‘‌না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা।’ বলেছিলেন তিনি, নরেন্দ্র মোদি। কে বা কারা কতটা কী খেল, আশা করি পরিষ্কার হবে। টাকা–‌ডলার নিরামিষ খাদ্য কিনা, তা অবশ্য জানি না। ‘‌আমাকে আপনারা দায়িত্ব দিন, দেশের চৌকিদার হিসেবে কাজ করব।’‌ এই মন্তব্যও তাঁরই, মোদিরই। চৌকিদার কি লুঠের অংশীদার হয়ে গেলেন?‌ মানুষ বুঝে নেবেন।
সাম্প্রদায়িক হামলা বাড়ছে দেশে। মুখে বড় বড় কথা, কিন্তু কাশ্মীরে পাক জঙ্গিদের রুখতে নিদারুণ ব্যর্থ। উল্টে কাশ্মীরি তরুণদের ওপর বাহিনীর হামলা। কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি হাসির খোরাক। দেশ আর্থিক সঙ্কটে, প্রধানমন্ত্রী বারবার বিদেশ সফরে। নোটবন্দিতে কাজ হারিয়েছেন লক্ষ মানুষ। হেলদোল নেই। ব্যর্থতা, ব্যর্থতা, ব্যর্থতা, ব্যর্থতা। তবু, এর মধ্যেই একটা কথা বিজেপি নেতারা বলে যাচ্ছিলেন, আরে ভাই, এই জমানায় কেন্দ্রে কোনও কেলেঙ্কারি নেই। সেই প্রচারের মিনার হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল।
বিজেপি–‌শাসিত রাজ্যে রাজ্যে কেলেঙ্কারির অভাব ছিল না। সব বলতে গেলে কাগজের সব পাতা ফুরিয়ে যাবে। কয়েকটা বলি। গুজরাটের সানন্দে ন্যানো কারখানার জন্য টাটাদের ৩৩ হাজার কোটি টাকা পাইয়ে দেওয়া। গুজরাটেই আদানিদের ১৬ হাজার একর জমি, প্রতি বর্গমিটার ১ টাকা ৩০ পয়সা দামে দেওয়া (‌বাজার দর ১১০০ টাকা)‌। ওই গুজরাটেই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী আনন্দীবেন প্যাটেলের নিকটাত্মীয়কে ৪২২ একর জমি, ৯২%‌ কম দামে। মহারাষ্ট্রে চিক্কি কেলেঙ্কারি। পঙ্কজা মুন্ডের সৌজন্যে বেশি দামে বাদামের তক্তি কেনা, ক্ষতি ৭০০ কোটি টাকা। রাজস্থানে খনি কেলেঙ্কারি। আনুমানিক ক্ষতি ৪৫ হাজার কোটি। মধ্যপ্রদেশে ব্যাপম কেলেঙ্কারি। ছত্তিশগড়ে রেশন কেলেঙ্কারি, ক্ষতি ৩৬ হাজার কোটি টাকা।
তবু, হুঁ হুঁ বাবা, কেন্দ্রে কোনও কেলেঙ্কারি নেই। প্রথমে এল রাফাল চুক্তির তথ্য। একটি বিমানের দাম ছিল ৫০০ কোটি টাকা, ছিল প্রযুক্তি বিনিময়ের চুক্তি, হ্যাল তৈরি করতে পারত। প্রধানমন্ত্রী প্যারিস গেলেন। তারপর ফ্রান্স থেকে রাফাল বিমান কেনার নতুন চুক্তিতে দাম দাঁড়াল ১৬৪০ কোটি। বিমান কিনতে খরচ প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা।
গুজরাট নির্বাচন গেল। আরও কিছু রাজ্যে ভোট এল। অভিযোগের জবাব নেই। মোদি নীরব।
এরপর ১১,৪০০ কোটির ব্যাঙ্ক কেলেঙ্কারি। নীরব মোদি, মামা মেহুল চোকসি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। এই জমানাতেই ব্যাঙ্ককে ৯০০০ কোটি টাকা ফাঁকি দিয়ে পলাতক বিজয় মালিয়া। প্রতিশ্রুতিমতো ললিত মোদিকে ফেরানো যায়নি, যিনি হজম করেছেন ৪৬৮০ কোটি। তিনজনই গায়েব করেছেন ২৫ হাজার কোটি। প্রাথমিক হিসেব, ব্যাঙ্ক থেকে এভাবেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ৮৪ হাজার কোটি টাকা।
নীরব মোদি পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের ১১,৪০০ কোটি টাকা সরিয়ে উধাও। প্রধানমন্ত্রী, যথারীতি, নীরব। সরাসরি একটি বাক্য উচ্চারণ করলেন না। অর্থমন্ত্রক দোষ চাপালেন কিছু কর্মীর ওপর। যেন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক নেই, যেন মাথার ওপর অর্থমন্ত্রক নেই। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর উর্জিত প্যাটেল কী বললেন?‌ তিনি মোদি–‌পন্থী, সুতরাং, নীরব!‌ ২০১৫ ও ২০১৬ সালে ব্যবসায়ী বৈভব খুরানিয়া ও ‘‌হুইশ্‌লব্লোয়ার’‌ হরিপ্রসাদ নির্দিষ্ট অভিযোগ করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরও সেই অভিযোগের বিছানায় ঘুমিয়ে থাকল।
