অবশেষে বিজেপি–‌র ইস্তাহার প্রকাশিত হল। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী জোর দিলেন মার্কামারা ‘‌দেশপ্রেম’‌ ছাড়াও দুটো বিষয়ে। স্বাধীনতার শতবর্ষে, ২০৪৭ সালে ভারতকে ‘‌উন্নয়নশীল’‌ থেকে ‘‌উন্নত’‌ দেশ করে ফেলবে বিজেপি। ২৮ বছর পরেও। সে জন্য মোদির দলকে জিততে হবে ৬টা লোকসভা নির্বাচন। এবং নমোর বয়স তখন ৯৬ পার। কথা শুনে মনে হল, ব্যাপারটা ঘটাবেন তিনিই। ধন্য আশা কুহকিনী!‌
আরও জানালেন এবার ভোটে জেতার পর পরিকাঠামোয় তাঁর সরকার খরচ করবে ১ কোটি ২৬ লক্ষ কোটি টাকা। ভাবুন। রাহুল গান্ধীর ‘‌ন্যায়’‌ প্রকল্পে খরচ হবে ৩ লক্ষ ২৪ হাজার কোটি টাকা। সঙ্গত প্রশ্ন উঠেছে, এত টাকা কোথা থেকে আসবে?‌ মধ্যবিত্তদের ওপর কর বসিয়ে?‌ চলতি কিছু প্রকল্প বন্ধ করে দিয়ে?‌ মোদি বলছেন, পরিকাঠামোয় খরচ করবেন ১ কোটি ২৬ লক্ষ কোটি টাকা। কোথা থেকে আসবে, স্যর?‌ উত্তর নেই। তিনি উত্তর দেন না। শুধু নিজের কথা বলে যান।
নমো, ইস্যুতে আসুন। এবার ইস্তাহারে কর্মসংস্থান বিষয়ে কোনও সংখ্যা নেই। ২০১৪ সালে ঘোষণা ছিল ৫ বছরে ১০ কোটি চাকরির ব্যবস্থা করবেন। বছরে ২ কোটি। ১০ কোটি তরুণের চাকরি হয়ে গেলে, যুদ্ধের বাদ্যি বাজাতে হত না, এমনিতেই জিতে যেতেন। মিথ্যাচারও করতে হত না। তরুণরা ঢেলে ভোট দিতেন। বাস্তবে কী হয়েছে?‌ কতটা হয়েছে?‌ চাকরি কমেছে আড়াই কোটি!‌ হিসেব?‌ তাঁকে দিয়ে লাভ নেই। বিপর্যয়?‌ তাঁকে মনে করিয়ে লাভ নেই। কর্মসংস্থানে নিরঙ্কুশ ব্যর্থতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে তিনি জবাব দেন না। শুধু দু–‌চারটে এলোমেলো কথা বলে বীরত্ব প্রসঙ্গে চলে যান। সেনাবাহিনীর কৃতিত্বকে নিজের এবং নিজেরই কৃতিত্ব বলে দাবি করে বক্তৃতায় তালি বাজান। যেন খুব মজার ব্যাপার। যুদ্ধের বদলে এরা চাকরির কথা বলে, নিশ্চয় ‘‌দেশদ্রোহী’‌!‌
মোদি মহোদয়, ইস্যুতে আসুন। বিদেশে গচ্ছিত ‘‌কালা ধন’‌ উদ্ধার করে প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কতটা পেরেছেন?‌ কাছাকাছি?‌ ঘটনা, এক পয়সাও জমা পড়েনি। এক পয়সাও ফেরেনি। তবু নিজের ঢাক পিটিয়ে চলেছেন শ্রীযুক্ত ৫৬ ইঞ্চি। প্রশ্নের উত্তর নেই। আছে বলতে একটাই, সঙ্গত ও জ্বলন্ত প্রশ্ন তুললেই ‘‌দেশদ্রোহী’‌ বলে দেওয়া। তিনি দেশপ্রেমিক বটে, সফল তো বটেই। চাকরি দিতে পারেননি। কালো টাকা ফেরাতে পারেননি। শুধু শেষবেলায় ইমরান খানের একটা সার্টিফিকেট জোগাড় করতে পেরেছেন।
