বাহার উদ্দিন- অসমে, সদ্যঘোষিত নাগরিক পঞ্জির খসড়া চেহারা দেখে আমরা আহত। অপমানিত। ক্রুদ্ধ। গণতন্ত্রের ইতিহাসে এটি এক জবরদস্ত কলঙ্ক। এই অপমান শুধু ওখানকার বাংলাভাষীকে নয়, সব জাতি, উপজাতি আর ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে সুপরিকল্পিত কৌশলে হেয় করার একটি ঘৃণ্য, ধারাবাহিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। পঞ্জি তৈরির বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষাত্মক সূচনাতেই বোঝা যাচ্ছিল— ভয়ংকর খেলা শুরু হবে। সাধারণ নাগরিকদের মাসের পর মাস জুড়ে হয়রানি, নাগরিকত্বের প্রতিষ্ঠিত দলিল নাকচ, ভোটার তালিকার নাম নিয়ে অকারণ সন্দেহ আর রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৬টি ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করে নিরীহ, দরিদ্র কয়েকশো বাঙালিকে আটকে রাখার ক্ষমতামত্ততা দেখে বোঝা যাচ্ছিল— বিশেষ বিশেষ ভাষিক, ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে হিটলারি কায়দায়, বিদেশি অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত করে গণসাফাই অভিযান শুরু হবে। নতুন এনআরসি–‌র প্রাথমিক তালিকা থেকে ১ কোটি ৩৯ লাখ নাগরিকের নাম বিলুপ্তি ওই আশঙ্কা আর গুঞ্জনকেই সম্ভবত বাস্তব করে তুলতে চাইছে এবং আচমকা যে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করল, তা গণতন্ত্রের ইতিহাসে বিরল, বিরলতম ঘটনা বলে চিহ্নিত হবে। পৃথিবীর আর কোথাও, কোনও দেশে এরকম অঘটন ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই। বৃহত্তর ও খণ্ডিত অসমে, অবশ্য জনতথ্যের এই ধরনের বিকৃতি এতটা ভয়াবহ না হলেও, নতুন নয়। দেশভাগের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল, অসমিয়া যাঁদের মাতৃভাষা, তাঁদের সংখ্যাগত চেহারা আচমকা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। ওই বৃদ্ধিকে ‘‌জনতাত্ত্বিক মিরাকল’‌ বলে বিস্ময় আর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন বিশেষজ্ঞরা। অস্তিত্বের সংকটে আক্রান্ত হলেন অন্যান্য জনগোষ্ঠী। দাঙ্গা আর সংঘাতে বাঙালি তখন দিশেহারা। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার ভয়তাড়িত গ্রামীণ কৃষিজীবী বঙ্গভাষীরা চাপে পড়ে নিজেদের অসমিয়া বলে শনাক্ত করতে ব্যস্ত। প্রথম আদমশুমারেই তাঁরা আত্মপরিচয় বিসর্জন দিয়ে স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতে চাইলেন। কিন্তু তাতেও নিস্তার মিলল না। বহিরাগত, মিঞা, পাকিস্তানি ইত্যাদি বিদ্রুপ তাঁদের ধাওয়া করছে, তাড়া করছে সন্দেহ। ষড়যন্ত্রে অভ্যস্ত প্রশাসনও বঙ্গভাষীদের অভ্যন্তরে ফাটল তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে উঠল, পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্তুদের স্রোত বইছে, দাঙ্গা আর অন্যায়ের শিকার হয়ে হাজার হাজার মানুষ অসমে, ত্রিপুরায় এসে আশ্রয় নিচ্ছেন। তাঁরা শরণার্থী হলেও, স্বার্থান্বেষী রাজনীতি তাঁদের ভাষিক আগ্রাসী বলে চিহ্নিত করছে। অতএব এঁদের সংখ্যা কমাও, তাড়াও গায়ের জোরে। শুরু হল ষাটের ভয়ংকর ‘‌বঙ্গাল খেদা’‌। নেতৃত্ব দিলেন উজান অসমের গোলাপ বরবরা (‌পরে জনতা আমলের মুখ্যমন্ত্রী)‌। জাতিবিদ্বেষের ওই পর্বে কৃষিজীবী, গ্রামীণ বাঙালি— দাঙ্গাবাজদের