জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া রাহুল গান্ধীর বন্ধু, সহপাঠী, বহুদিনের ঘনিষ্ঠ অনুগামী। বন্ধুকে কংগ্রেসে রাখার চেষ্টা করেছিলেন?‌ জানা তো যাচ্ছে না। কংগ্রেস সূত্রের খবর, কিছু করেননি। শচীন পাইলট রাজস্থানে চরম বিক্ষুব্ধ, কিছু করছেন?‌ না। মিলিন্দ দেওরা, জিতিন প্রসাদ, কুলদীপ বিশনোই— তাঁর ঘনিষ্ঠ, ‘‌রাহুল ব্রিগেড’‌। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ওঁরা কার্যত বিজেপি–‌র সুরে সুর মেলাচ্ছেন। রাহুল নির্বিকার। মাঝেমাঝে টুইট ছাড়া উপস্থিতি বোঝা কঠিন।
কর্ণাটকে যখন কংগ্রেস ভেঙে সরকার ফেলছে বিজেপি, সভাপতি রাহুল গান্ধী হাত গুটিয়ে বসেছিলেন। রাজ্যের নেতারা সাহায্য পাননি, পরামর্শ পাননি। হরিয়ানাতে চেষ্টা করলে, দুষ্মন্ত চৌতালাকে সঙ্গে রেখে সরকার গড়া যেত। নেতা নিষ্ক্রিয়, দুষ্মন্তকে ঝোলাতে পুরে সরকার গড়ে ফেলল বিজেপি। মধ্যপ্রদেশ জ্যোতিরাদিত্য দলত্যাগী, সরকার সঙ্কটে, তিনি ‘‌দার্শনিক’‌, ফলাফলে যাঁর কিছুই এসে যায় না।
একটা জিনিস চালু আছে। বিদেশ সফর। কংগ্রেস নেতারাই জানাতে পারেন না, কবে দেশে আছেন, কবে নেই। মাঝে মাঝে শোনা যায়, ফিরেছেন!‌ লোকসভা ভোটের আগে মাস তিনেকের বিরতি। তাছাড়া, ছুটি, ছুটি। কত ‘‌ছুটি’‌ দরকার?‌ পূর্ণ সময়ের রাজনীতিক এরকম করেন?‌ বিপাসনা পর্বের কথা শুনেছিলাম। এখন কীসের পর্ব চলছে কে জানে। কংগ্রেস মুখপাত্র থতমত খান, রাহুল কোথায়?‌ কোন দেশে?‌ অদ্ভুত উত্তর আসে, ‘‌কংগ্রেসের নেতা। সক্রিয়। আছেন।’‌ না–‌থেকে কী করে থাকা যায়, নেতাই জানেন!‌
লোকসভা ভোটে শোচনীয় বিপর্যয়। বাংলায় মমতা, তামিলনাড়ুতে স্ট্যালিন, তেলেঙ্গানাতে চন্দ্রশেখর রাও যুদ্ধ–‌হাওয়া তথা বিষাক্ত প্রচারের বিরুদ্ধে লড়ে বেশ কিছু আসন পেয়েছেন। নিজেদের শক্তির এলাকাতে 
কংগ্রেসের বিপর্যয়। দলের হিসাব ছিল, খুব বেশি হবে না, তবে অন্তত ১২০ আসন আসবে। চল্লিশের ঘরে আটকে থাকল। রাফাল দিয়ে বাজিমাত করতে পারেননি। সকলে জানেন, পুলওয়ামা ঘটতে দিয়ে এবং সেই সূত্রে বালাকোট ঘটিয়ে, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে ভয়ঙ্কর জায়গায় তুলে ৩০৩ পেয়েছেন মোদি। 
‘‌দায়’‌ নিয়ে সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দিলেন রাহুল গান্ধী। বললেন, আমি থাকব না, পরিবারের কাউকে হতে দেব না। কংগ্রেস কর্মীরা নেহরু–‌গান্ধী পরিবারকে ভালবাসেন। মনে করেন, পরিবারের কেউ মাথায় না–‌থাকলে, দল ধরে রাখা যাবে না। কী হল?‌ সত্তরোর্ধ্ব, অসুস্থ সোনিয়া গান্ধীকে ‘‌অন্তর্বর্তীকালীন’ সভানেত্রী হতে হল। রাহুলের কথা কি থাকল?‌ যদি পরিবারের কাউকেই হতে হয়, প্রস্তুত থাকুন বা না–‌থাকুন, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে ভার নিতে হয়। বোনকে আগলে রাখলেন, অসুস্থ মা–‌কে কঠিন সময়ে সামনে ঠেলে দিলেন।
