নন্দগোপাল পাত্র: ল্যানসেট কমিশন তাদের ১৯ অক্টোবর ২০১৭ রিপোর্টে দূষণকে যুদ্ধ, বিপর্যয়ের থেকেও ভয়াবহ বলে জানিয়েছিল। দূষণ ও স্বাস্থ্য বিষয়ক ওই রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছিল, প্রতি বছর যুদ্ধ, হিংসা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, দুর্ভিক্ষ, এইডস, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া প্রভৃতি কারণে যত মৃত্যু হয়, তার থেকেও বেশি হয় দূষণের জন্য। ২০১৫–এ দূষণজনিত কারণে সারা পৃথিবীতে প্রায় ৯০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। যা ওই বছরে পৃথিবীতে মোট মৃত্যুর ১৬% এবং এইডস, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর তিন গুণ। দূষণজনিত অসুস্থতার জন্য খরচ হয় প্রায় ৪৬ ট্রিলিয়ন ডলার যা বিশ্ব অর্থনীতির ৬.২%। ওই রিপোর্টে আরও প্রকাশ পেয়েছিল, আমেরিকা দূষণ নিয়ন্ত্রণে ১ ডলার খরচ করলে তাদের দেশের আর্থিক সমৃদ্ধি হয় ৩০ ডলার। অপর এক সমীক্ষা থেকে জানা গিয়েছিল ২০১৭–এ সারা বিশ্বে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বায়ুদূষণজনিত কারণে। এর মধ্যে ১২ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল ভারতে। বায়ুদূষণের ফলে বুদ্ধিমত্তা হ্রাস পায়। শুধু তাই নয়, দূষণের ফলে স্মৃতিভ্রংশতাও হ্রাস পায়।
ভারতে প্রতি আটটি মৃত্যুর মধ্যে একজনের মৃত্যু বায়ুদূষণজনিত। মান্য সংস্থা আইপিসিসি পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব উষ্ণায়নকে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসেই ধরে রাখতে। মানুষের দ্বারা কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণের মাত্রা ৪৫ শতাংশে নিয়ে আসতে হবে ২০৩০ সালের মধ্যে। আবার ‘গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান’(১৯৮৬) থেকে জল অনেকদূর গড়িয়ে ‘নমামি গঙ্গে’(২০১৫)–‌তে এসে পৌঁছেছে। গঙ্গার জল দূষণের মাত্রা হ্রাস তো দূরের কথা, বরং গত তিন বছরে গঙ্গা আরও দূষিত হয়ে পড়েছে। ২০১৮ সালে গুরুত্বের নিরিখে তালিকাভুক্ত সবচেয়ে সাড়াজাগানো পরিসংখ্যান ছিল বিশ্বে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণের হিসেব।
ব্রিটেনের রয়্যাল স্ট্যাটিসটিক্যাল সোসাইটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে এই পরিসংখ্যানের তালিকা তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাপী পরিবেশের ওপর প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রভাব ২০১৮ সালে বারবার শিরোনামে এসেছে। এর পাশাপাশি সমুদ্র প্লাস্টিক মুক্ত করতে একজোট হয়ে বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশ ‘নাইরোবি রেজোলিউশন’–‌এ সই করে। লক্ষ্য ২০২৫–এর মধ্যে সমুদ্র প্লাস্টিক মুক্ত করা। এর সঙ্গে সুযোগ পেলেই চলছে পরিবেশের ধ্বংস সাধন।
২০১২–এ বিশ্বব্যাঙ্ক তাদের রিপোর্টে জানিয়েছিল, আগামী ২০ বছরে ভারতের ভূগর্ভস্থ জলের ৬০% অতি সঙ্কটজনক অবস্থায় পৌঁছবে। এই আশঙ্কা যে সত্য, তা ২০১৮ জুন মাসে প্রকাশিত নীতি আয়োগের রিপোর্ট থেকে জানা গেল। প্রতি বছর ৬০ কোটি ভারতীয় জল সঙ্কটের শিকার হয়। এর মধ্যে ২ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায় বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাবে। দিল্লি, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই এবং হায়দরাবাদ–‌সহ ভারতের ২১টি শহর ২০২০ সালের মধ্যে তীব্র ভূগর্ভস্থ জলের সঙ্কটে পড়বে। এর ফল ভুগবে প্রায় ১০ কোটি মানুষ। ২০৩০–‌এ জলের জোগানের তুলনায় চাহিদা দ্বিগুণ হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ২০৫০–এর মধ্যে জিডিপি ৬% কমে যাবে। ২০১২ থেকে ২০১৮ সম্পর্কে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার লাইন ধার করে বলতে হয়— সে বড় সুখের সময় নয়, সে বড় আনন্দের সময় নয়।
