৮ জুন, ২০১৭। বাংলার পাহাড়ের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। ইতিবাচক ও নেতিবাচক। আগের ৬ বছরে পাহাড়ে বারবার গেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। উন্নয়নের জোয়ার। সমতল ও পাহাড়বাসীর কৃত্রিম অনৈক্যের দেওয়াল ভাঙার চেষ্টা। ‌যখনই গেছেন, সাধারণ পাহাড়বাসী অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। বারবার থামতে ও নামতে হয়েছে তাঁকে। আন্তরিক। ৮ জুন, ২০১৭, মন্ত্রিসভার বৈঠক আয়োজিত হল দার্জিলিঙে, যা কখনও হয়নি, বার্তা, কতটা গুরুত্ব, কতটা কাছে টানার আন্তরিকতা। সাধারণ মানুষ স্বাগত জানালেন। কিন্তু, গুন্ডারা যা চায়, হিংস্র বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যা চায়, তাদের উপযুক্ত প্রতিনিধি বিমল গুরুং ভয় পেলেন। পাহাড়কে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ করে রাখা যাবে না আর, সুতরাং, ভয়ঙ্কর হামলা। ভানুভক্ত ভবনের নিরাপদ আশ্রয়ে বসে ওরা পাহাড় জুড়ে অশান্তি বাধাল। সবাইকে নিরাপদে আগে নামিয়ে, মুখ্যমন্ত্রী এলেন সবার পরে, শেষে। একটাও উত্তপ্ত কথা নয়, গড়ার নির্ভেজাল প্রতিজ্ঞা।
এমনিতে পাহাড়ের মানুষ শান্তিপ্রিয়। জাতিসত্তার একটা আবেগ বরাবরই ছিল। কিন্তু গুন্ডামি পছন্দ নয় ওঁদের। গুরুংরা জানেন। এই শান্তিপ্রিয় মানুষদের ভয় দেখানো সবচেয়ে সহজ। গুরুং–‌গিরিরা বুঝলেন, মমতা চাইছেন পাহাড়কে সমতলের কাছে এনে বহুকালের দেওয়াল ভেঙে দিতে, উন্নয়নে মানুষের মন জয় করে বিচ্ছিন্নতাবাদের শিকড় উপড়ে দিতে। গুরুংরা প্রথমে উদ্বিগ্ন হন, ন্যূনতম অডিট করানোয়। চুরিচামারি বন্ধ হলে চলে!‌ পাশাপাশি ওঁদের রাজনীতিটাই তো ভাগ করার রাজনীতি, পাহাড়–‌সমতল ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেলে মুশকিল। প্রচুর অর্থ ও মদত। এখন বুঝতে অসুবিধে হয় না, মদত এসেছিল কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে, বিজেপি–‌র থেকে, যারা ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসেছে। একটা লোকসভা কেন্দ্রে হিংসায় মদত দিয়ে লাভ?‌ বিজেপি নেতারা বুঝে গিয়েছিলেন, তাঁদের সাম্প্রদায়িক সর্বনাশা নীতির বিরুদ্ধে অতন্দ্র প্রহরী মমতা ব্যানার্জি। তাঁকে ব্যতিব্যস্ত রাখতে হবে। পর্যটকরা সন্ত্রস্ত হয়ে নেমে এলেন। চা–‌বাগানে কাজ বন্ধ। স্কুল বন্ধ। হেরিটেজ ভবনে, টয়ট্রেন স্টেশনে আগুন।
