সুজন কুমার দাস

কঙ্গনা রানাওয়াত। চেনেন এঁকে? নিশ্চয় চেনেন। সব ধরনের মিডিয়ায় ছেয়ে আছেন যিনি, তঁাকে না চিনে উপায় আছে!‌ পেশাগতভাবে বলিউডের অভিনেত্রী। যদিও হিন্দি সিনেমায় উৎসাহ না থাকলেও কঙ্গনা নামটি শুনতেই হবে, এতবড় মাপের অভিনেত্রীও উনি নন। তবে প্রথম থেকেই বিতর্কিত মন্তব্য করে মিডিয়ার শিরোনাম হতে জানেন। আর ভারতীয় মিডিয়া যে বলিউডের প্রতি অতিরিক্ত হ্যাংলামো দেখায় তা সর্বজনবিদিত। সেই কঙ্গনা রানাওয়াত এবার স্বঘোষিত বিবেকের ভূমিকায়!‌
অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের অকাল মৃত্যু হঠাৎ ভারতবাসীর জাতীয় আবেগে পরিণত হয়েছে। কেন? আহা,
ভারতবাসী না খেয়ে বাঁচতে পারে, কিন্তু আবেগ ছাড়া তাদের পেট ভরে না। তাই প্রতিদিন নিজেদের বাঁচার স্বার্থেই আমরা আবেগ খুঁজে নিই। আর রাজনীতির ধুরন্ধররা মানুষের আবেগ নিয়ে রাজনীতি করেই তখতে টিকে থাকেন।
কর্মসংস্থান, উন্নয়ন, এইসব বাস্তবতা ছাপিয়ে মানুষের আবেগ ভোটের বাজারে বেশি কার্যকরী। তাই সুশান্ত সিং রাজপুত নামক আবেগ বিহারের ভোটে সুকৌশলে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
কঙ্গনাও বুঝেছেন, এই আবেগকে কাজে লাগিয়ে যদি বিবেকের ভূমিকায় অভিনয় করা যায়, তাহলে অভিনয়
জীবন যা তঁাকে দিতে পারেনি, সেটা রাজনীতির ময়দানে পাওয়া যাবে। আবেগ হচ্ছে মানুষের মন, যা না বুঝে,
চিন্তা না করে, না ভেবে, কাজ করা, বা কথা বলা। আর বিবেক হল, চিন্তাভাবনা করে, শুনে পরিষ্কারভাবে কাজ
করা, বা কথা বলা। সঠিক বিচার করা। যে কোনও খারাপ সময়ে মাথা ঠান্ডা রেখে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। কঙ্গনা
বলিউডের অন্ধকার দিকগুলোর কথা বলে খুব সুকৌশলে মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে বিবেকের জায়গায়
অভিনয় করে চলেছেন। এতদিন যে সেই অন্ধকার দিকগুলোর সঙ্গে আপস করেই তিনি রয়েছেন, সেটা তাঁর কথা থেকেই পরিষ্কার। তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু হঠাৎ ‘‌তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে’‌ করলে তাঁর সহকর্মীদের প্রতি অন্যায় হয় না কি? তিনি এটাও ভাল বোঝেন, ভারতীয় রাজনীতিতে বর্ণবাদের পক্ষে কথা বললে দ্রুত উন্নতি। তাই তিনি অবলীলায় ভারতীয় সংবিধানপ্রদত্ত জাতিগত সংরক্ষণের সুবিধা তুলে দেওয়া উচিত বলে টুইট করতে পারেন। এতে দলিত সম্প্রদায় অখুশি হলেও তাঁর কোনও ক্ষতি হবে না। বর্ণবাদীরা খুশি হলেই লাভ বেশি। কারণ রাজনৈতিক ক্ষমতা যে মূলত বর্ণবাদীদের হাতেই।
ফলও হাতেনাতে পেলেন। একেবারে ওয়াই প্লাস ক্যাটাগরির সুরক্ষাবলয় তাঁর জন্য বরাদ্দ করল সরকার। যে সুরক্ষা বর্তমানে ভারতের মাত্র ১৫ জন ভিভিআইপি পান। সেই বলয়ে কঙ্গনার নামটিও ঢুকে পড়ল। কেন্দ্র কেন এটা করল? ওই যে, সুশান্ত সিং রাজপুত নামক আবেগ ও বর্ণবাদের পক্ষে কথা বলে এবং সর্বোপরি ভারতীয় একশ্রেণির মিডিয়ার কল্যাণে কঙ্গনা এখন ভারতবাসীর ‘‌বিবেক’‌। আর কথাতেই তো আছে, আর যাই হোক আমরা যেন বিবেকহীন না হই। তাই এখন থেকে ভারতবাসীর ‘‌বিবেক’–কে‌ দশজন সিআরপিএফ কমান্ডো সবসময় সুরক্ষা দেবে। জনগণও নিশ্চিন্ত জাতীয় বিবেককে সুরক্ষিত দেখে। যে বিবেক ওয়াই প্লাস সুরক্ষাবলয়ের মধ্যে থেকে সেই সমস্ত বিষয়েই প্রশ্ন তুলবে যাতে সরকারের সুবিধা হয়। সেই বিবেক কখনোই অর্থনীতি নিয়ে প্রশ্ন করবে না, জনকল্যাণ নিয়ে প্রশ্ন করবে না। সেই বিবেক প্রশ্ন করবে না গরিব মানুষের অভাব অভিযোগ নিয়ে, উন্নয়ন নিয়ে, কর্মসংস্থান নিয়ে, বেকারত্ব নিয়ে, জিডিপি বৃদ্ধির হার নিয়ে, বৈষম্য নিয়ে, বর্ণবাদ নিয়ে। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন জীবিকা যখন অতিমারীর কবলে অসুরক্ষিত হয়ে পড়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান সবকিছুই যখন অনিশ্চিত, অসুরক্ষিত, তখন আমাদের ‘‌বিবেক’‌কে সুরক্ষিত দেখে আমরা সাধারণ ভারতবাসী মনে মনে ভরসা পাব। একি কম বড় কথা!

জনপ্রিয়

Back To Top