কিছু এলাকায় সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায়, কড়া নজর রাখছে প্রশাসন। কন্টেনমেন্ট জোন–‌এ সতর্কতা। বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া বিচিত্র। একজন বললেন, রাজ্যে তো লকডাউন ঠিকমতো হয়নি, সরকার ব্যর্থ। এক নেতা বললেন, লকডাউন তো ভাল হয়েছে, তবু আক্রান্ত বাড়ছে কেন?‌ সরকার ব্যর্থ। একই দলের অন্য নেতা বলে দিলেন, লকডাউন, আনলক কিছুই ঠিক হয়নি। সরকার ব্যর্থ। নানা ধরনের বক্তব্য, শেষে একটাই বাক্য:‌ সরকার ব্যর্থ। দুশ্চিন্তা নেই, উদ্বেগ নেই, শুধু সরকারকে ব্যর্থ বলে যাওয়া।
রাজ্যে সতর্কতা বিধি অন্তত ৮০ শতাংশ মানুষ মেনেছেন। কিন্তু বাকি ২০ শতাংশই যথেষ্ট, সমস্যা বাড়ানোর জন্য। অন্তত ৭ দিন কড়া নজর নির্দিষ্ট এলাকায়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, যদি পরিস্থিতির উন্নতি হয়, এই সব এলাকায় কড়াকড়ি শিথিল করা হতে পারে। যদি সতর্কতা বিধি না মানা হয়, যদি পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, নজরদারি আরও কঠোর হবে।
 মাস্ক মাস্ট। কিন্তু পরছেন না‌ কিছু দায়িত্বজ্ঞানহীন নাগরিক। ধরলে, কেউ বলছেন, এই তো এখনই বেরোলাম, মাস্ক আনিনি। কেউ বলছেন, পকেটে আছে। কেউ গলায় ঝুলিয়ে রাখছেন, যেন আলগা টাই। ফ্যাশন। পরিচিত জনকে বলে দিচ্ছেন, আমার কিছু হবে না। মাস্ক পরা মানে ‘‌বহুৎ ঝামেলা’‌। দোকানের সামনে লেখা, ‘‌মাস্ক না পরলে জিনিস বিক্রি হবে না’‌। ক্রেতা, বিক্রেতা কারও মুখে মাস্ক নেই। বহুৎ ঝামেলা!‌
প্রথম থেকে বলা হচ্ছে, বেশ কয়েকবার সাবান দিয়ে হাত ধোবেন। জিজ্ঞেস করা হল, ক’‌বার ধুচ্ছেন?‌ ‘‌পরশু দু’‌বার ধুয়েছিলাম, কাল একবার, আজ ভুলে গেছি!‌’‌ নিজের, পরিবারের, প্রতিবেশীদের সুস্থ রাখার জন্য এটুকু ‘‌ঝামেলা’‌–‌ও ‘‌বহুৎ’‌ মনে হচ্ছে কিছু লোকের।
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় একটি দুর্ধর্ষ কলাম লিখতেন— ‘‌বাজার সফর’‌। বই হিসেবেও জনপ্রিয়। বাজারের ইতিহাস, মাছ–‌সব্জির দাম, কীভাবে ভালটা বেছে নিতে হয়, রান্নায় কীভাবে নতুনত্ব আনা যায়, সব মিলিয়ে সুখপাঠ্য রচনা। কিছু মানুষ বইটা পড়েননি, কিন্তু নিয়মিত ‘‌বাজার সফর’‌ না করলে তঁাদের ভাত হজম হয় না। বারবার সতর্ক করা হয়েছে, বাজারে ভিড় করবেন না, সপ্তাহে একদিন বাজারে যান। তবু, শোনা যাচ্ছে : ‌আজ এসেছি পুঁইশাক আর কুচো চিংড়ি কিনতে!‌’‌ গতকাল?‌ ‘‌ঢ্যঁাড়স!‌’‌ এমন অল্প সংখ্যক মানুষ বাকি সকলের বিপদ বাড়াচ্ছেন, নিজেদের বিপদের মুখে ঠেলে তো দিচ্ছেনই। সংক্রমণের একটা বড় উৎস বাজার। চীন থেকে চেন্নাই, সর্বত্র। এখানেও। চেন্নাইয়ের একটি বাজার থেকে সংক্রমণ হয়েছে ৭৩৪ জনের। পড়ছি কিন্তু মানছি না।
