ড.‌ শ্যামল চক্রবর্তী: ১৯৮৭–‌৯২ সময়কালে কংগ্রেস–‌টিইউজিএস জোট সরকারের অপশাসন ত্রিপুরার নির্বাচকমণ্ডলীকে এতটাই ক্ষুব্ধ করেছিল যে, ১৯৯৩ থেকে ২০১৮ সালের নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত একটানা দুই দশক বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থেকেছে। সব কয়টি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস। বিজেপি প্রায় অস্তিত্বহীন। ২০১৩ সালে বিজেপি সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিল কাঞ্চনপুর উপজাতি সংরক্ষিত আসনে। মাত্র ৯৯২টি ভোট বিজেপি–‌র ঝুলিতে জমা পড়েছিল।
২০১৪ সালে কর্পোরেট দোসরদের প্রকাশ্য সহায়তায় অর্থের সম্ভারে বলদর্পী হয়ে দেশের শতকরা ৩১ ভাগ মানুষের রায়ে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হলেন। ২০১৫ সালে ত্রিপুরার সুরমা ও প্রতাপগড় বিধানসভা আসনে উপনির্বাচন হল। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালে অমরপুর, বড়জলা ও খোয়াই আসনে উপনির্বাচন হল। সব কয়টি উপনির্বাচনের যা ফলাফল তার গতিবিধি ছিল একইরকম। কংগ্রেস দলের তীব্র রক্তক্ষরণ। বিজেপি সেই রক্তক্ষরণ থেকে ডিভিডেন্ড আদায় করে নিয়েছে। চুলচেরা যুক্তিতর্কের প্রয়োজন নেই। ভোটের ছবি আমাদের সব কথা বলবে।

বিধানসভা কেন্দ্র:‌ সুরমা
২০১৩ সাল            ২০১৫ সাল (‌উপনির্বাচন)‌
সিপিআইএম:‌ ১৮৬৪৮        সিপিআইএম:‌ ২৩২৭৫
কংগ্রেস:‌ ১৬৭৮৬        কংগ্রেস:‌ ২৫২৮
বিজেপি:‌ ৪১৫           বিজেপি:‌ ৭৯৬৬

বিধানসভা কেন্দ্র:‌ প্রতাপগড়
২০১৩ সাল            ২০১৫ সাল (‌উপনির্বাচন)‌
সিপিআইএম:‌ ২৩৯৭৭        সিপিআইএম ২৭৫৫৫
কংগ্রেস:‌ ২১৮৪৫        কংগ্রেস:‌ ৫১৮৭
বিজেপি:‌ প্রার্থী দেয়নি        বিজেপি:‌ ১০২২৯

বিধানসভা কেন্দ্র:‌ অমরপুর
২০১৩ সাল            ২০১৬ সাল (‌উপনির্বাচন)‌
সিপিআইএম:‌ ১৯০৭৫         সিপিআইএম:‌ ২০৩৫৫
কংগ্রেস:‌ ১৫০৫৩        কংগ্রেস:‌ ১২৩১
বিজেপি:‌ ৪১০          বিজেপি:‌ ৯৭৫৮

বিধানসভা কেন্দ্র:‌ বড়জলা
২০১৩ সাল            ২০১৬ সাল (‌উপনির্বাচন)‌
সিপিআইএম:‌ ১৭৪৬৭         সিপিআইএম:‌ ১৫৭৬৯
কংগ্রেস:‌ ১৭৭২৮        কংগ্রেস:‌ ১০৬৭
বিজেপি:‌ ৫১১          বিজেপি:‌ ১২৩৯৫
                            তৃণমূল:‌ ৫৬৯২