মুখ্যমন্ত্রী কি পাল্টা কঠোর ব্যবস্থা নিলেন?‌ না। কথা চালিয়ে গেলেন অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য নেতাদের সঙ্গে। উন্নয়ন ধরে রাখলেন। জানেন, বিশ্বাস করেন, আজ হোক বা কাল, বড়জোর পরশু, বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে পরাজিত করে অখণ্ড বাংলা ধরে রাখবেন। মোর্চার একাংশ, বিনয় তামাং–‌অনীত থাপারা গুরুংকে অগ্রাহ্য করে শান্তির ডাকে সাড়া দিলেন। মনে রাখা ভাল, চার পুরভোটে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে লড়ে তৃণমূল ভাল সমর্থন পেয়েছে। খোদ দার্জিলিঙে ৩০ শতাংশ। মিরিকে জয়। কিছু স্থানীয় তৃণমূল নেতা চেয়েছেন, এককভাবে পাহাড়ে রাজনীতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করুক দল। নেত্রী ঠিক তেমন ভাবেননি। বাইরে থেকে নেতৃত্ব চাপিয়ে দেননি।
বিজেপি (‌আগে কংগ্রেসও)‌ বহিরাগতদের সংসদে পাঠানোর চেষ্টা করে। মমতা রাজ্যসভায় পাঠালেন দার্জিলিঙের ভূমিকন্যা শান্তা ছেত্রিকে। দার্জিলিং পুরসভায় দরাদরির দিকে না গিয়ে মোর্চার সম্মানিত নেতা অমর বাহাদুর রাইকে চেয়ারম্যান পদে নিঃশর্ত সমর্থন দিলেন।
প্রশ্ন হল, তবু, তবুও কী করে দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রে জিতে গেলন বিজেপি–‌র রাজু সিং বিস্ত?‌ এক, বিপুল অর্থ, গেরুয়া মদত। দুই, বিনয় তামাং ও তাঁর সঙ্গীরা কিছুটা ব্যর্থ। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে উন্নয়নের বার্তা দিয়ে নতুন 
রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। হ্যাঁ, ব্যর্থ, অংশত। সম্ভবত দু–‌নৌকোয় পা দিয়ে, নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করায় দ্বিধা ছিল, নিজেদের অতীতের কথা মাথায় রেখে। ব্যর্থ, কারণ, গুন্ডামির বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার যখন ন্যূনতম ব্যবস্থা নিয়েছে, তার পক্ষে স্পষ্ট প্রচার করতে পারেননি। অক্ষমতা না দ্বিধা, ওঁরাই জানেন।
পাহাড়–‌সংলগ্ন উত্তরবঙ্গে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে কী না করেছে বিজেপি। অখণ্ড শক্তিশালী ভারত গড়ার বুলি যাঁদের মুখে খই হয়ে ফুটছে, তাঁরাই সঙ্কীর্ণ স্বার্থে খণ্ডবাদীদের সঙ্গে। কামতাপুরি, গ্রেটার কোচবিহার নেতাদের কিনে নিয়ে, হ্যাঁ, শুনতে কর্কশ শোনালেও বলতেই হয়, ‘‌কিনে নিয়ে’‌ শান্ত উত্তরবঙ্গকে তাতিয়ে দিলেন। সিট চাই, সিট। ক্ষমতা চাই, ক্ষমতা। আদিবাসীদের জন্য কী না করেছেন মমতা?‌ সেই আদিবাসীদের মধ্যে বিষ ঢুকিয়ে দিল বিজেপি। পাহাড়ে অস্থিরতা সেই ছকের অপরিহার্য অঙ্গ।
