দিদিকে বলো। মুখ্যমন্ত্রীকে নয়। নেত্রীকে নয়। দিদিকে। সেই দিদি মুখ্যমন্ত্রী। সেই দিদি নেত্রী। ডাক— দিদিকে বলো। এই অন্তরঙ্গতা তাঁকেই মানায়। টেলিফোনে ও ওয়েবসাইটে মানুষের বক্তব্য আসছে। প্রশংসা। অভিযোগ। অভিযান। কার কাছে?‌ দিদি। ১০০ দিন, ১০০০ জনপ্রতিনিধি, ১০ হাজার গ্রাম, শহর। ‘দিদিকে বলো’।
প্রযুক্তির সাফল্য নিয়ে এরকম উদ্যোগ বিজেপি আগে নিয়েছে। সেখানে শুধুই প্রচার (‌এবং অপপ্রচার)‌, অভিযোগ নয়। পরে সিপিএম ওয়েবসাইটের জন্য কর্মী চাইল বিজ্ঞাপন দিয়ে, ‘‌বন্ধু হও বাড়াও হাত’‌। প্রচার, কোনও অভিযোগ পেতে নয়। যা–‌ই হোক, আগে ও পরে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করার উদ্যোগ নিয়েছে বিজেপি ও সিপিএম। কিন্তু তাদেরই সমালোচনা, ‘‌দিদিকে বলো’‌ নিয়ে। তৃণমূল নেত্রীর পরিকল্পনা ও দলের অভিযান সাড়া ফেলেছে, সে জন্যই রাগ, সমালোচনা?‌
মানুষের কাছে পৌঁছনোর এই অভিযান প্রশান্ত কিশোরেরই পরিকল্পনা, মিডিয়ার একাংশে পড়ছি, শুনছি। যে–‌কোনও দল পরামর্শ নিতেই পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের। উদাহরণ চাই?‌ দেব। ২৫ মে সাংবাদিকদের কাছে মমতা সরাসরি বলেন, দলের কাজে বেশি সময় দেবেন, এত উন্নয়ন ও প্রকল্প সত্ত্বেও কিছু অভিযোগ জমা হয়েছে কেন, পরিষেবায় ঘাটতি আছে কিনা, দেখবেন। কলকাতার মহানাগরিক ফিরহাদ হাকিম নেত্রীর সঙ্গে কথা বলেই শুরু করেছেন ‘‌টক টু মেয়র’‌। সরাসরি অভিযোগ শোনা। যথাসম্ভব প্রতিকার করা। ‘‌দিদিকে বলো’‌ কর্মসূচির আগেই কাজ শুরু হয়েছে, লোকসভা ভোটে অপেক্ষাকৃত মন্দ ফল হওয়ার পরেই। সরকার ও দলের নেত্রী হিসেবে মমতার চিন্তা স্বাভাবিক, ফাঁকটা কোথায়?‌ মানুষের কথা আরও ভালভাবে জানতে চেয়ে এক বড় অভিযান।
মমতা ‘‌কাটমানি’‌ প্রসঙ্গ তোলায় বিরোধীরা, বিশেষত বিজেপি ঝাঁপিয়ে পড়েছে। গোলমাল বাধাতে ঝাঁপিয়ে পড়া ওদের স্বভাব। ওটাই কর্মসূচি। কিছু জায়গায় পোস্টার। ভয় দেখিয়ে পঞ্চায়েত স্তরের কিছু নেতার কাছ থেকে টাকা ফেরানোর দাবি তুলিয়ে ও ছড়িয়ে গোলমাল পাকানোর চেষ্টা। দুটো খবর এল, বিজেপি–‌র স্থানীয় নেতারা ‘‌কাটমানি’‌ ফেরত দিচ্ছেন। ক্ষমতায় না থেকেও!‌ প্রাক্তন মন্ত্রী সিপিএম নেতা কান্তি গাঙ্গুলি বললেন, বাম আমলেও ‘‌কাটমানি’‌ ছিল। দলকে তা জানিয়েছেন, কিছু করা যায়নি। কথাটা এই যে, সব রাজ্যে আছে, সব আমলে ছিল, কাটমানি রোগ। এই প্রথম একজন মুখ্যমন্ত্রী তথা জননেত্রী সেই রোগের চিকিৎসায় কড়া ওষুধ দেওয়ার মহৎ বার্তা দিলেন। সে জন্য তো অভিনন্দন প্রাপ্য তাঁর। সেটা শত্রুদের ধাতে সইবে না। চুপ করে থাকুন অন্তত, তা–‌ও নয়, হাস্যকর সমালোচনা।
এবার লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যে কিছু কম আসন পেয়েছে তৃণমূল। শতাংশে ভোট বেড়ে হয়েছে ৪৩ শতাংশ। কিন্তু মমতা বুঝেছেন, বাম–‌কংগ্রেস বেশি ভোট পাবেই না, মালদা ও মুর্শিদাবাদের দুই কেন্দ্রে কিছুটা প্রভাব কংগ্রেসের, বামফ্রন্টের মোট ভোট সাড়ে ৭ শতাংশ। বুঝেছেন, বাংলাকে সাম্প্রদায়িক শক্তির থাবা থেকে বাঁচাতে, অন্তত ৪৬ শতাংশ ভোট সংগ্রহ করতে হবে। এত উন্নয়ন, গোটা দেশে নেই এমন ৪৭ প্রকল্প, তবু ফাঁকটা কোথায় এবং কেন?‌ প্রকল্পের সুবিধা কি আটকে যাচ্ছে কোথাও কোথাও, কারও কারও জন্য?‌ নেত্রী আরও ভেবেছেন, সংগঠনে কি কোথাও আত্মসন্তুষ্টির রোগ ঢুকেছে?‌ ‘‌এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না’‌?‌ চাই ঝাঁকুনি, চাই চিকিৎসা, চাই নতুন জোয়ার।
