প্রদীপ কুমার দত্ত: মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার গত ১০ আগস্ট সংসদে এনেছে ‘ফিনান্সিয়াল রেজলিউশন অ্যান্ড ডিপোজিট ইন্সিওরেন্স বিল, ২০১৭’ (এফআরডিআই বিল)। নোট বাতিল, জিএসটি চালু করার সময় যেমন সরকার বলেছিল সাধারণ মানুষের স্বার্থেই এগুলি করা হয়েছে, তেমনই এক্ষেত্রেও যথারীতি তাদের আসল উদ্দেশ্য গোপন করে সরকার বলেছে সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষা করার জন্যই এই বিল আনা হয়েছে। বাস্তবে আমানতকারীর স্বার্থরক্ষার নামে এই বিল ব্যাঙ্কে সঞ্চিত সাধারণ মানুষের আমানতকে চরম অরক্ষিত অবস্থায় ঠেলে দেবে এবং কোনও ব্যাঙ্ক আর্থিক দুরবস্থায় পড়লে তার গ্রাহকদের আমানত রক্ষা করার দায়িত্ব থেকে সরকারকে অব্যাহতি দেবে। এই বিল আইনে পরিণত হলে আর্থিকভাবে দুর্বল বা দেউলিয়া হয়ে পড়া ব্যাঙ্কগুলি সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ কেড়ে নিয়ে অর্থ সংগ্রহ করার ও সংকট থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। 
এই বিলে ব্যাঙ্কগুলির আর্থিক সংকট দূর করতে ‘ফিনান্সিয়াল রেজলিউশন কর্পোরেশন’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এর অধিকাংশ সদস্য হবেন কেন্দ্রীয় সরকারের মনোনীত। তাঁরাই ব্যাঙ্কের আর্থিক পরিস্থিতি বিচার–বিবেচনা করে বলবেন ব্যাঙ্ক বিপদের সম্মুখীন কি না। কর্পোরেট পুঁজিপতিদের স্বার্থে আনা এই বিলে বলা হয়েছে, কোনও ব্যাঙ্কের দেউলিয়া হওয়ার মতো পরিস্থিতি হলে ব্যাঙ্ককে বাঁচাতে ব্যাঙ্কে আমানতকারীদের অনুমতির তোয়াক্কা না করেই বা তাঁদের না জানিয়েই গ্রাহকদের সঞ্চিত টাকা সুদসমেত ফিরিয়ে দেওয়ার যে চুক্তি ব্যাঙ্ক ও গ্রাহকদের মধ্যে থাকে তা একতরফাভাবে বাতিল করে দেওয়ার বা অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়ার, চুক্তির শর্ত বদলে দিয়ে আমানতের মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়ার, বা সুদের হার কমিয়ে দেওয়ার, ব্যাঙ্কে সঞ্চিত আমানত তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার, সঞ্চিত আমানতকে স্টক এক্সচেঞ্জে নথিভুক্ত ব্যাঙ্কের শেয়ারে বা ক্যাপিটাল মার্কেটে বিমায় পরিণত করার ক্ষমতা এই কর্পোরেশনকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে গ্রাহক তাঁর জমা টাকার কিছুই ফেরত পাবেন না। আবার ফিনান্সিয়াল রেজলিউশন কর্পোরেশন আমানতকারীদের জমা টাকা ফেরত না দিয়ে ব্যাঙ্কের শেয়ার, ডিবেঞ্চার, বন্ড প্রভৃতিতে তা লগ্নি করতে পারে। কিন্তু ব্যাঙ্ক যদি রুগ্ন হয়ে পড়ে, তাহলে সেই ব্যাঙ্কের শেয়ার, ডিবেঞ্চার, বন্ডের কানাকড়িও মূল্য থাকবে না। অর্থাৎ বাস্তবে আমানতকারীদের জমানো টাকা মার যাবে। 
ব্যাঙ্কগুলি সংকটগ্রস্ত হচ্ছে কেন? কেন তারা রুগ্ন হয়ে পড়ছে? এর উত্তর হল ব্যাঙ্কের অনাদায়ী ঋণ, যাকে বলা হয় নন– পারফর্মিং আসেট (এনপিএ) বা অনুৎপাদক সম্পদ। দেশের বৃহৎ পুঁজিপতি ও কর্পোরেট সংস্থাগুলি ব্যাঙ্কগুলি থেকে যে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে শোধ করেনি এবং যা শোধ করার  কোনও ইচ্ছাই তাদের নেই, সেগুলিকেই বলা হয় অনুৎপাদক সম্পদ। শুধুমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতেই এর পরিমাণ ২০১৫ সালের মার্চে যা ছিল তার থেকে ২.৭৫ লক্ষ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০১৭ সালের জুন মাসে দাঁড়িয়েছে ৭.৩৩ লক্ষ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলি ধরে মোট অনুৎপাদক সম্পদের  পরিমাণ ১০ লক্ষ কোটি টাকার মতো। মাত্র ১২টি কোম্পানিই ২.৫ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ শোধ করেনি। এর ফলে ব্যাঙ্কগুলির মূলধনে টান পড়ছে, তারা নতুন ঋণ দিতে পারছে না। এমন–কি কোনও কোনও ব্যাঙ্ক পুঁজির অভাবে রুগ্ন হয়ে পড়ছে। তাদের বাঁচাতে সরকার ব্যাঙ্কগুলিকে জনগণের করের টাকা তুলে দিচ্ছে। যেমন সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ব্যাঙ্কগুলির ঘাটতি মেটানোর জন্য ২ লক্ষ ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। অতীতেও এভাবে বিভিন্ন সময় হাজার হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর বাজেটে এই খাতে বিরাট অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু ঋণখেলাপি শিল্পপতিদের বিরুদ্ধে সরকার কোনও ব্যবস্থা নেয় না। অথচ সাধারণ মানুষ, যদি ছোট ছোট ব্যবসা বা অন্য কোনও কারণে ঋণ নিয়ে শোধ করতে না পারে তাহলে তাদের ঋণ মকুব করা তো দূরের কথা, পুলিস তাদের গ্রেপ্তার করে। 
