বাহারউদ্দিন‌: ইদের দিনও রক্তক্ষয়ের কবল থেকে কাশ্মীরের নিষ্কৃতি মিলল না। উপদ্রুত পুলওয়ামায় জঙ্গিদের হামলায় প্রাণ হারালেন ১ মহিলা, গুরুতর আহত এক যুবক। দুজনেই নিরীহ। স্থানীয় বাসিন্দা। বুধবার সকলে সবাই যখন উৎসবমুখর, তখনই একটি বাড়িতে ঢুকে পড়ে জঙ্গিরা। অতর্কিত গুলি ছুঁড়তে থাকে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় বাড়ির গৃহকর্ত্রী নাগিনার। জখম হন জালালউদ্দিন বাফিন্দা। হঠাৎ হামলা চালিয়ে জঙ্গিরা কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পগারপার।
গত বছরও ইদের দিন থেকে কাশ্মীর অশান্ত হয়ে ওঠে। নিরাপত্তারক্ষীদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চলে। তারপর জঙ্গি–‌রক্ষী সঙ্ঘর্ষ উপত্যকার অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। ১৯১৮–‌র জুলাই মাসে হিজব–‌এ মুজাহিদিন–‌এর উইং কমান্ডার বোরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর, দক্ষিণ কাশ্মীরের পুলওয়ামা, পরে উপত্যকার নানা এলাকায় অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ, আধাসেনা ও জঙ্গিদের সঙ্ঘর্ষে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান। নিরাপত্তারক্ষীদের ছররা গুলিতে অন্ধ হয়ে যান অনেকেই। মাস কয়েক জুড়ে লাগাতার দিনে কার্ফু আর রাতে জঙ্গিদের হরতাল চলতে থাকে। জনজীবন স্তব্ধ হয়ে যায়।
১৯–‌এর লোকসভা ভোটের আগেও স্পর্শকাতরতার হাত থেকে রেহাই পায়নি পুলওয়ামা। আত্মঘাতী হামলায় উড়ে যায় নিরাপত্তারক্ষীদের সারি সারি সাঁজোয়া গাড়ি, মৃত্যু হয় বহু সংখ্যক জওয়ানের।
পুরওয়ামা হিজব–‌এ–‌মুজাহিদিনের শক্তিশালী ঘাঁটি। ওখানে সমাজের কোনও কোনও স্তরে জঙ্গিদের সমর্থনের ভিত ক্রমশ বাড়ছে। উপত্যকা ভোটের পর নতুন রকমের অশান্তির দিকে মোড় ঘোরাচ্ছে। ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার নিয়ে বিতর্ক যত বাড়বে, ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, উপত্যকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ততই বিচ্ছিন্নতাবাদের ঝুঁকতে থাকবে। নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শক্ত ধাতের মানুষ। কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে তিনি বদ্ধপরিকর। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের শীর্ষারোহী অজিত ডোভালও উচ্চ পর্যায়ের অফিসারদের সঙ্গে কথা বলেছেন। উদ্ভুত পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেবেন, কাশ্মীরকে প্রদত্ত বিশেষ ধারা প্রত্যাহার করে?‌ না আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নয়া কৌশলে— তার দিকে দেশ তাকিয়ে আছে।
জঙ্গি সন্ত্রাস এবং পাল্টা সন্ত্রাস থেকে মুক্তি চায় কাশ্মীর। সামরিক হস্তক্ষেপ চাপিয়ে সমস্যার সমাধান দূরঅস্ত। বিভিন্ন পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে। যাঁরা কাশ্মীরের বাসিন্দা, যাঁরা সন্ত্রাসের সরাসরি শিকার, তাঁদের নেতৃত্বই প্রথমপক্ষ। যেহেতু কাশ্মীর ভারতের স্বীকৃত অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, সেখানে নতুন দিল্লি আর কাশ্মীরের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতাদের বৈঠককে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কাশ্মীরিদের আলোচনার বাইরে রেখে তৃতীয়পক্ষ পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা মানেই সমস্যার শক্তিবৃদ্ধি।