বিধানসভা কেন্দ্র:‌ খোয়াই
২০১৩ সাল              ২০১৬ সাল (‌উপনির্বাচন)‌
সিপিআইএম:‌ ২২৬৯২        সিপিআইএম:‌ ২৪৮১০
কংগ্রেস:‌ ১৩৮৫৯        কংগ্রেস:‌ ৬৯৬
বিজেপি:‌ ২৩২          বিজেপি:‌ ২৫২৮
                             তৃণমূল:‌ ৮৭১৬
২০১৬ সালের বড়জলা ও খোয়াই উপনির্বাচনে কংগ্রেসের ভোট দু’‌‌ভাগ হয়ে একভাগ বিজেপি ও অন্যভাগ তৃণমূলের দিকে গেছে। সেই তৃণমূল ত্রিপুরায় এখন অস্তমিত। জনপ্রতিনিধিদের বাহবা দিতেই হবে। গোটা দশ বামবিরোধী জনপ্রতিনিধি। দুজন কংগ্রেসে থেকে গেলেন। একজন খানিকটা নৈতিকতার ছবি দেখালেন। বাকিদের কোনও ঘুরপথের বালাই নেই। কংগ্রেস থেকে তৃণমূল। তৃণমূল থেকে সোজা বিজেপি। গান্ধীজির হত্যাকারীদের সঙ্গে হাত মেলাতে হাত–‌বুক কাঁপল না বলেই তো মনে হয়। নির্বাচনের আগে এক সাক্ষাৎকারে ত্রিপুরা বামফ্রন্টের আহ্বায়ক যথার্থই বলেছিলেন হয়তো বা, ‘‌বিজেপি এবং আরএসএসের যে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি, সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এখানে বিজেপি তেমন গড়ে উঠেনি।’‌ তবে বিজেপি যে পা বাড়াচ্ছে, উপনির্বাচনের ফলাফল দেখে বোঝা গিয়েছিল। নির্বাচনের রায় স্পষ্ট। বিজেপি–‌আইএনএফটি জোট ৪৩টি আসন পেয়েছে। সিপিআইএম ১৬টি আসন পেয়েছে। চড়িলাম সংরক্ষিত আসনে ভোট হবে ১২ মার্চ। ‘‌ভোট’‌ হবে না কি ‘‌ভোট লুঠ’‌ হবে সে বোঝা যাবে পরে।
মসনদে বসার পক্ষে এত বড় রায় অথচ হৃদয়ে শান্তি নেই। প্রতিদিন বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মকেন্দ্র ও গণসংগঠনের কর্মকেন্দ্রে মুহুর্মুহু আক্রমণ। বাইশটি কলেজের ছাত্র সংসদের কর্মকেন্দ্র দখল। এই সংবাদ পড়ার পর আমার একটি চিঠির কথা মনে পড়ল। চিঠিটি আমাকে লিখেছিলেন ত্রিপুরার দীর্ঘদিনের সাংসদ একদা বামফ্রন্টের আহ্বায়ক সম্প্রতি প্রয়াত খগেন দাস। ২৩.‌৭.‌৯২ তারিখের লেখা চিঠি। শিক্ষার জগতে জড়িয়ে আছি। তাঁর কনিষ্ঠা কন্যার লেখাপড়ার বিষয়ে খানিকটা সহায়তা চেয়েছেন। কেন এই চাওয়া?‌ তিনি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘‌তুমি তো ত্রিপুরার পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। আমাদের ঘরের ছেলে‌মেয়েদের ত্রিপুরার কলেজে পড়াশোনো করানো কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়।’‌ সময়টা সেই কংগ্রেস–‌টিইউজিএস জোটের আমল। এখন বিজেপি দল মাত্র গোটা দুই বিধায়ক পেলে সরকার গড়ে ফেলতে পারে। তাদের কাছে আদর্শের প্রত্যাশা বাতুলতা মাত্র। গণতন্ত্রে হার–‌জিৎ অপরিহার্য। তবে রক্তপাত কেন?‌ আমরা কিন্তু ১৯৯৩ সালে বামফ্রন্ট জয়ী হওয়ার পর এমন দৃশ্য ত্রিপুরার মাটিতে প্রত্যক্ষ করিনি। আশির ভ্রাতৃঘাতী বীভৎসতার কথা ত্রিপুরার মানুষ ভুলতে পারে না। আকাশে সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় হয়। সেই মেঘ কি জমতে শুরু করবে?‌ ফল ঘোষণার দিনে গণনাকেন্দ্রে যে ঘটনার মুখোমুখি হলেন মুখ্যমন্ত্রী, একে গণতন্ত্রের কলঙ্ক বলা যায় না কি?‌
নব্বইয়ের দশক থেকে পৃথিবী জুড়ে কর্পোরেট পুঁজি এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার তীব্র উত্তাপ আর আস্ফালনে দগ্ধ হয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। ত্রিপুরায় বামবিরোধী ভোট কোনও কালেই শতকরা ৪০–‌৪৫ এর নিচে নয়। ২০১৩ সালে বামফ্রন্ট এত আসন পেলেও, ভাট পেয়েছিল ৫২.‌১৩%‌ খাদ্য–‌শিক্ষক–‌স্বাস্থ্য আর যোগাযোগের সুলভ পরিকাঠামো থাকলেই নবীন প্রজন্ম তুষ্টি লাভ করে না। ত্রিপুরায় কলকারখানা নেই। তাই তেমন করে শ্রমিক শ্রেণীও নেই। আছে কৃষক, খেতমজুর, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ। কর্পোরেট হাঙরের করাল গ্রাস থেকে মুক্তির উপায় অনুসন্ধান করতে হবে আমাদের সকলকেই। নইলে শেষ বিচারে কারও মুক্তি নেই। ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top