মমতা ব্যানার্জি এই ব্যাঙ্ক জালিয়াতির সঙ্গে নোটবন্দির সম্পর্কের কথা বলেছেন সবার আগে। তারপর, রাহুল গান্ধী। নোটবন্দি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাঙ্কে আনা হল এবং টাকা জালিয়াতদের পেটে চলে গেল। ব্যাঙ্কে টাকা ঢুকিয়ে ফাঁকা করে দেওয়া। নোটবন্দির ঘোষণা ২০১৬–‌র নভেম্বরে। তারপর ১৪ মাসে ১৫১ লেটার অফ আন্ডারটেকিং নীরব মোদির স্বার্থে।
নোটবন্দি নাকি কালো টাকা উদ্ধারের লক্ষ্যে। সবাই জানেন, বরং অনেক কালো টাকা সাদা হয়ে গেছে। ৯৯ শতাংশের বেশি টাকা ব্যাঙ্কে ফিরে এসেছে। যেদিন রাতে নাটকীয় ভঙ্গিতে ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী, সেদিনই দুপুরে পুরনো নোটে এক কোটি টাকা ব্যাঙ্কে জমা দিয়েছিল রাজ্য বিজেপি। নিশ্চয় অন্য সব রাজ্যেও। খবর প্রকাশিত হল, নোটবন্দির কয়েকদিন আগে থেকেই দেশের নানা শহরে জমি কিনেছে বিজেপি। ধরে নেওয়া যায়, পাকা ব্যবস্থা ছিল কিছু কাছের শিল্পপতির জন্যও। তখনই জানা গিয়েছিল, দেশের ৬৯৫ জেলায় আধুনিক দপ্তর ভবন বানাবে শাসক দল।
আর আহা, সদর দপ্তর। ১ লক্ষ ৭০ হাজার ফুটের সুরম্য ভবন। বড় ঘর ৪৫, সব মিলিয়ে শতাধিক। তিনটে বাগান, হ্যাঁ, বাগান। বেশ কয়েকটি কনফারেন্স রুম, টিভি–‌তে সরাসরি বলার জন্য বিশেষ ঘর ও ব্যবস্থা, গোটা ভবন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত, দুটি চমৎকার কাফেটেরিয়া। সভাপতির ঘর সাততারা হোটেলের সুইটের সঙ্গে তুলনীয়। গর্বিত সভাপতি অমিত শাহ বললেন, এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পার্টি অফিস। বৃহৎ কেলেঙ্কারি, বৃহৎ অফিস। বলতেও লজ্জা নেই।
কোথা থেকে এল এত টাকা?‌ এমন সদর দপ্তর, ৬৯৫ জেলায় অত্যাধুনিক দপ্তর, কারা দিল এত টাকা?‌ তার বিনিময়ে আমাদের কত টাকা ওঁদের হজম করতে দেওয়া হল?‌
ব্যাঙ্ক কেলেঙ্কারি কী করে সামলানো যাবে?‌ ওই তো মধ্যবিত্ত–‌নিম্নবিত্তরা আছে। প্রভিডেন্ট ফান্ডে সুদ আরও কমিয়ে দাও। প্রবীণ নাগরিকদের, সাধারণ কর্মীদের পেটে লাথি মারো। নানা ক্ষেত্রে কর্মীদের ওপর কোপ। ঋণ মকুব হয় না, আত্মঘাতী ১২ হাজার কৃষক। বাড়ছে কর্মহীনতা। খুশি হয়ে হাততালি নিশ্চয় দিচ্ছেন না কৃষকরা। ক্ষোভ–‌বিক্ষোভ বাড়ছে। সব শ্রমিক সংগঠন কেন্দ্রের বৈঠক বয়কট করেছে, সঙ্ঘ পরিবারের বিএমএস–‌ও।
গুজরাট একটা বার্তা দিয়েছে, নীরব কেলেঙ্কারির পর কিছু বড় রাজ্যে নির্বাচনে সেই বার্তা আরও প্রকাশিত হবে। রাজস্থানে তিন উপনির্বাচনে শোচনীয় হার বিজেপি–‌কে স্পষ্ট সঙ্কেত দিয়েছে। যদি রাহুল গান্ধী না ভাবেন যে কংগ্রেস একাই হারিয়ে দেবে বিজেপিকে, যদি রাজ্যে রাজ্যে প্রধান বিজেপি–‌বিরোধী দল অনেক বেশি আসন তুলে আনতে পারে, যদি 
সঙ্কীর্ণ স্বার্থে দলাদলি করে আসলে বিজেপি–‌কেই মদত না দেয় কিছু বিরোধী দল, ২০১৯–‌এ মোদির বিদায় অনিবার্য।
তখন তিনি নীরব থাকবেন না। আর পরিস্থিতিও নীরবতায় ভরা থাকবেন না। প্রতিষ্ঠানবিরোধী ক্ষোভ বেরিয়ে আসবে। বাঁচার তাগিদে সাম্প্রদায়িক প্রচারে সরব হবেন নরেন্দ্র মোদি। ছোট–‌মেজ নেতারাও আকাশ ফাটাবেন। হেরে গেলে, হতাশায় প্রবল আর্তনাদও শোনা যাবে। তিনি আছেন নীরবে, যাবেন সরবে।‌‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top