নির্বাচনে হার হতে পারে। সভাপতি তথা নেতা ‘‌দায়’‌ নেবেন, স্বাভাবিক। কিন্তু ‘‌দায়িত্ব’ নেবেন না ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য?‌ ‘‌দায়’‌ নিয়ে বলতে পারতেন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কাছে হেরে গেছি, কিন্তু একটা ভোটেই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে না। আসুন, লড়ি, ঘুরে দাঁড়াই। শোনা গেল, চেয়েছিলেন পদত্যাগ করে চাপে ফেলবেন, যাতে প্রবীণ নেতারা, তাঁর মতে যাঁরা দলটাকে চাঙ্গা করতে দিচ্ছেন না, নিজেদের স্বার্থে, নিজেদের ছেলেদের জেতাতে ব্যস্ত, তাঁরা সরে দাঁড়ান। নতুন টিম তৈরি করবেন। প্রথমত, ওই প্রবীণদের আর যে–‌দোষই থাক, কংগ্রেস ছাড়েননি চূড়ান্ত দুঃসময়েও। দ্বিতীয়ত, কংগ্রেস সভাপতি শক্তিমান, সরালেন না কেন?‌ ঝুঁকি নিতে পারলেন না কেন?‌ ইন্দিরা গান্ধী বিপর্যস্ত হয়েছেন, প্রবীণদের শত্রুতা পেয়েছেন, শুধু তিন বছরের মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়ে কংগ্রেসকে ক্ষমতায় ফেরাননি, ঝুঁকি নিয়ে নতুন দল গড়েছেন। তিনি ইন্দিরা নন, কিন্তু ছিটেফোঁটা থাকলে সাহস দেখাতেন রাহুল। সাধারণ কর্মীরা পাশে থাকতেন। বিপর্যয় থেকেই তৈরি হয় নতুন সম্ভাবনা, সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে মাথা উঁচু করে লড়তে পারতেন। ‘‌বিবাগী’‌ হওয়ার কী মানে হয়?‌
রাহুল বলতেই পারেন, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, কংগ্রেসের নেতৃত্ব দিতে ভাল লাগছে না। কিন্তু, ‘‌নেতা’‌ তো আছেন। সম্প্রতি, রাজ্যসভার আসন প্রসঙ্গে সীতারাম ইয়েচুরি কথা বললেন তাঁর সঙ্গে। সিদ্ধান্ত। নেই, কিন্তু আছেন। ওয়েনাড়ের সাংসদ হিসেবে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চান?‌ তাহলে, কার্যত নেতার ভূমিকায় ভেতরে–‌ভেতরে থাকেন কেন মাঝেমধ্যে?‌ নেতারা বলতে পারেন, কংগ্রেস কী করবে, দলের কী হবে, তাঁরা বুঝবেন, আমাদের মাথাব্যথা কেন?‌ কারণ, আমরা বিজেপি–‌বিরোধী। দেশের বেশ কিছু রাজ্যে বিজেপি–‌বিরোধী প্রধান দল কংগ্রেস। ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরে থাকলে, সেই রাজ্যগুলিতে কংগ্রেসের শক্তি ধরে রাখাটা প্রয়োজন মনে করব। করি। রাহুল সিদ্ধান্ত নিন, আসলে কী করবেন। হয় করুন, নয় ছাড়ুন।     ‌‌     ‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top