সঙ্গ দিল, কেননা তাঁরা নব্য অসমিয়া। তাঁদের বোঝানো হল, উদ্বাস্তু বাঙালির আধিপত্য বাঙালি মুসলিমদের সংকট ডেকে আনবে। বঙ্গাল খেদার আড়ালে কংগ্রেসের ঘরোয়া কোন্দলের উসকানি ছিল। উসকানিতে সায় দিল প্ররোচিত জাতিবিদ্বেষ। এরই ভয়ংকর পরিণাম অভূতপূর্ব জাতিদাঙ্গা। বিমলাপ্রসাদ চালিহা তখন মুখ্যমন্ত্রী। পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেন না। নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে বিধানসভায় অগণতান্ত্রিক ভাষা বিল উত্থাপন করলেন। বিলের বিরুদ্ধে, পাহাড়ি এলাকায়, বরাকে ৬১টির ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল। রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষে,  ১৯ মে শিলচরে শহিদ হলেন ১১ বঙ্গসন্তান।
ভাষা আন্দোলনে সাম্প্রদায়িক বিচ্যুতি তৈরির পেছনে অসম কংগ্রেসের ঘরোয়া দ্বন্দ্বের হাত ছিল, এ তথ্য আজ প্রতিষ্ঠিত। ভাষা আন্দোলনকে সমর্থন করেননি ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার কৃষিজীবী বাংলাভাষী মুসলিম। অস্তিত্বের স্বার্থে তাঁরা অসমিয়া পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকতে চেয়েছেন। তবু পাকিস্তানি পরিচয়ের সন্দেহের ভূত তাঁদের রেহাই দেয়নি। ৬৪ সালের পর, রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে হাজার হাজার বঙ্গভাষীকে ‌পূর্ব পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিয়ে অবশিষ্ট অংশকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, অসমে বসবাস করতে হলে অসমিয়া পরিচয় নিয়ে থাকতে হবে। নইলে রেহাই নেই। বাড়িতে বাঙালি আর বাইরে অসমিয়া— এই দ্বৈত আত্মপরিচয় তাঁরা মেনে নিলেন। রাজনীতিও তাঁদের ফুটবল ভাবতে থাকল। ভোটের মুহূর্তে আত্মীয়, ভোট পেরোলে অনাত্মীয়। ৭১–‌এ বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী উত্থানে তৈরি হল আরেক সংকট। পাকিস্তানি বর্বরতার শিকার হয়ে অসংখ্য হিন্দু পরিবার অসম–‌ত্রিপুরায় এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হল। অসমিয়া জাতিসত্তা নতুন বিপদ আঁচ করল। ৭২ সালে, গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরিণামদর্শী ভাষাসার্কুলার নতুন প্ররোচনা ছড়িয়ে দেয়। আবার শুরু হল বঙ্গাল খেদা, দাঙ্গা আর অগ্নিসংযোগ। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালি মুসলিম এবারও উগ্র জাতীয়তাবাদী অসমিয়াদের সঙ্গী। গ্রামাঞ্চলে দাপট তাঁদের অব্যাহত। রাজনৈতিক আর প্রশাসনিক ষড়যন্ত্রে বাঙালি আবার দ্বিখণ্ডিত। বরাকের পরিস্থিতি অবশ্য আলাদা, ভাষিক ঐক্যে ওখানে বিভাজন নেই। কিন্তু উজান ও নিম্ন অসমের অনৈক্য আর পারস্পরিক সন্দেহ ক্রমাগত বাড়ছে এবং বাড়তে বাড়তে প্রকট হয়ে উঠল ৬৯ সালে, মঙ্গলদই লোকসভার উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে। হঠাৎ গুজব ছড়িয়ে পড়ল, ভোটার তালিকায় লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশির নাম ঢুকে পড়েছে। তালিকা সংশোধনের দাবিতে লাগাতার আন্দোলন শুরু করল সারা অসম ছাত্র সংস্থা। নেতৃত্বে প্রফুল্ল মহন্ত আর ভৃগু ফুকন। শুরু বহিরাগত খেদাও আন্দোলন। রহস্যজনকভাবে ‘‌বহিরাগত’‌ বিরোধ, বিদেশি বিরোধের চেহারা নেয়। বিদেশি মানে বাংলাদেশি আর