সীমান্তে চীনের সঙ্গে সঙ্ঘর্ষ ১৫ জুন। ৫ মে থেকেই গালোয়ান উপত্যকায় বেশ কিছুটা ঢুকে আসছিল চীন। ভারতের প্রতিক্রিয়া কতটা কঠোর?‌ পাকিস্তানের ঘরে ঢুকে মেরে আসার ঘোষণা রূপায়িত হয়েছিল। বালাকোট। দেশ জুড়ে উদ্দীপনা, উত্তেজনা। চীনের ক্ষেত্রে নরম কেন?‌ প্রথম কারণটা জানা, সামরিক শক্তিতে এই শত্রুর চেয়ে আমরা অনেক পিছিয়ে। পাকিস্তান দুর্বল। যা ওদের সঙ্গে করা যায়, চীনের সঙ্গে করা গেল না। ভাসা–‌ভাসা দেশাত্ববোধক কথার বাইরে গেলেন না প্রধানমন্ত্রী। গেল না তঁার দল। দ্বিতীয়ত, সাম্প্রদায়িক জিগির তোলা সম্ভব নয়। হিংস্র প্রচার করে রাজনৈতিক লাভ নেই। 
দেশ ঐক্যবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও বৈঠকে বিরোধীরা সরকারের সঙ্গে থাকার অঙ্গীকার করেছেন। ভিন্ন সুর বাজেনি কারও গলায়। তৃণমূল নেত্রী তথা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেন, এক হয়ে থাকতে হবে, লড়তে হবে। শুধু চাইব, কেন্দ্রীয় সরকার যেন প্রকৃত তথ্য দিয়ে সব দলকে অবহিত রাখে, দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে। বলা বাহুল্য, মমতা রণকৌশলের খঁুটিনাটি নিয়ে জানতে চাননি। জানতে চান, আমরা সবাই জানতে চাই, সীমান্তে প্রকৃত অবস্থাটা কী?‌ ঢুকে পড়েছে চীন?‌ ঢুকলে, কতটা?‌ কী ভাবছেন প্রধানমন্ত্রী?‌ 
১৫ জুন সীমান্তে চীনা সেনার হাতে ২০ ভারতীয় জওয়ান শহিদ হন। অফিসার–‌সহ ১০ জনকে বন্দি হতে হয়েছিল শত্রুপক্ষের হাতে। আলোচনার পর ছাড়া পেয়েছেন। বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর ফোনে কথা বলেন চীনের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে। ওরা যে ঢুকেছে, দখল করে আছে, বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র অনুরাগ শ্রীবাস্তব সাংবাদিকদের বলেছেন। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা লঙ্ঘন করা হয়েছে, সন্দেহ নেই।
মুশকিলটা হল সর্বদলীয় ভিডিও বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি বাক্যে:‌ কেউ আমাদের এলাকায় ঢোকেনি, কেউ ঢুকে বসে নেই।.‌.‌.‌ তাহলে বিদেশমন্ত্রকের বক্তব্য কি ভিত্তিহীন ছিল?‌ যদি না–‌ই ঢুকে থাকে চীনা সেনা, আমাদের ২০ জওয়ানকে প্রাণ দিতে হল কেন?‌ প্রধানমন্ত্রী কি বলতে চাইলেন, আমরাই ঢুকেছিলাম?‌ বিশ্বাস করি না। চাই, প্রকৃত তথ্য দেওয়া হোক, যে–‌দাবি পেশ করেছেন মমতা ব্যানার্জি। 
আমাদের বলশালী প্রধানমন্ত্রী ৬ বছরে ৫ বার চীনে গেছেন। বলা হয়েছে, সফল সফর। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও গেছেন ৬ বার। শি জিন পিং যখন ভারতে এলেন মহাবলিপুরমে বহুল প্রচারিত বৈঠক। দুই প্রধানের সখ্যের ছবি সেখানে দেখা গেল। যখন আমেদাবাদে, সবরমতী আশ্রমের সামনে ওঁদের দুজনকে দোলনায় দুলতে দেখা গেল।.‌.‌.‌ সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে.‌.‌.‌। পারস্পরিক সুসম্পর্ক নিয়ে সংশয় থাকল না। সেই দুরন্ত কূটনীতি আমাদের কী দিল?‌ নিল ২০ শহিদের প্রাণ। দিল অপমান। এবং, আক্রমণের জবাবে শেষমেশ মোদির বক্তব্য, কেউ ঢোকেনি, কেউ ঢুকে বসে নেই!‌
