অশোক দাশগুপ্ত—  হোক কলরব। অদ্ভুত উপাচার্য অভিজিৎ চক্রবর্তী, যিনি ছাত্রদের শত্রু মনে করতেন। ঘেরাও মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু ঘেরাও তুলতে যা করেছিলেন অভিজিৎবাবু, তা চূড়ান্ত নিন্দনীয়। পুলিস ডাকলেন। ডাকলে যেতেই হয়। কিছু বহিরাগতও ঢুকে পড়ে। প্রায়–অন্ধকারে কয়েকটা লাঠি। গুরুতর জখম হননি কোনও ছাত্র বা ছাত্রী, কিন্তু লাঠির কিছু ব্যবহার হয়েছিল। যাদবপুরে অচলাবস্থা। জট ছাড়ানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজির স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। আলাদা করে কথা বললেন উপাচার্যের সঙ্গেও। নির্দেশ নয়, পরামর্শ। অভিজিৎ চক্রবর্তী ইস্তফা দিলেন। যথার্থ নেত্রীর কাজ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই আন্দোলন যখন চলছে, রাজপথে মিছিল, ছাত্রছাত্রীদের একটা স্লোগান ছিল দুর্দান্ত:‌ ‘লাঠির মুখে গানের সুর/‌দেখিয়ে দিল যাদবপুর।’‌ তারপর, মিছিলেই শোনা গেল আরেকটি স্লোগান:‌ ‌‘‌ভিসি তুমি দুষ্টু লোক/‌ তোমার মাথায় উকুন হোক!‌’‌ কুরুচিকর এই স্লোগান শুভানুধ্যায়ীদেরও বিধ্বস্ত করে দিল।
ব্যাপারটা যে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, বোঝা গেল সুরঞ্জন দাস দায়িত্ব নেওয়ার পর। সুরঞ্জন দাস কৃতী অধ্যাপক, বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ। নীতিগতভাবে বামপন্থী। ব্যতিব্যস্ত হলেও বলে গেছেন ও যাচ্ছেন, আন্দোলন করার অধিকার আছে ছাত্রছাত্রীদের। গণতান্ত্রিক অধিকার। সেই সুরঞ্জন দাসকে নিয়েই ‘‌সচেতন’‌ ও ‘বামপন্থী’‌ ছাত্ররা কুৎসিত পোস্টার লাগাল। রীতিমতো ব্যক্তিগত আক্রমণ। জঘন্য। আবদার, রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তাঁকে সরব হতে হবে। রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু রাজ্য সরকারের অবিরাম বিরোধিতা করতে হবে। এই ছাত্রছাত্রীদের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, সুরঞ্জনবাবুর মতো উপাচার্য তাঁরা পাবেন?‌ জেএনইউ–এর ছাত্র–সংগঠকরাও ক্ষুব্ধ উপাচার্যের আচরণে। জগদেশ কুমার আরএসএস–এর খাস লোক। প্রগতিশীল ছাত্রছাত্রীদের কোণঠাসা রাখতে, ছাত্র আন্দোলন দমিয়ে রাখতে সক্রিয়। তবু, জেএনইউ–এর ছাত্রছাত্রীরা কুৎসিত পোস্টার দেয়নি, উপাচার্যকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেনি। কী সুর শোনাচ্ছে যাদবপুর?‌
জেএনইউ–এর কথাই যখন উঠল, প্রসঙ্গত আরও একটা কথা বলতে চাই। ওখানে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েই ভর্তি হতে হয়। কিন্তু তফাত হল, সব বিভাগেই এক ব্যবস্থা। বিজ্ঞান বিভাগেও প্রবেশিকা পরীক্ষা। যাদবপুরে বিজ্ঞানে নম্বরের ভিত্তিতে সরাসরি ভর্তি, কলা বিভাগে প্রবেশিকা কেন?‌ শুধু নম্বর পেলেই হবে না, যথার্থ উপযুক্ত বাছার জন্য প্রবেশিকা পরীক্ষা?‌ বিজ্ঞান বিভাগের ‘‌যথাযথ উপযুক্ত’‌ বেছে নেওয়ার নিয়ম নেই কেন?‌ যাদবপুরে বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীরা এত ভাল রেজাল্ট করছে কেন?‌ ক্যাম্পাস থেকেই ভাল কাজ পেয়ে যাচ্ছে কেন?‌ শুধু কলা বিভাগেই ‘‌অন্যভাবেও উপযুক্ত কিনা’‌ বুঝে নেওয়া দরকার?‌
