জোড়া সঙ্কটের সঙ্গে যুঝতে হচ্ছে বাংলাকে। কোভিড, আমফান। প্রধানমন্ত্রী কয়েক ঘণ্টার জন্য দেখতে এলেন দুর্গতির ছবি। হেলিকপ্টার থেকে নেমে জানালেন, ‘‌অগ্রিম’‌ হিসেবে দেওয়া হবে ১০০০ কোটি, বিস্তারিত হিসেব পাওয়ার পরে, বাকি টাকা। কেন্দ্রীয় দল এল, ঘুরে দেখল। কয়েক সপ্তাহ অতিক্রান্ত, আর কোনও সাড়াশব্দ নেই। মুখ্যমন্ত্রী আর্থিক সঙ্কটের মধ্যেও (‌রাজ্যের প্রাপ্য ৫৩ হাজার কোটি টাকা এমনিতেই দেয়নি কেন্দ্র)‌ ৬৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন।
কোভিডের হানা অব্যাহত দেশে, রাজ্যেও। কোনও ‘‌সাহায্য’‌ আসেনি দিল্লি থেকে?‌ তা বলা যাবে না। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তি সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক উড়ান নেমেছে, প্রথম দফার সংক্রমণ ছড়িয়েছে। ৪ ঘণ্টার লকডাউন–‌নোটিসে আটকে রাখার পর, হঠাৎ–‌সিদ্ধান্তে পাঠানো হল পরিযায়ী স্পেশ্যাল। ঠাসাঠাসি করে। আরেক দফা ব্যাপক সংক্রমণ। প্রশাসন যখন সঙ্কট মোকাবিলায় লড়ছে, দিল্লি পাঠাল কেন্দ্রীয় দল। এক ফোঁটা সহায়তা নয়, ওই দল বিরক্ত করে গেল রাজ্যকে। তবু, বাংলার লড়াই চলছে।
 এই লড়াইয়ের উল্টোদিকে, বিজেপি কী করছে?‌ দৈনন্দিন বিষাক্ত প্রচার তো চলছেই, সব দিক দিয়ে সরকার ও শাসক দলকে আক্রমণ অবিরাম। মহামতি রাজ্যপাল ভাত দেওয়ার ভাতার নন, কিল মারার গোসাঁই। জোকার–‌কাম–‌ভিলেন ক্লান্তিহীন, কীভাবে ‘‌‌নিজের সরকারকেই’‌ বিপদে ফেলা যায়। লখনউ ঘুরে পৌঁছে গেলেন দিল্লিতে। এক গোছা নালিশ ‘‌বস’‌ অমিত শাহর কাছে। বিষ ঢেলে এলেন। অবশ্য, ‘‌বিষ’‌ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রিয় বিষয়। বিজেপি সাংসদরা হাজির সেই ‘‌বস’‌–‌এর কাছে। ভুলভাল তথ্য, ভিত্তিহীন অভিযোগ। স্বপন দাশগুপ্ত বললেন, ‘‌গম্ভীর’‌ ভাবনার সময় এসেছে, রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করা যায় কিনা। ওঁরা হয়তো বুঝছেন, ভোটে হারানো যাবে না। ৩৫৬ করে দেখুন একবার, জবাব পেয়ে যাবেন।
 ভয়ঙ্কর প্রচার কতদূর যেতে পারে, উদাহরণ পেশ করলেন রাহুল সিনহা। স্বরাষ্ট্রসচিব বলেন, কিছু ক্ষেত্রে ‘‌গোষ্ঠী সংক্রমণ’‌ হয়ে থাকতে পারে। তাই সপ্তাহে ২ দিন লকডাউন। রাহুলবাবুর হুঙ্কার, কোন ‘‌কমিউনিটি’‌, বলতে হবে। ভেবেছেন, এক্ষেত্রেও ‘‌কমিউনিটি’‌ মানে বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়!‌ আসলে, ‘‌কমিউনিটি স্প্রেড’‌ মানে, যখন ঠিক কার কাছ থেকে সংক্রমিত হয়েছেন, বোঝা যায় না। বলা বাহুল্য, তবু ওঁদের জানিয়ে রাখতে হচ্ছে, বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সংক্রমণ কম। বড় কথা নয়। অতিমারী ধর্মের ভেদ করে না। 
২১ জুলাই ভার্চুয়াল সভায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নির্ভেজাল তথ্য দিয়ে জানালেন, অনেক বিষয়ে বাংলার সাফল্য স্পষ্ট, দেশের মধ্যে এক নম্বরে। যথা, ভারতে বেকারত্ব প্রচুর বেড়েছে, বাংলায় কমেছে ৪০ শতাংশ। অসংখ্য কল্যাণমূলক প্রকল্প, যা সর্বজনস্বীকৃত। সিপিএম নেতা সভা শেষ হওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যে টেলিভিশনে গর্জালেন, অসত্য, অসত্য। তথ্য প্রতিষ্ঠিত, তবু বলে গেলেন, যা যা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী, স–‌ব অসত্য। পঁাচবার চেঁচিয়ে বললেন—অসত্য। তঁাকে এবার থেকে অসত্যবাবু নামে ডাকা যেতে পারে।
২১ জুলাই বঙ্গবাসী একসঙ্গে দেখলেন শুনলেন একইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী ও জননেত্রীকে। ৫০ লক্ষ মানুষ সরাসরি শুনলেন। তারপর রিপিট টেলিকাস্ট–‌এ আরও ৫০ লক্ষ। দিকে দিকে এই বার্তা ছড়িয়ে গেল, গুজরাট নয়, বাংলা শাসন করবে বাংলাই। কোণঠাসা এবং হতাশ বিরোধীরা চেঁচালেন, কুকথার বন্যায় ভাসালেন। না, ভাসল না। ডুবে গেল মিথ্যা প্রচার।
১ ঘণ্টা ১৫ মিনিটের ভাষণে একটা পর্বে রাজ্য সরকারের নিশ্চিত সাফল্যের সজীব তথ্য। আরেক পর্বে বিশেষত বিজেপি–‌র অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ইতিবাচক রাজনৈতিক বক্তব্য। তৃতীয় ‘‌পর্ব’‌ মিশে থাকল ৭৫ মিনিট জুড়ে। উদ্দীপ্ত করলেন কর্মীদের, আশ্বস্ত করলেন রাজ্যবাসীকে। ২১ জুলাইয়ের সভায় প্রাণবন্ত পরিবেশ ছিল না। ভার্চুয়াল সভা। কিন্তু দূর–‌ভাষণ শুনেও মনে হচ্ছিল, জনতার সামনেই বলছেন। যেন, সামনে লক্ষ লক্ষ মানুষ। কী করে পারলেন মমতা?‌ পারলেন, কারণ তঁার সঙ্গে জনতার সংযোগ তুলনাহীন। বাংলা দেখল মুখ্যমন্ত্রীর মুখ, শুনল তঁার কথা। বাংলা শুনল জননেত্রীর কথা। ফুল হয়ে ঝরে পড়ল তেজি–‌বার্তা। বাংলার মুখ। ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top