নেপালি। দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ, হত্যা ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। ঠিক এরকম মুহূর্তে বিদেশি খেদা আন্দোলনে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার অনুপ্রবেশ ঘটে। মহন্ত আর ভৃগুর নেতৃত্ব অসমিয়া জনগোষ্ঠীর আবহমান সাম্প্রদায়িকতা বিরোধকে প্রশ্রয় দেয়নি, কিন্তু গুজব আর রটনাকে আয়ত্তে আনতে পারেনি। তার চোরাস্রোত বইতে থাকে। দূরে বসে, আড়াল থেকে আর্যবর্তের সাম্প্রদায়িকতা মিথ আর মিথ্যাকে প্রায় গ্রহণযোগ্য সত্য বানিয়ে দিল যে, নিম্ন অসমের গ্রামাঞ্চলে যুগ যুগ ধরে বসবাসকারী বাঙালি মুসলিম মানেই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দুরা আমাদের শরণার্থী। অসমিয়া মধ্যশ্রেণী, গ্রামের সাধারণ মানুষও গোড়াতে এই বিভাজন মানতে চাননি। তাঁরা ভাবলেন, অসমে বাঙালির আগ্রাসন চলছে, একে রুখতে হবে। এই মানসিকতার ওপর ভর করে, বিদেশি খেদা আন্দোলনের সাফল্য ছুঁয়ে ক্ষমতায় এলেন প্রফুল্ল–‌ভৃগুরা, অসম চুক্তির পর, নির্বাচিত হয়ে। ক্ষমতায় এসে বুঝতে পারলেন, মিথ আর গুজবের ভিত নেই। ট্রাইবুনাল বসানো হল, তবু বিদেশিদের সন্ধান মিলছে না। কিন্তু এর পরও স্থাপিত গুজবের হাত থেকে নিস্তার নেই। বাতাসের আগে আগে সে চলে। চলছে। মিথ্যার বিস্তার আর সন্দেহের ভূত দৈত্য হয়ে উঠছে। ভোটে সে সহযোগী। বিভাজন তৈরিতে নিয়মিত সক্রিয়। গত বিধানসভা ভোটে বিজেপি এই দৈত্যকে ইস্যু করল। ইস্যু করল বিকাশের অঙ্গীকারকে। বিকাশ এখন ছন্নছাড়া, মতি ও গতি ভ্রষ্ট। গণঅসন্তোষ স্পষ্ট। অতএব, প্রতিশ্রুত জাতীয় নাগরিক পঞ্জির পুনর্নির্মাণে বিদেশি নাগরিক ও অনুপ্রবেশের গুজবকে বাস্তব ভিত্তি দিতেই হবে, আর এ জন্যই, প্রাথমিক খসড়ায় ধর্মীয়, ভাষিক জাতিবিদ্বেষকে প্রশ্রয় দিয়ে অসমের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের নাগরিকত্বকে নাকচ করে জানাতে চাইছে— অসম বিপন্ন, অসমিয়ারা কোণঠাসা। জাতিকেন্দ্রিক সাফাই অভিযানই সংকটমুক্তির একমাত্র রাস্তা। কিন্তু কৌশলটি কষ্টকল্পিত। সামনে রাশি রাশি কাঁটা। অসমিয়া জাতিগঠনের প্রক্রিয়া এই অভিসন্ধি মানবে না। মানতে পারে না। বিভাজনের ফাঁদে পা দিয়ে বিজেপিকে জিতিয়ে দিয়েছে বটে, কিন্তু যদি দেখে ক্রোধে, কঠোর প্রতিক্রিয়ায়— প্রায় এক কোটি গ্রামীণ বাঙালি কৃষক আত্মপরিচয়ে ফিরে যাচ্ছে— তখন অসমিয়ারা ভাষিক সংখ্যালঘু হয়ে পড়বেন, এবং অন্য এক কঠিন সংকট দেখা দেবে। এরকম পরিস্থিতিতে রাজনীতির ভুল, সংকীর্ণ, একপেশে ছককে কি তাঁরা বরদাস্ত করবেন?‌ যে উদার লোকায়ত ভাবমূর্তিকে বংশানুক্রমে পূজার আসনে বসিয়ে সমৃদ্ধ, বহুত্ববাদী সংস্কৃতি তৈরি করেছেন, তার ওপর সরাসরি আঘাত তাঁরা মেনে নেবেন?‌ এ কারণেই লেখার শুরুতে আমরা বলেছি, নাগরিক পঞ্জির এই খসড়া অসমের বহুমুখী জাতিগোষ্ঠীকে হেয় করার জঘন্য চক্রান্ত। বৃহত্তর অসমিয়া জাতিগঠনের প্রবাহকে রুদ্ধ করে দেওয়ার ভয়ংকর প্রচেষ্টা। ক্রোধ দিয়ে, সমবেত ঐক্য দিয়ে একে রুখতে হবে। সর্বনাশের রাজনীতি অসমের মানচিত্রকে টুকরো টুকরো করে দেবে। সুসংবাদ, অসমিয়া বিবেক, অসমিয়া প্রজ্ঞা, অসমের বহুজাতির শুভবুদ্ধি জাতিবিদ্বেষী, সাম্প্রদায়িক অভিসন্ধিকে গুঁড়িয়ে দিতে নেমে আসছে রাস্তায়। দৃঢ়, উত্থিত তাঁদের উচ্চারণ আর প্রতিজ্ঞা।‌

জনপ্রিয়

Back To Top