ভয়ঙ্কর আমফান চরম বিপর্যস্ত করে গেল উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনাকে। অংশত পূর্ব মেদিনীপুর–‌সহ আরও চার জেলাকে। কলকাতা অক্ষত থাকল না। নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলার আগে সাতান্ন বছর বয়সি এক পরিচিত অধ্যাপকের কথা বলি। শখ দুটো, বই পড়া এবং বেড়ানো। মহাঝড় আছড়ে পড়ার দু’‌দিন পরে ফোন করেছিলেন। আলো নেই, জল প্রায় নেই, আর পারা যাচ্ছে না। বললাম, মনে পড়ে, গত বছর মৌসুনি দ্বীপ থেকে ফিরে বলেছিলেন, কী সুন্দর, মুগ্ধ হওয়ার মতো?‌ জানেন, অসংখ্য এলাকার মতো ওই মৌসুমি দ্বীপও চূড়ান্ত বিপর্যস্ত?‌ যে সুন্দর ছোট্ট রিসর্টের কথা বলেছিলেন, চূর্ণ। যঁারা স্থানীয় পর্যটন ঘিরে ছোটখাটো দোকান চালিয়ে পেট চালাচ্ছিলেন, তঁারা গৃহহীন, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে দিশাহীন। পরিচিত অধ্যাপক একটু দম নিয়ে বললেন, ‘‌কী বলতে চাইছেন, তাহলে কি আমাদের দুর্গতির কথা বলব না?‌’‌ বলবেন, মৌসুনির কথাও ভাববেন।
খবরের কাগজের অফিসে কী অভিজ্ঞতা?‌ বিদ্যুৎ চলে গেল, জেনারেটর দিয়ে কোনওরকমে চলা। ইন্টারনেট বন্ধ। টিভি চলছে না। মোবাইল ফোন কাজ করছে না। দুটো দিন অসহায় মনে হচ্ছিল। কর্মীদের বাড়ির অভিজ্ঞতা, বলা বাহুল্য, অন্য কিছু নয়। কিন্তু, ভরসা রেখেছি মুখ্যমন্ত্রী তথা প্রশাসনের ওপর, খবর রেখেছি প্রত্যন্ত, বিধ্বস্ত এলাকার অবর্ণনীয় দুর্গতির। কলকাতার ওপর দিয়ে বুলবুল বা আয়লা তেমন যায়নি। আমফান নতুন অভিজ্ঞতা দিয়ে গেল। কয়েক শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ নেই, গাছ ভেঙে পড়ে তার ছিন্নভিন্ন, জল পাওয়া যাচ্ছে না, মোবাইলে দূরে থাকা মা–‌বাবা, সন্তানের খবর নেওয়া যাচ্ছে না?‌ ক্ষোভ হবে না?‌ হবে। হয়। মমতা বলেছেন, ক্ষোভের কথা শোনা দরকার। আপত্তি শুধু ঘোর বিপর্যয়ে বিরোধীদের লোককে উসকে দেওয়ার ঘৃণ্য রাজনীতি নিয়ে। 
কলকাতায় ১৫ হাজার গাছ পড়ে গেল, সংলগ্ন এলাকায় আরও ৭ হাজার। যেন মহার্ঘ গাছের একটা প্রজন্মের মৃত্যু হল। অভূতপূর্ব বিপর্যয়ের মুখে দঁাড়িয়ে লড়াই করল সরকার, সব দপ্তরের অসংখ্য কর্মী, অতন্দ্র মুখ্যমন্ত্রী। এই দিকটাও কি দেখার কথা নয়?‌ পৃথিবীর উন্নততম দেশ আমেরিকা। সেখানে প্রায় প্রতি বছর প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ৭ থেকে ১৪ দিন সব বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিউ ইয়র্ক, ফ্লোরিডা, নিউ অর্লিন্স, টেক্সাসের মানুষ দেখেছেন, দেখেন। আমাদের, কলকাতাবাসীর অভিজ্ঞতা ছিল না। এতবড় ঝড় হয়েছে ১৭৩৭ সালে, ২৮৩ বছর আগে। শহরে ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ওডিশায় ‘‌ফণী’‌ গত বছর, এগারো দিন বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন ছিল রাজধানী ভুবনেশ্বর। গোটা রাজ্যে বিদ্যুৎ ফিরতে লেগেছিল দেড় মাস। আমাদের অভিজ্ঞতা ছিল না। ক্ষোভ হতে পারে। কিন্তু চূড়ান্ত নেতিবাচক প্রচার কেন?‌ সরকার সক্রিয়, অসংখ্য কর্মী দিনরাত এক করে লড়ছেন, প্রত্যন্ত এলাকাতেও লড়াইটা চলছে, কঠিনতর, তার প্রচার কই?‌ টিভি ডেকে বিক্ষিপ্ত পাড়াতুতো বিক্ষোভকেই কেন এত গুরুত্ব?‌ 
