ধ্রুবজ্যোতি নন্দী: ভীমরাও আম্বেদকর রচিত ভারতের সংবিধানের যে হস্তলিখিত সচিত্র আদিগ্রন্থটি ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর কনস্টিট্যুয়েন্ট অ্যাসেম্বলির সভায় গৃহীত হয়েছিল, শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সেটির সামগ্রিক অলঙ্করণ করে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের শিল্প-ভাবনার যুগান্তরী ফসল কলাভবনের ছাত্রছাত্রীরা। কী ছিল রবীন্দ্রনাথের সেই শিল্প-ভাবনা? তিনি চেয়েছিলেন, চিত্রকলার ভারতীয় ছাত্রছাত্রীরা শুধুমাত্র ইউরোপীয় শিল্পরীতির নকলনবিশি না-করে দীক্ষিত হোক ভারতীয় চিত্রশিল্পের নিজস্ব ঐতিহ্যে। ভারতীয় চিত্রকলা বিকশিত হোক তার শিকড় থেকে আশ্লিষ্ট পুষ্টিতে।  একশ বছর আগে নন্দলাল বসুকে কলাভবনের অধ্যক্ষের দায়িত্বে বসিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে পরীক্ষা শুরু করেছিলেন, তা পাল্টে দিয়েছিল ভারতীয় শিল্পের দিগন্ত। এমনই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান শান্তিনিকেতনের কলাভবন।
সেই কলাভবনের শতবর্ষ উদযাপন শুরু হল শুক্রবার ৩০ নভেম্বর। তার আগের বিকেলে কলাভবন চত্বর থেকে বেরিয়ে আশ্রম প্রাঙ্গণ পরিক্রমা করে এসেছে সঙ্গীতমুখর এক বর্ণময় বৈতালিক। শুক্রবার সকালে খুলে দেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠার দিনটি থেকে এ যাবৎ কলাভবনের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ছাত্রছাত্রীদের শিল্পকীর্তির এক ঐতিহাসিক প্রদর্শনী। সেখানে সংকলিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, অসিত হালদার, সুরেন কর, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, মুকুল দে, রামকিঙ্কর বৈজ থেকে সত্যজিৎ রায়, দিনকর কৌশিক, সোমনাথ হোড়, শঙ্খ চৌধুরী, কে জি সুব্রহ্মণ্যন, রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়, সনৎ কর, যোগেন চৌধুরী, লালুপ্রসাদ সাউ প্রমুখ ৬০ জন চিত্রকরের অসামান্য নির্মাণ। সে প্রদর্শনীর উদ্বোধনী পর্বে বিদগ্ধ শিল্প-ঐতিহাসিক পি শিবকুমার বললেন, সূচনা থেকেই কলাভবন মহিলাদের যেভাবে চিত্রশিল্পে যুক্ত করেছে, উৎসাহ দিয়েছে, ভারতের শিল্প-শিক্ষার ইতিহাসে তার তুলনা নেই। শতবার্ষিকী প্রদর্শনীতে তাই বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে সংকলিত হয়েছে ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী, গৌরী ভঞ্জ, জয়া আপ্পাস্বামী, প্রতিমা ঠাকুর, সুনয়নী দেবী, ইন্দুসুধা ঘোষ, অনুকণা দাশগুপ্তা প্রমুখ শিল্পীদের কাজ। সন্ধ্যায় বছর-ভর শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানের সূচনার পর একান্ত আলাপচারিতায় কলাভবন অধ্যক্ষ গৌতম দাস বলছিলেন, এই মুহূর্তে কলাভবনে শিল্পকলার পাঠ নিচ্ছে ফ্রান্স, তুরস্ক, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপালের মতো বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ছাত্রছাত্রীরা। নেদারল্যান্ড, ব্রিটেনের ছাত্রছাত্রীরাও আসে প্রায় প্রতি বছর। এই মুহূর্তে ওই দুই দেশের ছাত্রছাত্রী কেউ নেই বটে, কিন্তু যোগ দেবে হয়ত আর কিছুদিনের মধ্যেই। ভারতের কটা শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেশ-বিদেশের এত ছাত্রছাত্রী পাওয়া যাবে? রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীকে নিয়ে ‘বিশ্ব বিদ্যা তীর্থ প্রাঙ্গণ’-এর যে স্বপ্ন রচনা করেছিলেন, একি তারই বাস্তবায়ন নয়?
তাহলে দেশ-বিদেশের ছাত্রছাত্রীদের এই সমাহারকেই কি বলতে পারি কলাভবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য? চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে শান্তিনিকেতনকে আপন করে নেওয়া মালায়লি চিত্রসাধক আর শিবকুমার, কলাভবনের অতিপরিচিত ‘শিবদা’ বললেন, তার চেয়েও বড় বৈশিষ্ট্য বোধহয় ছাত্রছাত্রীদের ওপর জোর করে কিছু চাপিয়ে না-দেওয়া। এখানকার সমস্ত ছাত্রছাত্রী যেমন শিক্ষকদের সঙ্গে মত-বিনিময়ের সুযোগ পায়, তেমনই উৎসাহ পায় তাদের নিজেদের মনের কথা শুনে কাজ করায়। দেশের বিভিন্ন শিল্প-শিক্ষায়তন ঘুরে আমি যা বুঝেছি, এই মুক্তমনা 
রবীন্দ্রনাথের শিল্প-ভাবনার এই অনন্যতার সঙ্গে সম্যক পরিচয় ছিল দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর। তাঁর প্রত্যক্ষ উৎসাহেই হস্তলিখিত সংবিধানটি অলঙ্করণের দায়িত্ব পেয়েছিল শান্তিনিকেতনের কলাভবন। কী অসাধারণ একটি শিল্পকর্ম তৈরি হয়েছিল তার ফলে। চিত্রিত সেই আদি সংবিধান গ্রন্থের পাতায় পাতায় মূল পাঠ ঘিরে ভারতের ইতিহাস এবং শিল্প-সৌকর্যের অসাধারণ নিদর্শন। প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে নন্দলালের আঁকা ছবি, সংখ্যায় মোট ২২। সেখানে মহেঞ্জোদড়ো, বৈদিক যুগ, গুপ্ত সাম্রাজ্য, মৌর্য সাম্রাজ্য, বুদ্ধ, মোগল সাম্রাজ্য, স্বাধীনতা সংগ্রামের চিত্রিত বর্ণনায় ভারতের ৪০০০ বছরের যাত্রাপথের এক অনন্য প্রতিফলন।
ভারত নামক রাষ্ট্রটির পরিচালনায় অসীম গুরুত্বপূর্ণ এই গ্রন্থটি তার অনন্য রূপ লাভ করেছিল যে শিল্পতীর্থে, তারই শতবর্ষ উদযাপনে এখনকার কেন্দ্রীয় সরকারের কী ভূমিকা? শতবর্ষ তহবিলে বিশেষ অনুদানের জন্যে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বভারতীর আচার্য নরেন্দ্র মোদির কাছে যৌথ স্বাক্ষরিত আবেদন করেছিলেন কলাভবনের অধ্যক্ষ এবং বিশ্বভারতীর অস্থায়ী উপাচার্য। কিন্তু নেহরু যে কথা বুঝেছিলেন, সে কথা যদি মোদিও বুঝতেন, তাহলে তো আর সমস্যাই ছিল না। অনুদান মঞ্জুর তো দূরস্থান, আজ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর সে চিঠির প্রাপ্তিস্বীকার পর্যন্ত করেনি। কলাভবনের এমেরিটাস অধ্যাপক যোগেন চৌধুরী কৌতুক করে বললেন, এই প্রধানমন্ত্রীর কি আর একটা কাজ? আম্বানির কোম্পানিকে