ব্যাঙ্কগুলিতে অনুৎপাদক সম্পদ ক্রমাগত বাড়ছে কেন? সত্যিই কি ঋণখেলাপি শিল্পপতিরা কলকারখানার উৎপাদনে বা ব্যবসায় এমন মার খেয়েছেন যে তাঁরা ঋণ শোধ করতে অপারগ, দেউলিয়া হয়ে গেছেন? মোটেই তা নয়। তাঁরা বহাল তবিয়তেই আছেন এবং অন্য ব্যবসাগুলির মুনাফায় তাঁরা ফুলে-ফেঁপে ঢোল হয়ে যাচ্ছেন। এই সব কোম্পানির মালিকরা পরিকল্পিতভাবে কোম্পানি থেকে মোটা মুনাফাসমেত তাঁদের নিজস্ব বিনিয়োগ আগেই সরিয়ে ফেলেছেন। এবং এইভাবে টাকা সরিয়ে নেওয়ার ফলেই তাঁদের কোম্পানিগুলি দুর্বল হয়েছে, আর তাঁদের ব্যাঙ্ক থেকে নেওয়া ঋণ অনুৎপাদক সম্পদে পরিণত হয়েছে। নতুন বিলে এই দুর্নীতিগ্রস্ত মালিকদের ঋণের টাকা ফেরত দিতে বাধ্য করার জন্য কোনও ব্যবস্থা করার কথা বা ভবিষ্যতে যাতে আর কোনও শিল্পপতি জনগণের টাকা এইভাবে আত্মসাৎ করতে না পারে তার জন্য কোনও ব্যবস্থাই রাখা হয়নি। এ থেকেই বোঝা যায় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অনাদায়ী ঋণ উদ্ধার করা এবং ব্যাঙ্কের অনুৎপাদক সম্পদ কমানো সরকারের উদ্দেশ্য নয়। এই বিলের মাধ্যমে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ঋণখেলাপি বৃহৎ পুঁজিপতিদের জালিয়াতির দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে, তাদের কষ্টার্জিত অর্থ বৃহৎ পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দিতে চাইছে। টেলিভিশনের আলোচনায় বিজেপি নেতারা বলছেন কংগ্রেস আমলেও বড় বড় শিল্পপতিরা ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত দেননি। সে কথা অবশ্যই ঠিক। কিন্তু বিজেপিও ধোয়া তুলসীপাতা নয়, কারণ তাদের আমলে এই পরিমাণ আরও বেড়েছে এবং ক্রমাগত বাড়ছে। ঋণখেলাপি শিল্পপতিদের বিরুদ্ধে কংগ্রেস পরিচালিত সরকার যেমন কোনও ব্যবস্থা নেয়নি তেমনই বিজেপি সরকারও নিচ্ছে না। বরং সরকারি মদতে তাঁদের কেউ কেউ বিদেশে পালিয়ে গেছেন। যেমন বিজেপি সাংসদ বিজয় মালিয়া ৯ হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপ করে বিদেশে পালিয়ে গেছেন। বিজেপি পরিচালিত সরকার সাধারণ মানুষের স্বার্থ বলি দিয়ে মুষ্টিমেয় কিছু কর্পোরেট মালিক ও বৃহৎ পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষায় এই বিল এনেছে। দেশের বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ বলেছেন, এই বিল আইনে পরিণত হলে গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের আর্থিক সুরক্ষা বলে কিছু থাকবে না। 
এখন কোনও কারণে ব্যাঙ্ক সংকটগ্রস্ত হয়ে পড়লে সেই ব্যাঙ্কের আমানতকারীদের অ্যাকাউন্টের এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে ফেরত পাওয়ার সুযোগ আছে কারণ গ্রাহক–পিছু এক লক্ষ টাকা বিমা করা থাকে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে এর বেশি টাকার জন্যও কেন্দ্রীয় সরকারের অলিখিত গ্যারান্টি থাকে। আলোচ্য বিলে বলা হয়নি বিমার পরিমাণ এক লক্ষ টাকাই থাকবে, না আরও কমবে। 
এতদিন পর্যন্ত ব্যাঙ্ক অর্থনৈতিকভাবে বিপন্ন হয়ে পড়লে সরকার টাকার জোগান দিত, যদিও তা জনগণের কাছ থেকে আদায় করা ট্যাক্সের টাকা। এখন থেকে সরকার আর তা করবে না। তার পরিবর্তে ব্যাঙ্কের আমানতকারীদের টাকা দিয়েই ব্যাঙ্কের সংকট কাটানোর ব্যবস্থা আলোচ্য বিলে করা হয়েছে। এসব থেকে এটা পরিষ্কার যে, সাধারণ মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে  ঋণখেলাপি মুষ্টিমেয় কিছু পুঁজিপতি ও শিল্পপতিদের স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্যেই এই বিল আনা হয়েছে। 
(লেখক অবসরপ্রাপ্ত প্রধান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, 
প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা)

জনপ্রিয়

Back To Top