‌সৌমেন জানা: পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে, এখন মুঠোফোনে বন্দি! সত্যিই তো। আমাদের দৈনন্দিন জীবন এখন সোশ্যাল মিডিয়াময়। সুখ–দুঃখ, হাসি–কান্না, সবকিছুই এখন সোশ্যাল মিডিয়াকে ঘিরে। প্রতিদিন ঘুমোতে যাওয়া থেকে ঘুম থেকে ওঠা, সবসময়ই ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ঘাঁটাঘাঁটি করে চলেছি। কে কোথায় কী কমেন্ট করেছে, কী খেল, কোথায় গেল এসব নিয়েই আমরা মগ্ন। আর তার জন্য বিভিন্ন পেজ বা গ্রুপের সদস্য হয়েছি। মুহূর্তের মধ্যে দূর-দুনিয়ার অনেক তথ্য জানতে পারি খুব সহজে। নিজের চিন্তা-ভাবনাও শেয়ার করি অসংখ্য মানুষের সঙ্গে। আর এতেই মশগুল আট থেকে আশি। সোশ্যাল মিডিয়া এখন অবসর সময় কাটানোর সবচেয়ে বড় মাধ্যম। এইভাবেই কখন যেন সোশ্যাল মিডিয়ার কিছু মেসেজে চোখ আটকে যায়। বুক মুচড়ে ওঠে। রক্ত গরম হয়ে যায়। মাথা ঝিমঝিম করে। সুবিচারের আশায় আমরা মেসেজটাকে আরও ছড়িয়ে দিই। কিন্তু একবারও মাথায় আসে না যে মেসেজটা ঠিক না ভুল? আমাদের ক্ষণিকের এই উদ্বেগ ভবিষ্যতে লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলে। হয়তো প্রাণহানিও ঘটে। নিজেদের হাত অজান্তেই রক্তাক্ত করে ফেলি।
সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুয়ো খবর রটিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত ও অহেতুক হয়রানি করার ঘটনা অহরহ ঘটছে। এমন কিছু রটছে, যা খবর নয়, গুজব। নিতান্তই রটনা। সুকৌশলে ছদ্ম প্ররোচনার মাধ্যমে যা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আর তাতেই সমাজ ও সভ্যতার সঙ্কট সৃষ্টি হয়। বর্তমানে যে কোনও অশান্তি–হাঙ্গামার ভয়াবহতা সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে বহু গুণে বেড়ে গিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, আগে যখন সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না, তখনও তো গুজব রটত। তা হলে? ঠিক কথা। গুজব বরাবরই রটত। কিন্তু আগে গুজব ছড়াত মানুষের মুখে মুখে বা লিফলেট, প্যামফ্লেটের মাধ্যমে। আগে যে গুজবটা ছড়াতে দশ দিন সময় লাগত, এখন সেটা নিমেষে ছড়িয়ে পড়ছে। কারণ, মাধ্যম বদলেছে।
মাঝেমধ্যেই কোনও বিশিষ্ট মানুষ মৃত বলে মেসেজ ছড়িয়ে পড়ে। হৃদয়স্পর্শী সেই মেসেজ রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যায়। সেই মৃত মানুষটিকে সবার সামনে এসে ঘোষণা করতে হয় যে তিনি জীবিত। এরকম ভুয়ো খবরও আমাদের সবার চোখে পড়ে। একশ্রেণির মানুষ উস্‌কানিমূলক মন্তব্য করে অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে কোন্দল সৃষ্টি করেন। সোশ্যাল সাইটগুলো যেন এখন দুধারি তলোয়ারের মতো। উপকারিতার মধুগন্ধের সঙ্গে অপকারিতার বিষবাষ্পও মিশে আছে। খুব সহজেই কিছু মানুষ গুজব ছড়িয়ে শিকার করছেন। চরিতার্থ করছেন নিজেদের স্বার্থ। সেটা রাজনৈতিক চক্রান্ত বা দাঙ্গা লাগানোর ফিকিরও হতে পারে। আশ্চর্যের বিষয় হল, এই চক্রান্তের টোপ গিলছেন বিশাল সংখ্যক মানুষ। হ্যাঁ, তাঁদের মধ্যে তথাকথিত শিক্ষিতরাও রয়েছেন!