নিষ্কর্মা ৩৭০ ধারা হঠাৎ অবসানের জল্পনা, রাষ্ট্রপতি শাসন, জঙ্গিদের বেপোরোয়া সন্ত্রাস রুখতে রাষ্ট্রীয় বাড়াবাড়ি, গুটিকয়েক সৌভাগ্যবান কাশ্মীরি রাজনীতিকের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, জামাতের পাকপ্রীতি এবং জম্মু অঞ্চলে গেরুয়া শিবিরের লাগামহীন প্ররোচনা কাশ্মীরে কখনও শান্তি ফেরাবে না। সাম্প্রতিক অথবা অতীতের অভিজ্ঞতা বড় তিক্ত।
’‌৪৭ সাল থেকে কখনও যুদ্ধে, কখনও সশস্ত্র সংগ্রামে, কখনও নির্বাচিত সরকার ভেঙে দিয়ে দিল্লির মনোনীত পুতুল সরকারের দৃষ্টিহীন, বিবেচনাহীন পত্তনকে ঘিরে উপত্যকায় নিরন্তর রক্ত ঝরছে। শূন্য থেকে সন্ত্রাসের, সশস্ত্র জঙ্গিদের উত্থান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে ক্রমাগত জটিল করে তুলছে। স্বার্থপর, ক্ষমতালোভীদের রাজনীতি কেবল আত্মকেন্দ্রিকতা আর দুর্নীতিকে বড়ো করছে। উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থের অপচয় আর আত্মসাৎ যে কী ভয়ঙ্কর সংক্রামক অসুখ, তা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। ’‌৫২ সাল থেকে তার ক্রমাগত বৃদ্ধির হার এখনও গোপন কাহিনি ছিল না। আজও নয়। দিল্লির কোনও সরকারই এ বিষয়ে আঙুল তোলেনি। কাশ্মীর আমাদের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো আর ধর্মনিরপেক্ষতার অন্যতম দৃষ্টান্ত এবং ওখানকার দু–‌একটি দল তার অতন্দ্র প্রহরী— এ সব তোয়াজি উচ্চারণের মাধ্যমে দেশের কেন্দ্রীয় শাসক দুর্নীতির প্রবাহ থেকে, অনাচার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে সাচ্চা কাশ্মীরি ও প্রশ্নমুখর যুবশক্তিকে প্রকারন্তরে বুঝিয়ে দেয়, তারা চায় নব্য নবাব ও আমলাবাহিনীর অন্ধ আনুগত্য। ‘‌চায় শুধু কাশ্মীরের জমিন। সঙ্গত বা অসঙ্গত যাই হোক না কেন, এটাই কাশ্মীরিদের আর এক বদ্ধমূল ধারণা। এটাও কাশ্মীর সমস্যা এবং সন্ত্রাসের বহিরাগত উসকানি, নৈরাজ্য আর জঙ্গিপনার মিশ্রিত উৎস।
বাইরের আবরণ দিয়ে, মিটমিট হাসি দেখে ভেতরকে চেনা যায় না। ছলনা আর বঞ্চনার রহস্যময়তা মধুযাপনের প্রথম নিশিকেও সন্দেহপ্রহণ করে তোলে। বাড়িয়ে দেয় অবিশ্বাস। স্বাধীনতার ঊষালগ্নেই সন্দেহ আর বিভাজনের যে বিষধর ডাল লেকে, নাগিন লেকে, হরি পর্বতে ঢুকে পড়ে, আজ গোটা উপত্যকায় সে তার ফণা ছড়িয়ে দিয়েছে। সাপটির নিধন কীভাবে সম্ভব?‌ সংবিধানের স্বীকৃত অধিকার প্রত্যাহার করে?‌ না প্রত্যাহারের বদলে ভালবাসার প্রত্যাবর্তনকে, ঘোষিত প্রতিশ্রুতির পুনর্বিন্যাসকে সাজিয়ে তুলে ফেরাতে হবে, বাড়াতে হবে আস্থা। প্রত্যাখ্যান প্রেম আর প্রেমের বহুমুখী বিশ্বাসকে খাটো করে দেয়। এই পথেই কাশ্মীরিয়তের মহান বিস্তার ইদানীং বিভ্রান্ত। অবরুদ্ধ। হতাশায়, ক্ষোভে তার সহনশীলতা প্রায় অবলুপ্ত। লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল পণ্ডিত–‌পরিবার দিল্লিতে ঘেটো কলোনির বাসিন্দা। তাঁদের কথা কে বলবে, রাষ্ট্র?‌ সাম্প্রদায়িকতার প্রবক্তরা?‌ ‌সশস্ত্র জঙ্গিরা?‌ আরামপ্রিয় ভুল লোকসেবকরা?‌ না। কখনও না। বলবে, বলতে পারে গণতান্ত্রিকতার বর্ধিত অঙ্গীকার, যার সঙ্গে সুগঠিত জনমত পুনর্মিলনের আনন্দের মতোই যুক্ত। অবিভাজ্য।

জনপ্রিয়

Back To Top