে যাওয়ার পথে কিছু লোকের দুর্নীতি বাধা হয়েছে কিনা, ২৩ মে থেকেই খতিয়ে দেখতে শুরু করেছেন তৃণমূলনেত্রী। রাজ্য নেতাদের সঙ্গে তো বটেই, জেলা স্তরেও কথা বলছেন। যিনি ২০০৪ সালে ১–‌এ নেমে এসেও দলকে শক্তিশালী করেছেন, ২২ আসনে ঘাবড়ে যাবেন না। রিপেয়ার। শুরু হয়ে গেছে মেরামতের কাজ। এবং তা আরও গতি পাবে।
একটা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপি কত মারাত্মক দল, বোঝা গেল ১৪ মে। শেষ দফা ভোটের পাঁচ দিন আগে। গেরুয়া ফেট্টি, পেরেক–‌লাগানো লাঠি নিয়ে তাণ্ডব, বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা। তারপর, শেষ দফায় ৯ আসনের মধ্যে ৮টিই পেয়েছে তৃণমূল।
কিছু সমস্যা সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সাংগঠনিক গাফিলতি ছাড়াও। প্রথমত, তৃণমূল ভাঙার জন্য মরিয়া হবেন বিজেপি–‌র ‘‌শিল্পী’‌–‌রা, সঙ্গে অঢেল টাকা। লুচি–‌আলুর দম পলিটিক্স বাড়বে। যাঁরা ভেতরে ভেতরে বিজেপি করছিলেন, তাঁদের প্রকাশ্যে আনার চেষ্টা হবে (‌সেটা অবশ্য ভাল, অন্তর্ঘাত অনেক খারাপ জিনিস)‌। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে কাজে লাগানো হবে, যাতে তৃণমূলের মনোবল ধ্বংস করে দেওয়া যায়। ঘাবড়ে গিয়ে আপস করবেন মমতা, তা হবে না। তৃতীয়ত, কত হাজার কোটি টাকা ঢুকবে তৃণমূলকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য, তা কল্পনার বাইরে। সেই আর্থিক হামলা প্রতিহত করতে হবে। চার, উন্নয়ন ও শাসনের স্বার্থে সরকারকে সচল রাখার পথে কাঁটা ছড়ানোর চেষ্টা করবে বিজেপি। প্রশাসন ও পুলিশের একাংশ যাতে সরকারকে অসুবিধায় না ফেলতে পারে, সতর্ক–‌সজাগ থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী।
এবার আসল কথাটা বলি। লোকসভা আর বিধানসভা ভোট এক নয়। বালাকোট থাকবে না। মোদি–‌ঝড় থাকবে না। ইস্যু হবে রাজ্যের উন্নয়ন, যাতে মমতা দশে দশ পেয়ে বসে আছেন। বাম ভোট রামে গেছে। এমনও হতে পারে, যাঁরা নিশ্চিত সাম্প্রদায়িকতা–‌বিরোধী, এমন ২–‌৩ শতাংশ ভোট তৃণমূলে ঢুকবে। হয়তো কংগ্রেসের ১–‌২ শতাংশ। তাতেই ১৫৮ পৌঁছে যাবে ১৭৮–‌এ। কী করে ২০০ পার করে নিতে হবে, জানেন মমতা, আর কেইবা জানে।
গেরুয়া আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাকে হয়ে থাকতে হবে সুস্থতার দ্বীপ। দক্ষ প্রশাসক, কিন্তু তারও আগে লড়াকু নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। সেই মমতাকে অবশ্যই দেখব। কংগ্রেস ও চূড়ান্ত ব্যর্থ কয়েকটা আঞ্চলিক দলকে নিয়ে দেশে বদল আনা গেল না। সে ভাবনা চার বছর মুলতুবি থাকবে। সামনে আসবেন বাংলার লড়াকু নেত্রী। রোখার সাধ্য কার?‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top