যা একটু–‌একটু করে ভালর দিকে যাচ্ছিল, তাকে তছনছ করার চক্রান্ত চলছে। পাহাড়ের মানুষের কথা ভাবুন। তিনটে স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের কর্মসংস্থান। তিনটে ‘‌টি’‌। টি, টিম্বার, ট্যুরিজম। টিম্বার, কাঠের সদ্ব্যবহার হতে দেয়নি পাহাড়ের লুঠেরারা, গুরুং–‌গিরিরা চ্যাম্পিয়ন। গাছ বেআইনিভাবে কেটে, টিম্বার ইন্ডাস্ট্রিকে ক্ষতবিক্ষত করে দেওয়া হয়েছে। চা–‌বাগানে অশান্তি পাকিয়ে ‌দ্বিতীয় পথটাতেও কাঁটা। ২০১৪ সালে পাহাড়ে প্রচারে এসে তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিছুই করেনি কেন্দ্র, মনে পড়ে কি আজকের অর্থমন্ত্রীর?‌ পর্যটন?‌ অনিশ্চয়তার মেঘ।
সমান্তরাল পথে গিয়ে, মুখ্যমন্ত্রী পাহাড়কে সমৃদ্ধ করতে চেয়েছেন। নামী স্কুলগুলোয় নিরাপত্তা ও সাহায্য দিয়েছেন। পর্যটনে বিশৃঙ্খলা হতে দেননি। বিজনেস সামিট করেছেন দার্জিলিঙে। শিল্পপতিরা কথা দিয়ে এসেছেন, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও পর্যটনে হাত লাগাবেন। গুরুংরা তা হতে দেবেন না। মংপুতে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার পথে রাজ্য। তিনটি শক্তিশালী শিল্পগোষ্ঠী পাহাড়ে এডুকেশন হাব করতে চেয়েছে। কী করে হবে লগ্নি, যদি অশান্তির আবহ থাকে?‌ পাহাড়কে দরিদ্র রাখতে চায় গুরুং–‌বিজেপি চক্র, সেই দারিদ্র‌্যই তাদের মূলধন।
মমতাকে ব্যতিব্যস্ত করা ছাড়াও আর কী চায় বিজেপি?‌ গভীর, গভীর ষড়যন্ত্র। সাংসদ বিস্ত, যিনি দার্জিলিং পাহাড়ের লোকই নন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি দিলেন, গোর্খাল্যান্ড রাজ্য চেয়ে। অমিত শাহ জবাবে যে চিঠি দিলেন, তার ভাষায় ‘‌গোর্খাল্যান্ড’‌ রাজ্যের দাবিকে কার্যত মান্যতা দেওয়া হল। এখানেই প্রশ্ন এবং সেই প্রশ্ন আমাদের তুলেই যেতে হবে। কী চান অমিত শাহরা?‌ আজ না হোক পরশু, ওঁরা কি পাহাড়কে বাংলা থেকে আলাদা করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করে দিতে চান?‌ সরাসরি প্রশ্ন, রাজ্য বিজেপি নেতাদের, আপনারা কী চান?‌ রাজ্য খণ্ড–‌বিখণ্ড হয়ে যাক?‌ হয় বলুন, হ্যাঁ, না হয় বলুন, কেন্দ্রের এবং মোর্চার ইচ্ছায় সায় নেই, মোটেও নেই। বলছেন না। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তর ভাষায় বাংলার ‘‌শৃঙ্গমুকুট’‌ পাহাড়কে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার চক্রান্তে রাজ্য বিজেপি–‌ও শামিল, সঙ্কীর্ণ স্বার্থে, তা স্পষ্ট থাকুক। একটা, মাত্র একটা লোকসভা আসন পাওয়ার জন্য এত ছক?‌ নাকি বাংলাকে ভাগ করার গভীর চক্রান্ত?‌ ২০২১ সালে বিধানসভা ভোট। ধরে নিলাম, পাহাড়ের ৩ কেন্দ্রে ওদের চক্রান্ত সফল। বাকি ২৯১ কেন্দ্র?‌ বাঙালিকে জানাতে হবে, বোঝাতে হবে, তাঁরা বুঝবেনও, বিজেপি বাংলার শত্রু। পাহাড় কাছে আসতে চায় না?‌ নাকি, পাহাড়বাসীকে কাছে আনতে দেওয়া হচ্ছে না?‌ কারা ষড়যন্ত্রকারী?‌ তাদের পরাস্ত করাই হোক বাঙালির অঙ্গীকার।

জনপ্রিয়

Back To Top