বরাত দেওয়ার জন্যে ফরাসি প্রেসিডেন্টের কাছে তদ্বির করা থেকে গুজরাতে মহামূর্তি নির্মাণ, কত কাজে সদাব্যস্ত তিনি! পৈতেধারী হনুমান দলিত কিনা, সেই বিচারেও নিশ্চয়ই এখন সময় দিতে হচ্ছে তাঁকে। বিশ্বভারতী সরাসরি কেন্দ্রের যে মন্ত্রকের অধীন, সেই মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রককে সরকারিভাবে যে চিঠি পাঠানো হয়েছিল, সাংসদ হিসেবে তার সঙ্গে একটা ফরোয়ার্ডিং নোট জুড়ে দিয়েছিলাম আমি। জাভড়েকরই সময় পাননি তার উত্তর দেওয়ার বা প্রাপ্তিস্বীকার করার! এই দুটি আবেদনই শুধু নয়। শতবর্ষ উদযাপনে কেন্দ্রীয় সহায়তা চেয়ে আরও বেশ কয়েকটি চিঠি পাঠানো হয়েছে বিশ্বভারতী এবং কলাভবনের পক্ষ থেকে। আজ পর্যন্ত তার কোনওটিরই উত্তর আসেনি! তিক্ত হয়ে আসে প্রথিতযশা চিত্রকরের স্বর।
শান্তিনিকেতন, বিশ্বভারতী বা কলাভবন সম্পর্কে বিজেপি সরকারের এই উদাসীনতা কি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা? নাকি, বাঙালির গর্বের প্রতিষ্ঠানকে খর্ব করতে তার আত্মঘাতী প্রবণতাকে সুপরিকল্পিতভাবেই ব্যবহার করে চলেছে মোদি সরকার? বেসরকারি অনুষ্ঠানে বিশ্বভারতীর কয়েকজন শিক্ষকের বিনোদনের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল তো হলই, সংবাদ মাধ্যমের মূলস্রোতেও তা এমনভাবে প্রচারিত হল, যেন সঙ্গীত ভবনের পাঠক্রমে ঢুকে পড়েছে লুঙ্গি ডান্স! বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অনুষ্ঠান হোক বা না-হোক, কোনও ভবনের মধ্যে এই ধরনের বিনোদনের পুনরাবৃত্তি হবে না। কিন্তু আত্মরক্ত পানে বাঙালির উৎসাহ এমনই প্রবল যে প্রশ্ন উঠল, এটা কি যথেষ্ট কড়া ব্যবস্থা হল? সোশ্যাল মিডিয়ায় সে আলোচনার মধ্যে অনুপ্রবেশ করল এমনও মন্তব্য যে শান্তিনিকেতন এখন মদ আর মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করার জায়গা হয়ে উঠেছে। নির্বুদ্ধিতার এই অসহ্য বিজ্ঞাপনে সোৎসাহে সায় দিয়ে নরক গুলজার করার লোকেরও অভাব হল না। ফলে শতাব্দী প্রাচীন হয়েও উচ্চতায় নবনির্মিত গুজরাতি মহামূর্তিকে বহুগুণে ছাপিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে মহিমান্বিত প্রতিষ্ঠান, তাকে কলঙ্কিত করার নতুন রাস্তা খুঁজে পেল বামনকূল। কেন্দ্রীয় অনুদান তো এলই না, উল্টে বিদ্বেষের বিষ ছড়ানোর চেষ্টা হল। কিন্তু শান্তিনিকেতন জানে, এখন এমনই আঘাত আসার দিন। নির্বোধ আক্রমণে আঘাতের ক্ষত আড়াল করতে শিখে গেছে শান্তিনিকেতন। তাই  আনন্দমুখর কলাভবন প্রাঙ্গণে শতবার্ষিকী মঞ্চে সমবেত স্তবগান চলতে থাকে: তার আকাশ-ভরা কোলে মোদের দোলে হৃদয় দোলে, মোরা বারে বারে দেখি তারে নিত্যই নূতন। আমাদের শান্তিনিকেতন আমাদের সব হতে আপন। দেখি, গাইতে গাইতে অভিজ্ঞ মুখ প্রাণের আনন্দে বিহ্বল, দু-চোখ বেয়ে গড়াচ্ছে আনন্দাশ্রুর ধারা।

 

 

শতবর্ষে শান্তিনিকেতনের কলাভবন

জনপ্রিয়

Back To Top