নমো, ইস্যুতে আসুন। কাঁপা গলায়, নাটকীয় ভঙ্গিতে নোটবন্দির ঘোষণার সময় বলেছিলেন, কালো টাকা উড়ে যাবে, ব্যাঙ্কে ফিরবে সাদা টাকা, দেশের মানুষ ‘‌কালো’‌ ব্যাপারটা থেকে মুক্ত হবেন। দেখা গেল, বাজারে থাকা নোটের ৯৯.‌৩ শতাংশ ফিরে এল ব্যাঙ্কে। সুদের বোঝা বাড়ল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের। বলেছিলেন, কাঁচা টাকা বাজেয়াপ্ত করার সূত্রে জঙ্গি উৎপাত কমবে। কাশ্মীরে জঙ্গি হামলা বেড়েছে। গত ৫ বছরে ২২৭ শতাংশ। উত্তর?‌ নেই। ছাতি ফুলিয়ে ভোট চাওয়া?‌ আছে। শতাধিক ভারতবাসী প্রাণ হারিয়েছিলেন নোটবন্দির জেরে। কাজ হারিয়েছিলেন দেড় কোটি। শোক?‌ নেই?‌ দুঃখ?‌ নেই?‌ ব্যর্থতা স্বীকার?‌ নেই। আছে শুধু বালাকোট। ঝাপসা বালাকোট।
কৃষকদের আয় অন্তত দ্বিগুণ করার কথা বলেছিলেন। দুর্গতি বেড়েছে। নাসিক থেকে মুম্বই ‘‌লং মার্চ’‌ তাঁকে চিন্তিত করেনি। খোদ দিল্লিতে দুর্গত কৃষকদের মিছিল তাঁকে বিব্রত করেনি। ১২ হাজার কৃষকের আত্মহত্যা তাঁকে বিচলিত করেনি। তিনি বীর। এই মহাবীরকে বিপুল জয় দিতে হবে, মানুষের কাছে তাঁর আবদার। ভুল বলা হল। আবদার কীসের!‌ দাবি। প্রায় হুমকি। সমর্থন করো, নয়তো তুমি দেশদ্রোহী। 
রাফাল কেলেঙ্কারি নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামনকে দিয়ে মিথ্যা বলিয়েছেন সংসদে। প্রচারে বলছেন সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, কোনও ঘোটালা নেই। বাস্তব, সিএজি রিপোর্ট নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়েছিল সরকার। এন রাম ফাঁস করে দিয়েছেন নথি, তাতে পরিষ্কার, প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ভারপ্রাপ্ত কমিটির সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করে চুক্তি করেছেন, বন্ধু অনিল আম্বানিকে ৩০ হাজার কোটি টাকা পাইয়ে দিয়েছেন। আওয়াজ উঠেছে, চৌকিদার চোর হ্যায়, চৌকিদার ঝুটা হ্যায়। প্রসঙ্গত, নিজেকে দেশের ‘‌চৌকিদার’‌ বলেছিলেন তিনিই। এত যে লেকচার দিচ্ছেন, কোথাও কোনও জবাব নেই। জবাব দেওয়া তাঁর ধাতে নেই। এমন চৌকিদারকে চান ভারতবাসী?‌
শত্রুঘ্ন সিনহার ভাষায় ‘‌স্যরজি’‌, ইস্যুতে আসুন। শুধুই বীরত্ব?‌‌‌ প্রশ্ন করছেন, তাঁর মতো দেশপ্রেমিক আর কেউ আছে?‌ তাঁর মতো সফল আর কেউ আছে?‌ বলি। বালাকোট অভিযান নিয়ে তথ্য দেওয়ার দাবি না–‌ই বা মানলেন। আরেক দফা ‘‌দেশদ্রোহী’‌ বলে দাগিয়ে দিলেন। কিন্তু, পুলওয়ামা কেন?‌ গোয়েন্দা সতর্কতা ছিল। একসঙ্গে এত জওয়ানকে নিয়ে যাওয়া সিদ্ধান্ত ভুল, ঘটনা। বিমানে বা ট্রেনে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। নমো, আপনার দেশপ্রেম–‌সংক্রান্ত হুঙ্কারমূলক প্রশ্নের একটা উত্তর দিই। ভোটের মুখে তথাকথিত বালাকোট সাফল্য রটিয়ে দেওয়া চক্রান্তের অংশ, পুলওয়ামায় ইচ্ছাকৃত গাফিলতি। ৪০ জওয়ানের প্রাণের বিনিময়ে ভোটে জেতার নিষ্ঠুর চক্রান্ত। আমরা সরাসরি একটা উত্তর দিলাম। একশো প্রশ্নের একটারও উত্তর দেবেন কি?‌ ৯১ কেন্দ্রে ভোট হয়ে গেছে?‌ বাকি ৪৫২। এখনও সময় আছে, একটা উত্তর দিন না ৫৬ ইঞ্চি?‌ সামান্য প্রার্থনা।

জনপ্রিয়

Back To Top