আওয়াজ উঠল, চীনা পণ্য বয়কট করতে হবে। শুধু আওয়াজ নয়, কিছু জায়গায় পোড়ানোও হল চীনা পণ্য। আরএসএস বয়কটের দাবিকে তুঙ্গে নিতে চাইল। সরকার?‌ বাস্তবটা দেখা যাক। বয়কট করলেই চীনের অর্থনীতি ধরাশায়ী হবে, তা নয়। ওদের রপ্তানির মাত্র ৩ শতাংশ ভারতে। গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে চীনা পণ্য। হাতে নয়, ভাতে মারার কথা বলতে গেলে ‘‌স্বনির্ভর’‌ হতে হয়। কথাটা প্রধানমন্ত্রী আগেই উচ্চস্বরে বলেছেন, মুশকিল, মুশকিল। ভারতে যত স্মার্টফোন, এবং যন্ত্রাংশ, ৮০% চীনের। বয়কট করলে, দাম তিনগুণ বাড়বে। বয়লার, রিঅ্যাক্টর, নানা ক্ষেত্রে ভারত চীন–‌নির্ভর। সফল স্টার্ট আপ কোম্পানিগুলোর দিকে তাকান। ওলা, ফ্লিপকার্ট থেকে জোমাটো, পেটিএম থেকে সুইগি, প্রধান বিনিয়োগ চীনের। জেনে বা না–‌জেনে ঘরে ঘরে যা আমরা ব্যবহার করছি, চীনা পণ্য। দেব–‌দেবতার মূর্তিও তৈরি হয়ে আসছে চীন থেকে। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি, পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ (‌হেরে গেছে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি), তৈরি করেছে চীন। ৭৬% ওষুধের কঁাচা মাল আসে ওই দেশ থেকে। সেনাবাহিনীর বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটের প্রায় সবটাই আসে চীন থেকে। ‘‌স্বনির্ভর’‌ হওয়ার জন্য ৫৬ ইঞ্চির সরকার কী করেছে?‌
বয়কট মানে কী?‌ একটা আশ্চর্য কথা বলেছেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কোষাধ্যক্ষ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুরের ভাই অরুণ ধুমল। বললেন, ‘‌আমাদের কোনও ক্ষতি হবে না। চুক্তি অনুযায়ী আরও ২৫০০ কোটি টাকা আমরা পাব ওদের দেশের কোম্পানি থেকে, না দিয়ে যাবে কোথায়?‌’‌ কিন্তু, ভারতীয় ক্রিকেটারদের জার্সিতে, বুকে লেখা থাকবে চীনা কোম্পানি ‘‌ভিভো’–‌র নাম!‌
চীনা–‌বিদ্বেষ কতদূর যেতে পারে?‌ এমনিতেই, মঙ্গোলয়েড ধঁাচের মুখের জন্য উত্তর–‌পূর্ব ভারতের মানুষদের দেশের নানা স্তরে অপমানিত হতে হয়। চিঙ্কি!‌ ভারতবাসীর একাংশকে লাঞ্ছনার দিকে আরও ঠেলে দেওয়া হবে?‌ এটাকেই বলব ‘‌ঐক্যবদ্ধ ভারত’‌?‌ দেশটাকে গড়তে চাই, নাকি ভাঙতে?‌
ধরুন, সীমান্ত সঙ্ঘাত একটা সাধারণ ‘‌মামলা’‌। প্রতিবেশী একজনের বাড়িতে জোর করে ঢুকছে, একটা ঘর দখল করে আছে। যঁার ঘর, তিনি বলছেন, কেউ ঢোকেনি, কেউ ঘরে ঢুকে বসে নেই। আর, দখলদার প্রতিবেশী বলছেন, ঢুকেছি, ঘরটা আমাদের!‌ আজব মামলা।

জনপ্রিয়

Back To Top