তাই সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের ঘোষণার পরই ভেবে রেখেছিলাম এবার কেন্দ্রের বর্তমান শাসক দল, বিরোধী দল এবং আমাদের রাজ্যের শাসক দলের নির্বাচনী ইস্তাহার পড়ব, পরিবেশ নিয়ে ইস্তাহারে কী রয়েছে জানার জন্য। এছাড়া রাজনৈতিক দলটির অবস্থান, দেশ ও সমাজ সম্পর্কে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী। ক্ষমতায় এলে সংশ্লিষ্ট দলটি প্রতিশ্রুতি পূরণে কতটা উদ্যোগী হবে, সে বিষয়ে জানারও আগ্রহ ছিল।
বিজেপি–‌র ২০১৪ সালের ৫২ পাতার ইস্তাহারে পরিবেশ নিয়ে ‘‌ফ্লোরা, ফনা, অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট— সেফগার্ডিং আওয়ার টুমরো’ শীর্ষক মাত্র এক পাতা বরাদ্দ ছিল। এর ‘‌উই উইল’‌ অংশে পরিবেশ বিষয়ে ১১ দফা ছিল। এবার আলাদাভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিজেপি–‌র ইস্তাহারে বাড়তি জায়গা পেয়েছে। আগামীতে ক্ষমতায় এলে মোদি সরকারের পরিবেশ সংক্রান্ত কী পরিকল্পনা, তা বলা হয়েছে। বস্তুত এবারই প্রথম দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইস্তাহারে জলবায়ু পরিবর্তনের ভাবনা, পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জাতীয় কংগ্রেসের ওয়েবসাইটে রয়েছে তাদের ২০১৯–এর ৫৫ পাতার ইস্তাহার। এতে ৫২টি দফা রয়েছে। ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট, স্যানিটেশন অ্যান্ড হাইজিন এবং এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ শীর্ষক দু–পাতা বরাদ্দ রয়েছে। প্রতিশ্রুতি আছে ন্যাশনাল ড্রিঙ্কিং ওয়াটার মিশন, পৃথক জল মন্ত্রক গঠন করার। গঙ্গা–‌সহ অন্যান্য নদী সংস্কারের জন্য বাজেট বরাদ্দ দ্বিগুণ করা, এবং এনভায়রনমেন্ট প্রোটেকশন অথরিটি গঠন করা। দূষণ মোকাবিলার জন্য ন্যাশনাল ক্লিন এয়ার প্রোগ্রাম ও নির্মল ভারত অভিযান শক্তিশালী করা হবে। বনাঞ্চলের পরিমাণ ২০২৫–এ ২১ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে।
রাজ্যের শাসক দল সারা ভারত তৃণমূল কংগ্রেসের ওয়েবসাইটে রয়েছে ২০১৯–এর ৬৭ পাতার ইস্তাহার। এতে রয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প প্রভৃতি বিষয়ে ৬১টি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। পরিবেশ নিয়ে রয়েছে— রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং পলিসি, ক্লিন এনার্জি, মোটর ভেহিক্‌লস নিয়মের পুনরায় পরীক্ষা, সবুজ ও পরিষ্কার পরিবেশ রাখার জন্য পরিবেশ বান্ধব ও মানুষের জন্য উপযোগী পরিবেশবিধি গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি। 
নির্বাচনের পর যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেন দূষণ নিয়ন্ত্রণ তথা সার্বিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি এবং সুস্থায়ী পরিবেশ নীতি নিয়ে সদর্থক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এই আশা রাখা যেতেই পারে। সঙ্গে সঙ্গে অভিজ্ঞ পরিবেশবিদদের আশঙ্কা ভাগ করে নিয়ে বলতে হয়, না আঁচালে বিশ্বাস নেই!‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top