প্রধানমন্ত্রী বলছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বলছেন, কাশ্মীরে শান্তি ফিরছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক। কতটা স্বাভাবিক, তা জানা গেল ২৯ অক্টোবর রাতে। কুলগামে জঙ্গিদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে প্রাণ গেল মুর্শিদাবাদের ৫ শ্রমজীবীর। ৫ বাঙালির। ১ লক্ষ সেনা কাশ্মীরে। ‘‌নিশ্ছিদ্র’‌ নিরাপত্তা!‌ মুর্শিদাবাদের বাহালনগর গ্রাম কী বুঝল?‌ আমরা কী বুঝছি?‌
২৯ অক্টোবর কাশ্মীরে গেলেন ইওরোপীয় ইউনিয়নের ২৩ সাংসদ। সবাই অতি–‌দক্ষিণপন্থী। অনেকে নব্য–‌নাৎসিবাদী। ইওরোপীয় ইউনিয়নের অনুমোদিত প্রতিনিধি–‌দল নয়। কারা বাছল?‌ ৭২ বছর ধরে ভারত একটা নির্দিষ্ট অবস্থান ধরে রেখেছে, কাশ্মীর দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়, কোনও বিদেশির তাতে ঢোকার প্রশ্ন নেই। এক ধাক্কায় সেই নীতি থেকে সরে এল সরকার। কেন্দ্র বলছে, তারা যুক্ত নয়, এনেছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। দেশের বিরোধী নেতাদের, সাংসদদের প্রবেশ নিষেধ। বন্দি কাশ্মীরের ৩ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী–‌সহ অসংখ্য রাজনীতিক, সমাজকর্মী। সরকার ‘‌যুক্ত নয়’‌, তবু একদল বিদেশি ঢুকে গেলেন!‌ প্রধান উদ্যোক্তা ম্যাডি শর্মা নামে একজন। টুইটার অ্যাকাউন্টে নিজের পরিচয় দিচ্ছেন— ‘‌ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ব্রোকার।’‌ ম্যাডি শর্মার নটিংহ্যামের ঘোষিত দপ্তরে খোঁজ নিয়ে, অস্তিত্বই পেল না এনডি টিভি। যে–‌সংস্থা দিল্লিতে ম্যাডি শর্মার সহযোগী, তাদের সফদরজং রোড অফিসে গিয়ে দেখা গেল, অস্তিত্বই নেই। সরকার যুক্ত নয়?‌ কাশ্মীর যাওয়ার আগে ২৩ বিদেশি বৈঠক করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। বিপুল নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অতি–‌দক্ষিণপন্থী বিদেশিরা টুকটাক ঘুরলেন, কনডাকটেড ট্যুর। ডাল লেকে শিকারা ভ্রমণ। আশ্চর্য হাসিমুখ, যেন মজাদার সফরে এসেছেন।
জঙ্গিদের প্ররোচিত করা হল কি পরিকল্পিতভাবে?‌ ‘‌পূর্ব পরিকল্পিত’‌, যা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন?‌ প্রশ্নচিহ্নের দরকার আছে?‌
ওই নৃশংস জঙ্গিরা নাকি ‘‌ইসলামি’‌ আদর্শে জেহাদি। খুন করল ৫ মুসলিমকে। পুলওয়ামার মতো এটাও কি ঘটতে দেওয়া হল, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার এবং বিষাক্ত প্রচার বাড়ানো যায়?‌ শ্রীনগর ও কুলগামের ৬ অধিবাসী সংবাদমাধ্যমের কাছে বলেছেন, যা হয়েছে, তা ‘‌কাশ্মীরিয়ৎ’‌–‌এর অপমান, তীব্র ধিক্কার।