কিছু লোকের মুখে শোনা গেল, রাজ্য সরকার কেন শুরুতেই আর্মি ডাকল না? মহামহিম রাজ্যপাল বললেন, প্রথমেই ডাকা উচিত ছিল। তা, ধনকড়জি, আপনি তো রোজ টুইট করেন, পরামর্শটা দেননি কেন আগে?‌ সেনাকর্মীরা দক্ষ। নামার চারদিন পরেও গাছ সরিয়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক করা যায়নি। পুরসভা, রাজ্যের নানা দপ্তরের ২ লক্ষ ৩৫ হাজার কর্মী লড়লেন। কেউ ম্যাজিক জানে না, আর্মিও না।
রাজ্যে কত ক্ষতি?‌ এক লক্ষ কোটি টাকা হতে পারে। কেন্দ্র ১ হাজার কোটি টাকা ধরিয়ে দেওয়ার পরেই দিলীপ ঘোষ বললেন, মুখ্যমন্ত্রী হকারদের মতো দরাদরি করছেন। অপমান করলেন শুধু মুখ্যমন্ত্রী তথা প্রশাসনকে নয়, হকারদেরও। শুনুন মহাশয়, বিপর্যয় মোকাবিলা তহবিল আছে কেন্দ্রের হাতে। টাকা যায় সব রাজ্য থেকেই। আর্মি দক্ষ, কিন্তু সেই আর্মির খরচও আসে রাজ্য থেকে তোলা কর থেকে। দয়ার দাবি নয়, রাজ্যের অধিকার, মানুষের অধিকার। দিল্লি থেকে এক ভদ্রলোক এসেছিলেন। নাম নরেন্দ্র মোদি। বললেন, জোড়া সঙ্কটে দুর্দান্ত নেতৃত্ব দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। দিলীপবাবু কি মোদির বিরোধিতা করছেন?‌
কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে বেসরকারি সংস্থা সিইএসসি। বহু বছর ধরে আছে। পর্যাপ্ত লোক নামাতে, জোগাড় করতে এত দেরি কেন?‌ এত বড় দুর্যোগ, সমালোচনার বিষাক্ত তীর সরকারের দিকে, তখন সংস্থার কর্ণধার একবার টেলিভিশনে এসে বললেন না কেন, যথাসাধ্য করছি, ঠিক হয়ে যাবে?‌ মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং সিইএসসি দপ্তরে গেলেন, চাপ দিলেন, তবু ভরসার একটা বাক্যও শোনা গেল না কেন সিইএসসি–‌র বিখ্যাত কর্ণধারের মুখ থেকে?‌
প্রত্যন্ত বাংলায়, প্রধানত দুই চব্বিশ পরগনায় লক্ষ লক্ষ বাড়ি ভেঙেছে। ভেঙেছে বঁাধ। ভেসে গেছে সব কিছু। জলের নীচে ধান, সবজি, পানের বরজ। নোনা জল ঢুকে ভাসছে মৃত মাছ। এই বিপুল ধ্বংসলীলার মধ্যেও লড়ে যাচ্ছে সরকার, প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা লড়ছেন লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মী, সেই দিকটা প্রচারে আসবে না?‌ শুধু কলকাতার কথা? কলকাতার গর্ব অপরিসীম। আমরা সহৃদয়। আমরা মানবিক। আমরা সচেতন। আমফান দেখিয়ে গেল, সংশয় আছে। আমরা বুঝি শুধু কলকাতা, কলকাতা!‌ ‌      ‌‌‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top