দূরত্ব বিধি?‌ কিছু লোক বেপরোয়া। বাজার তো বটেই, সর্বত্র ডোন্ট কেয়ার ভাব। পাড়ার রকে তাস খেলা, চায়ের দোকানে গা–‌ঘেঁষে অবাক চা–‌পান। ময়দানে দেখা গেল, কিছু তরুণ ফুটবল খেলছেন নির্ভয়ে। একজন আরেক জনের গায়ে গা লাগিয়ে। জিজ্ঞেস করা হল, কেন এটা করছেন। সবার হয়ে একজনের উত্তর, ‘‌খেলাধুলো করলেই বডি ফিট থাকবে, করোনা হবে না। তাছাড়া, মনটা ভাল রাখা দরকার।’‌ তাঁরাই বাড়িতে যাচ্ছেন, পাড়ায় আড্ডা মারছেন, নিজেদের এবং অন্যদের বিপদে ফেলে দিচ্ছেন। ৮০ শতাংশ মানুষ সচেতন, তঁারাও এই বেপরোয়াদের জন্য সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রী বলে যাচ্ছেন, পুলিশ প্রচার করছে, তবু অসভ্যতা। অসভ্যরা ঠিক অর্থে ‘‌অশিক্ষিত’‌, আমার কিছু হবে না!‌
প্রথম থেকেই সতর্ক বার্তা, যেখানে–‌সেখানে থুতু ফেলবেন না। কিন্তু কিছু লোক থুতু ফেলার জন্য রাস্তাকেই উপযুক্ত জায়গা মনে করছেন। আর, গুটখা। পানপরাগ সংস্কৃতি। কিছু বঙ্গসন্তানও এখন এই কুৎসিত সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। পিক ফেলে শহরের ক্ষতি করছেন, এখনও হুঁশ নেই। আজকালের এক সাংবাদিক এমন একজনকে রাস্তায় থুতু ফেলতে দেখে বলেন, ‘‌কেন এটা করছেন?‌’ জবাব, ‘‌তো কোথায় পিক ফেলব, আপনার বাড়িতে?‌’‌
কফি হাউস খোলার খবরে অনেকে খুশি। বলা হয়েছে, মাস্ক ছাড়া নট অ্যালাউড। কাছাকাছি তিন–‌চারজনের বসার ছবি দেখলাম। মাস্ক ছাড়া ‘‌নট অ্যালাউড?‌’‌ তাহলে কি মাস্ক পরেই কফি পান করছেন?‌ কফি হাউস বঙ্গ সংস্কৃতির গর্বের অঙ্গ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার আসুন, তর্ক–‌আলোচনায় মাতুন, ভালবাসার ফুল প্রস্ফুটিত হোক। কিন্তু এখন?‌ বরং, কফি হাউস–‌প্রেমীরা কর্মীদের জন্য একটা ফান্ড তৈরি করতে পারতেন। বইপাড়ার জন্য যেমন, কফি হাউসের জন্যও কিছু টাকা দেওয়ার লোকের অভাব হত না।
বস্তি এলাকা নিয়ে ভয় হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল, পুরসভার মাইক্রো–প্ল্যানিং এবং বস্তিবাসীদের সাবধানতার জন্য সংক্রমণ কম। ১৫ শতাংশ। ৮৫ শতাংশ মধ্যবিত্ত–‌উচ্চমধ্যবিত্ত‌–‌উচ্চবিত্ত বহুতলবাসী ও ফ্ল্যাটবাসীদের মধ্যে। বেপরোয়া না হলে, অসতর্ক না হলে, এমনটা হতে পারত?
বিরোধীরা সরকারের নিন্দা করছেন ঘুম থেকে ওঠার পর, সারা দিন, ঘুমোতে যাওয়ার সময় পর্যন্ত। বিরোধীরা বিরোধিতা করবেন, করতেই পারেন। মুখ্যমন্ত্রী যখন প্রথম দিন থেকে সতর্কতা বিধির কথা বলছেন, বুঝিয়ে দিচ্ছেন, কোনও বিরোধী নেতা কি একবারও বলেছেন, সবাই বিধি মেনে চলুন, যাতে সুস্থ থাকা এবং রাখা যায়?‌ একজনও?‌ না। বিরোধী রাজনীতির নির্যাস একটা শব্দ—না!‌‌‌  ‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top