মমতা ব্যানার্জি সেদিনই বললেন, পরদিনও, যথাযথ তদন্ত হোক, সত্য উদ্‌ঘাটিত হোক। ৫ বাঙালিকে কেন নৃশংসভাবে খুন হতে হল, জবাব চাই। শুধু বিবৃতি দিয়েই থেমে গেলেন না। ৩০ তারিখই তাঁর নির্দেশে বাহালনগরে গেলেন তিন সাংসদ, এক মন্ত্রীও। ৩১ অক্টোবর কফিন–‌বন্দি দেহ এল, এয়ারপোর্ট থেকেই সঙ্গে থাকলেন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। কিছুক্ষণ পর আরেক মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুকনো কথার সান্ত্বনা নয়। মুখ্যমন্ত্রী নিহতদের পরিবারপিছু ৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তা দিলেন। এবং, প্রত্যেক পরিবার থেকে একজনের চাকরির আশ্বাস।
আর, কেন্দ্র?‌ বিজেপি?‌ ৩১ অক্টোবর গুজরাটে প্রধানমন্ত্রী বললেন, কাশ্মীরে জঙ্গি হামলা কমছে, শান্তি ফিরছে, সমৃদ্ধি আসছে!‌ কুলগাম নিয়ে একটা কথাও নেই। কেন?‌ বাঙালি হওয়ার অপরাধে?‌ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, তিনি কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ করে, রাজ্যকে ভাগ করে দিয়ে, কাশ্মীরকে কেন্দ্রশাসিত করে দিয়ে, ৩ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী–‌সহ নেতাদের বন্দি করে, ইন্টারনেট স্তব্ধ করে দিয়ে, শব্দ ও দৃশ্য দূষণকারী হয়ে উঠলেন, লম্ফঝম্পে বিশ্বরেকর্ড করলেন, তিনিও চুপ। অম্লান বদনে বলে গেলেন, কাশ্মীর স্বাভাবিক, পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে!‌ আর, এখানে, রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ?‌ বললেন, ওরা বাঙালি নয়!‌ শ্রমিক, সে তো অন্য রাজ্যের কয়েকজনও নিহত হয়েছেন আগে। ‘‌বাঙালি’‌ কথাটায় তাঁর আপত্তি। মমতা ব্যানার্জির সঙ্গত ক্ষোভ, গুজরাটিকে গুজরাটি বলা গেলে, বাঙালিকে বাঙালি বলা যাবে না?‌ দিলীপ ঘোষ আরও একটা কথা বলেন। ‘‌লজ্জা হওয়া উচিত, কাজ না পেয়ে অন্য রাজ্যে যেতে হচ্ছে এই রাজ্যের মানুষকে!‌’‌ ‘‌‌রাজনৈতিক বাল্যকাল’‌ শিক্ষার বয়স, শিখে নিন, জেনে নিন।
মুর্শিদাবাদের এই শ্রমিকরা দশ মাস এখানেই চাষবাস করেন। ধান পোঁতার পর দু’‌মাস কিছু করার থাকে না, কাশ্মীরে আপেল বাগানে ফল পেড়ে বাক্সে ঢোকানোর ও ট্রাকে তোলার কাজ করেন। দুটো মাসে বাড়তি কিছু রোজগার চাইবেন না?‌ কে না চায়?‌
এবং দিলীপ ঘোষ জবাব দিতে পারবেন না, তবে একটু ‘‌লজ্জা’‌ থাকা ভাল, ভাবুন, বাংলায় ভিন রাজ্য থেকে কত মানুষ কাজের জন্য আসেন। এতই অনুকূল পরিবেশ, যে, অনেকে থেকেও যান। বাংলায় কত এলাকায় অ–‌বঙ্গভাষী মানুষরা আছেন, ভালই আছেন, জানেন না?‌ সেই এলাকাগুলো টার্গেট নয় বিজেপি–‌র। তবু, মমতা ব্যানার্জি মনে করেন, খাঁটি বাঙালিয়ানার অপরিহার্য অংশ হল উদার মনোভাব। কোনও তুলনা হয়?‌
কুলগামে যা হল, বা, হতে দেওয়া হল, জবাব চাইছে ৫ নিহত বাঙালির পরিবার। জবাব চাইছে বাংলা। বাংলার হয়ে অবিসংবাদিত জননেত্রী মমতা ব্যানার্জি। দিলীপ ঘোষরা জবাব দিতে পারবেন না। একটু লজ্জিত তো হোন!‌ ‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top