সরোজ উপাধ্যায়—কেরলে এবারের ভয়াবহ বন্যার কারণ কী?‌ সবরীমালা মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশিকাধার দেওয়ার অপচেষ্টা। সেই অপরাধেই নাকি ভগবান রুষ্ট। ফলত বন্যা। একুশ শতকে দঁাড়িয়ে এমন অসাধারণ মধ্যযুগীয় কুযুক্তিকে যিনি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করতে পারেন, সেই স্বামীনাথন গুরুমূর্তিকে ভারতের প্রধান ব্যাঙ্কের পরিচালন পর্ষদে সরকার মনোনীত সদস্য করা হয়েছে। ভদ্রলোক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ঘরের লোক, সঙ্ঘের সহযোগী সংস্থা স্বদেশী জাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত বলে তঁার নিযুক্তির সময়ে যথেষ্ট হইচই হয়েছিল। কিন্তু কেন গুরুমূর্তির ওপরে হঠাৎ ভরসা রাখলেন মোদি?‌ একটাই কারণ। মোদি অর্থনীতির কট্টর সমর্থক গুরুমূর্তি এবং তিনিও বিশ্বাস করেন, মোদি গত চার বছরে জাতীয় অর্থনীতির যা যা ‘‌ভাল’‌ করতে চেয়েছেন, তাতেই বাগড়া দিয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। এবং এই প্রশ্নে মোদি এবং গুরুমূর্তি, দু’‌জনেরই চক্ষুশূল রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন। বস্তুত রাজনের মতো বিদেশি অর্থনীতির পাঠ নেওয়া যে কোনও অর্থনীতিকই তঁাদের দু’‌জনেরই নাপসন্দ।    যেমন গুরুমূর্তি মনে করতেন, দেশের ৫ কোটি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প অনেক কর্মসংস্থান তৈরি করতে সক্ষম। এই জন্য তিনি মোদি সরকারের মাইক্রো ইউনিট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিফাইন্যান্স এজেন্সি বা মুদ্রা স্কিমের ঘোষণাকে স্বাগত জানান। অবশ্য অনেকেই বলেন, প্রকল্পটির উদ্যোক্তা গুরুমূর্তি নিজে। উপযুক্ত পরিকাঠামো, উদ্যোগ ও পরিচালনার অভাবে যে মুদ্রা স্কিম প্রায় ব্যর্থ হয়েছে বলা যায়। গুরুমূর্তি একটি ভাষণে তা স্বীকারও করেছিলেন গত বছর। সেই সময় তিনি বলেন, মোদি সরকারের আমলে কর্মসংস্থান বাড়েনি। তার জন্য দায়ী রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। তারা মুদ্রা ব্যাঙ্ক তৈরি না করার ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সহজ শর্তে ঋণ পায়নি। ফলে কর্মসংস্থান বাড়েনি।
গুরুমূর্তি বিদেশি প্রভাবমুক্ত অর্থনীতির প্রতিষ্ঠার পক্ষপাতী। এর জন্যে তিনি আর্থিক স্বয়ম্ভরতার অর্জনের উপর জোর দেন। যে কারণে তঁার মতামতকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাড়তি গুরুত্ব দেন। বিদেশে শিক্ষিত অর্থনীতিবিদদের কড়া সমালোচক গুরুমূর্তি। স্বাভাবিকভাবেই রঘুরাম রাজনকে তিনি পছন্দ করতেন না। তাঁর মত ছিল প্ল্যানিং কমিশন বিদেশি মডেলে গঠিত, যেখানে অর্থনীতির ভারতীয়করণ সম্ভব হয়নি। এই জন্যই প্ল্যানিং কমিশনকে তুলে দিয়ে তিনি নীতি আয়োগ প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। গুরুমূর্তির পরামর্শেই মোদি নীতি আয়োগ গঠন করেন। এখন নীতি আয়োগ অর্থনীতির কতটা ভারতীয়করণ করতে পেরেছে সেটা গবেষণার বিষয়। বাস্তবে নীতি আয়োগ সম্পর্কে যে ক্যাবিনেট নোট লেখা হয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল এই নতুন প্রতিষ্ঠানটি ভারতের জন্য কাজ করবে। এটি হবে উন্নয়নের ভারতীয় পদক্ষেপ। বলাবাহুল্য, এই নোটটি গুরুমূর্তির মতের অনুরূপ।
গুরুমূর্তি রঘুরাম রাজনের কোনও মতকেই সমর্থন করতেন না। রঘুরাম রাজন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ঋণদান নিয়ন্ত্রণে ঝুঁকির হারে ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না, কারণ ব্যাঙ্কগুলিতে অকার্যকর সম্পদের পরিমাণ বেড়েই চলছিল। অকার্যকর সম্পদের ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কগুলিকে যে কঠোর নিয়মনীতির বেড়াজালে বেঁধে রাখা হয়েছিল রাজনের আমলে, সেটিও গুরুমূর্তি সমর্থন করেননি। বড় অঙ্কের নোট গুরুমূর্তির মতে একদিকে ভোগ–প্রবণতা, অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ায়। রাজনের এই মতের পক্ষে সমর্থন ছিল না এবং তিনি কখনই বড় নোট বাতিলের স্বপক্ষে মত দেননি। এই সঙ্ঘাতের জন্যও রাজনকে গভর্নর হিসেবে মেয়াদ বাড়ানো হবে না বলে একটি প্রবন্ধে গুরুমূর্তি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। গুরুমূর্তি ভারতীয় ব্যাঙ্কগুলিকে বাজেল প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক স্তরের মূলধনী হার সংক্রান্ত রীতিনীতী ‌বজায় রাখার বিরোধী ছিলেন। রাজন কিন্তু বাজেল প্রস্তাবিত মূলধনী রীতি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত করতে চাইতেন। সেই রীতি মানতে গিয়ে সম্পদ বিভাজনে কঠোর নিয়ম বলবৎ করা হয়। ফলে ভারতীয় ব্যাঙ্কগুলির অকার্যকর সম্পদের হার বাড়ে অভূতপূর্ব হারে। প্রায় প্রতিটি সরকারি এবং অনেকগুলি বেসরকারি ব্যাঙ্ক তাদের অকার্যকর সম্পদের জন্য অর্থসংস্থান করতে গিয়ে লোকসানের মুখে পড়ে। এখন ব্যাঙ্কগুলিকে এত কঠোর নিয়ম মানানো ভারতীয় কাঠামোয় সঙ্গত কি না এবং এই সীমাবদ্ধতায় ব্যাঙ্কগুলি তাদের সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে পারবে কি না, এ প্রসঙ্গগুলি খুবই বিতর্কমূলক ও সঙ্গত প্রশ্ন। গুরুমূর্তির মত এইদিক দিয়ে কিছুটা সঙ্গত বলেই মনে হয়। গুরুমূর্তি, জেটলি ও সুব্রহ্মণ্যম স্বামীর যৌথ মত অনুযায়ী রাজনকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে ব্যাঙ্কগুলিতে যে অসাধু ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদরা লুটপাট চালাচ্ছে, রাজন তাঁর কাজ ও তাঁর অনুসৃত নীতির কঠোরতার মধ্যে দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন। আরবিআই–‌য়ের হিসাব বলছে ১০ লক্ষ কোটি টাকার অকার্যকর সম্পদের একটি বড় অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিশোধ না করা ঋণের জন্য ঘটেছে। অর্থাৎ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ঋণ শোধ না করা। রাজন এমন নীতি চালু করতে চেয়েছিলেন, যাতে ওই ধরনের ঋণগ্রহীতাদের সম্পদকে ক্রোক করে অনাদায়ী টাকা উদ্ধার করা যায়। এই ধরনের কঠোর নীতির জন্য গুরুমূর্তিসহ সঙ্ঘ পরিবারের অনেকেই মনে করতেন যে ভারতীয় শিল্পপতি ও উদ্যোগপতিদের মনে রাজন ভীতির সঞ্চার করেছেন। তিনি বিদেশি ব্যাঙ্ক কাঠামোতে হয়ত উপযুক্ত, কিন্তু ভারতীয় আর্থিক কাঠামোয় বেমানান। একটি নিবন্ধে গুরুমূর্তি চেয়েছিলেন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তাদের সঞ্চয় থেকে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কগুলিকে সাহায্য করুক। কিন্তু নীতিগতভাবে আরবিআই এটি করে না, বা করতে পারে না। রাজনও ওই প্রস্তাব মানতে রাজি হননি। কাজেই মোদি সরকার ও সঙ্ঘ পরিবারের যে দর্শন, তার সঙ্গে রাজনের কখনই বনিবনা হতো না। তাই রাজনকে চলে যেতে হয়েছিল। তবে গুরুমূর্তি বারবার বলেছেন, রাজন–বিদায়ে তঁার কোনও হাত ছিল না। গুরুমূর্তি ও সতীশ মারাঠেকে আরবিআই বোর্ড ঢোকানোর পরে সরকার আরবিআইয়ের সিদ্ধান্তে আরও বেশি নাক গলাতে চাইছেন বলেই মনে করা হচ্ছে। সরকার সেই সব লোককেই মনোনীত করতে চায়, যঁারা সরকারি নীতি ও চাহিদার স্বপক্ষে বোর্ড মিটিংয়ে বেশি করে বলবেন। দুই নতুন ডিরেক্টর প্রথম যে বোর্ডের বৈঠকে উপস্থিত থেকেছেন, তাতে সরকারের পক্ষ থেকে দুটি প্রস্তাব করা হয়েছে। এক,‌ পাঁচ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তহবিল যাতে আরবিআই কেন্দ্রীয় সরকারকে হস্তান্তর করে। ‌দুই,‌ যে সরকারি ব্যাঙ্কগুলিকে প্রম্পট কারেকটিভ অ্যাকশানের আওতায় রেখে ঋণদানে কঠোরতা পালন করা হচ্ছে সেগুলির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ যেন শিথিল করা হয়। 
সঙ্ঘ পরিবারের অনুগত সদস্যরা আরবিআই বোর্ডে গেলে ব্যাঙ্কগুলি বেসকারিকরণের আশঙ্কামুক্ত থাকবে আশা করা যায়, কারণ সঙ্ঘ পরিবার বেসরকারিকরণ চায় না। আশঙ্কার দিক হচ্ছে সঙ্ঘ পরিবারের কাছাকাছি উদ্যোগপতিরা ঋণ পেতে পারে ও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নীতি গ্রহণের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হতে পারে। কেন না সরকারি নীতি যদি অনুকূল না হয় তাহলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেমন বিমুদ্রাকরণের মত আকস্মিক সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে আর মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব ও আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও সুদের হার কম রাখার জন্য (‌এর জন্য সরকারি চাপ খানিকটা দায়ী)‌ ব্যাঙ্কের আমানত সংগ্রহ বাঞ্ছিত গতি পাচ্ছে না। আর্থিক নীতিতে আরবিআই–‌য়ের স্বাধীনতা যে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য রক্ষা করে, তা বজায় রাখা যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রীতি, এ কথা বলাই বাহুল্য।

জনপ্রিয়

Back To Top