‘ইন্টারনেটের বিপদ’ সংক্রান্ত মাইক্রোসফটের এক রিপোর্ট সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছিল। রিপোর্ট অনুযায়ী, তিনটি বিষয়ে পৃথিবীতে সবার থেকে এগিয়ে ভারত। এগুলো হল— সাধারণ মানুষের ওপর নজরদারি, ভুয়ো খবর এবং গুজব ছড়ানো। পাশাপাশি নিজের বন্ধু এবং পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেই অনেক বেশি ক্ষতির মুখোমুখি হন ভারতীয়েরা। ভারতের ৫৪% মানুষই গুজবের শিকার। যেখানে সারা বিশ্বে এই সংখ্যা ৫০%। শুধু ভারত নয়, গুজবের এই প্রবণতা এখন সারা পৃথিবীর কাছেই উদ্বেগজনক। ভুয়ো খবর ছড়ানোর ক্ষেত্রে গোটা বিশ্বের হার যেখানে ৫৭%, ভারতে সেখানে ৬৪%। আর নজরদারির প্রশ্নে ভারত সমগ্র বিশ্বে ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিশ্বে নজরদারির শিকার ২৯% ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। ভারতে সেখানে ৪২% মানুষ নজরদারির আওতায় থাকেন। পাশাপাশি অন্য কারও নামে ভুল বা বিভ্রান্তিকর খবর তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ভারত যথেষ্ট পারদর্শী। এই বিপদের মুখোমুখি ভারতে ৩১% আর বিশ্বে হার হল ২২%।
হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপে কিডনি পাচার, ছেলেধরা ভেবে কখনও নিছক সন্দেহের বশে গুজব ছড়ানোকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিককালে ভারতে বহু নিরপরাধ ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন। অসমের কার্বি আং লং-এ সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার নীলোৎপল দাস এবং ব্যবসায়ী অভিজিৎ নাথকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় ছেলেধরা সন্দেহে৷ ওঁরা গুয়াহাটি থেকে সেখানে বেড়াতে গিয়েছিলেন৷ শুধু অসমে নয়, গণপিটুনিতে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ার্সের মালবাজারের ওদলাবাড়িতে প্রাণ হারায় একজন৷ মৃত ব্যক্তি নেপালের৷ এই তালিকায় আমাদের রাজ্যের কোনও জেলাই বাদ পড়েনি৷ কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, তামিলনাড়ু, ওডিশা থেকেও আসে পিটিয়ে মারার খবর৷
তাহলে সোশ্যাল মিডিয়া কি সিরিয়াল কিলার হয়ে উঠছে? ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে মারার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল তখন৷ নেপথ্য ঘাতক নাকি সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব৷ কোটি কোটি ভারতীয় প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন৷ এক্ষেত্রে প্রধান অপরাধী নাকি হোয়াটসঅ্যাপ৷ বেশিরভাগ বহিরাগতই এর প্রধান নিশানা৷ কেউ হয়তো‌‌ অন্য জায়গা থেকে এসেছেন, চেহারায় বা হাবভাবে কিছুটা আলাদা৷ ভিন্ন ভাষায় কথা বলছে৷ পোশাক-পরিচ্ছদ জীর্ণ, ভিখারির মতো৷ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এদের ছেলেধরা বলে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়৷ অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে৷ পরিণাম গণপিটুনি৷ পুলিশ প্রশাসন কিছু করার আগেই যা হবার তা হয়ে যায়৷
কোনওভাবেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভুয়ো খবর বন্ধ করা যাবে না। কারণ সবাই যে এক দেশ থেকে এইসব ফেক নিউজ পোস্ট করেন তা নয়। বরং বিদেশে বসেও অনেকে ফেক নিউজ পোস্ট করতে পারেন। তাই এই সমস্যার কোনও টুকরো সমাধান নেই৷ এসব ঘটনার জন্য শুধু সোশ্যাল মিডিয়াই দোষী নয়৷ সোশ্যাল মিডিয়া হয়তো এটা বাড়িয়েছে, কিন্তু সমস্যাটা কোথায়? সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন তাতে কোনও সন্দেহ নেই৷ কিন্তু শুধু সরকারি নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়৷ এই সমস্যা সমাজ জীবনের গভীরে গেঁথে আছে৷ আমরা ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছি৷ আমাদের বিচারবুদ্ধি ও যুক্তিবোধ ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে৷ যুক্তিবাদী চিন্তাধারা দিয়ে চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করার পরিবর্তে আমরা আগ্রাসী হয়ে পড়ছি। তর্ক, বিবেচনা ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। অসহিষ্ণুতা যুক্তিবোধ আর মনের আবেগের মাঝে এক নির্বিষ প্রাচীর খাড়া করেছে। দিন ঘনিয়ে এসেছে, সময় এসেছে সেই প্রাচীর ভেঙে যুক্তি দিয়ে সবকিছু বিচার করার। যুক্তি, তর্ক দিয়ে ভাবুন। চোখ, কান খোলা রেখে প্রকৃত সোশ্যালাইজড মানুষ হয়ে উঠুন। 
লেখক বাগডাঙ্গা রামেন্দ্রসুন্দর স্মৃতি বিদ্যাপীঠের শিক্ষক

জনপ্রিয়

Back To Top