দিদিকে বলো, সাড়া প্রবল। প্রথম দিনই এক লক্ষ ফোন, ওয়েবসাইটে ৫০ হাজার সাড়া। তার মধ্যে কিছু প্রশংসাসূচক। কিছু পরামর্শ। কিছু রাজনৈতিক অভিসন্ধি। অনেকটাই অভিযোগ ও অভিমান। শান্তশিষ্ট লেজবিশিষ্ট অর্জুন সিং বললেন, তিনি নিজেই কয়েকবার দলে থেকেও মমতাকে ফোনে পাননি। যাঁরা ফোন করবেন, সরাসরি মমতাকে পাবেন না। হাস্যকর বললে কম বলা হয়। দিনে অন্তত ১০ হাজার ফোন। ধরবেন মুখ্যমন্ত্রী?‌ এক মিনিট করে কথা বললেও কত সময় লাগে?‌ দিনে তো ১৪৪০ মিনিট। ফোনে বার্তা নেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওয়েবসাইটে আসছে হাজার হাজার বার্তা। নির্যাস পৌঁছে যাচ্ছে দিদির কাছে। যেখানে প্রতিকার চাই, দেখছেন। যেখানে পরামর্শ, ভাবছেন।
কেন এত বড় অভিযানে মমতা?‌ এক, অভিযোগের মূল জায়গাগুলো চিহ্নিত করা। দুই, পরিষেবা মানুষের কাছে যাওয়ার পথে বাধা কোন কোন স্থানীয় নেতা, জেনে ব্যবস্থা নেওয়া। তিন, সংগঠনে যারা থেকেও নেই, তাদের চিহ্নিত করা। চার, মানুষের কাছে নানা স্তরের নেতারা গিয়ে কী বার্তা ও প্রতিক্রিয়া পেলেন, সবটুকু বুঝে নিয়ে ব্যবস্থা করা। পাঁচ, সংগঠনকে চাঙ্গা করা— যে–‌সংগঠনের নেত্রী বাংলাকে ধর্মনিরপেক্ষ রাখতে বদ্ধপরিকর। ছয়, যাঁরা অভিযান থেকে দূরে থাকবেন, তাঁরা বিজেপি–‌তে যাওয়ার পথ খুঁজছেন কিনা। যদি ৫ শতাংশও থাকে এমন, তাঁদের বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। নিষ্ক্রিয় ও মিরজাফরদের চিহ্নিত করা।
‘‌দিদিকে বলো’‌ অভিযানের অভিজ্ঞতা এখনও পর্যন্ত কী রকম?‌ দুজন বিধায়ক গ্রামে থাকতে গিয়ে দেখলেন, কার বাড়িতে থাকবেন তা নিয়ে ‘‌লড়াই’‌। আমার বাড়িতেই থাকুন। নেতিবাচক এটা?‌ মানুষের আরও কাছে গিয়ে বোঝার চেষ্টা, খারাপ কিছু?‌ কোনও কোনও জায়গায় ক্ষোভ–‌বিক্ষোভ,‌ এ জন্য কি চিন্তিত মমতা?‌ কেন?‌ বরং, তিনি তো এটাই চেয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে ক্ষোভ বেরিয়ে এলে, বুঝতে হবে, উদ্দেশ্য সফল। ক্ষোভের কথা বলতে দেওয়াও কর্মসূচির অঙ্গ। মানুষ খোলাখুলি বলুন, অভিযোগ জানান, ক্ষোভও প্রকাশ করুন, উদ্দেশ্য পরিষ্কার। অভিযান সাফল্যের দিকে যাচ্ছে, বামপন্থীরা কী ভাবছেন তাঁরাই জানেন, বিজেপি–‌র হতাশা ও রাগ ফুটে বেরোচ্ছে। বেরোক। ওদের নোংরামি আরও প্রকাশিত হচ্ছে। হোক। নানা স্তরের তৃণমূল কর্মীরা বুঝেছেন, ‘‌টাস্ক’‌ দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ ভাল মনে নিতে পারছেন না। ইতিউতি নিজেদের নাম আড়ালে রেখে বেসুরে বলতে চাইছেন। এটাও ফিডব্যাক, যা সংগঠনকে মজবুত করায় কাজে লাগবে। মূল কথা, দিদিকে বলো। দিদিকে। বলো।

জনপ্রিয়

Back To Top