যাদবপুরে কলা বিভাগে যাঁরা ‘‌যথাযথ উপযুক্ত’‌ বুঝতে নম্বর অগ্রাহ্য করে আলাদা পরীক্ষা নিতে চাইছেন, তাঁদের কাছে প্রশ্ন, ‘‌উপযুক্ত’‌ মানে কী?‌ ইংরেজিতে চটপটে হতে হবে?‌ ‘স্মার্ট’‌ হতে হবে?‌ যে–ছাত্রছাত্রীরা পরিশ্রম করে নম্বর পেয়েছে, প্রাথমিক মেধার নিশ্চিত পরিচয় দিয়েছে, তারা উপযুক্ত নয়?‌ ‘‌যথাযথ উপযুক্ত’‌ করে নেওয়ার দায়–দায়িত্ব নেই নামজাদা শিক্ষকদের?‌ শিক্ষকদের কাছে আরও একটা সবিনয় নিবেদন। যখন কিছু নৈরাজ্যবাদী ছাত্রছাত্রী কুৎসিত পোস্টার মারছে, জঘন্য স্লোগান দিচ্ছে, নিন্দনীয় ঘেরাওয়ের পথে যাচ্ছে, তাদের সমালোচনা করার, ভুল শুধরে দেওয়ার দায় নেই শিক্ষকদের?‌
ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে নই। ছাত্রছাত্রীদের অরাজনৈতিক করে দেওয়ার সমর্থক নই। সচেতনতা দেখলে, ইতিবাচক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর শুনলে, মন ভরে যায়। কিন্তু যে–মাতব্বররা বাড়াবাড়ি করে, অসভ্যতা করে, তাদের মধ্যে অনেকের খবর পরে পেয়ে স্তম্ভিত হতে হয়। বিদেশে একটা শাঁসালো চাকরি বাগানোর জন্য মরিয়া। দেশের কথা আর মনে থাকে না। প্রেসিডেন্সির আগের বড় আন্দোলনে অধ্যাপকের ঘরে অন্তর্বাস পরে নৃত্য করেছিল যে–‌বীরপুঙ্গব, চারদিন পরে সে বিদেশে চলে যায়। যাওয়ার আগে একটা স্যাম্পল রেখে গেল। গুডবাই সচেতনতা!‌
উচ্চমাধ্যমিকে পাওয়া নম্বরের ভিত্তিতে ভর্তি করা হবে না কেন?‌ নম্বরগুলো কি কেউ দয়া করে দিয়েছেন?‌ যে–শিক্ষকরা এদের পড়িয়েছেন, পরীক্ষায় ভাল ফল করতে সাহায্য করেছেন, তাঁদের ছোট করা হচ্ছে না?‌ নাকি, বিশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই ‘‌যথাযথ উপযুক্ত’‌, স্কুলের নিষ্ঠাবান শিক্ষকরা নন?‌ পর্ষদের পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপরই প্রকাশ্য অনাস্থা জানিয়ে কী বার্তা দিতে চাওয়া হচ্ছে?‌ জেলায়, কলকাতায়ও কত সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করে ভাল নম্বর পাচ্ছে, তাদের মেধাকে অস্বীকার করে হবে কেন?‌ যাদবপুর কি এলিট সেন্টার হয়ে থাকতেই বদ্ধপরিকর?‌
আর, ছাত্র আন্দোলনের পক্ষের লোক হয়েও বলতে চাইছি, অশালীনতাকে ধিক্কার। একটু–আধটু ছাত্র রাজনীতি করিনি তা নয়। সারা রাত অধ্যক্ষ–উপাচার্যদের ঘেরাও করে শাস্তি দিয়েছি, কুৎসিত পোস্টার ও স্লোগান দিয়েছি, কখনও নয়। কৃতজ্ঞতা স্বীকার যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীদের সৃষ্টিশীল স্লোগান–‌রচয়িতাদের কাছেই। দেখেশুনে বলতে ইচ্ছে করছে: উঠতে বসতে আজব সুর/শুনিয়ে যাচ্ছে যাদবপুর!

জনপ্রিয়

Back To Top